logo

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা

কক্সবাজার, ১০ সেপ্টেম্বর- মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধরা পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইনের তাদের বাড়ি-ঘর ধ্বংসস্তুপে পরিণত করায় একটু শান্তি ও ভবিষ্যতের আশায় বাংলাদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন হাজারো রোহিঙ্গা। তাদের এই বর্বরতা ও গণহত্যা থেকে বাঁচতে গত ১৫ দিনে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে দুই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।
তবে জাতিসংঘ বলছে, এ সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। আরও দেড়লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশের অপেক্ষায় আছে বলে অনুপ্রবেশকারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।

মিয়ানমার উত্তর মংডু’র বিভিন্ন এলাকা থেকে রোহিঙ্গারা দলে দলে জড়ো হয়ে নাফ নদীর তীরে ভিড়ছে। যারা অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে তাদের বেশিরভাগই আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান। পরিস্থিতি শান্ত হবে ভেবে তারা এতোদিন ধরে অপেক্ষা করে আসছিলেন। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন অব্যাহত থাকায় তারা এপারে চলে আসার প্রস্ততি নিচ্ছেন।

অনুপ্রবেশকারীর ভাষ্য, উত্তর মংডুর কুয়াঞ্চিবন, সাহেব বাজার এলাকা থেকে ৫০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে একযোগে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে রওয়ানা দিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই বিত্তশালী। পথে যাতে সেনাবাহিনীর আক্রমনের কবলে পড়তে না হয় সেজন্য তারা একসাথে আসছেন। দিনের বেলা হাঁটছেন, রাতে পথেই বিশ্রাম নিচ্ছেন। তারা কয়েকদিনের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে এসে পৌঁছবে।

গত দুই দিনে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা
বিভিন্ন সংস্থার তথ্য হিসেবে গত দুই দিনে অর্থাৎ শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩০ হাজার নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে। এসব রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই সাহেব বাজার ও কুয়াঞ্চিবন এলাকার। ইতিমধ্যে প্রচুর রোহিঙ্গা বাংলাদেশের দিকে রওয়ানা হয়েছে। আরো অনেকেই আসছে।
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে রোহিঙ্গারা

অব্যহতভাবে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা উখিয়া টেকনাফ ছেড়ে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম নগরীর কয়েকটি এলাকায় রোহিঙ্গা শিশুদের ভিক্ষা করতে দেখা গেছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি অস্বীকার করলেও অনেক প্রত্যক্ষদর্শী তা দেখেছেন। তবে রোহিঙ্গাদের ভাষা, আচার আচরণ, চেহারায় চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের সাথে মিল থাকায় তাদের সনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মানবপাচারের অভিযোগ

অভিযোগ উঠেছে রোহিঙ্গা জনস্রোতকে পুঁজি করে সীমান্ত এলাকায় এক শ্রেণির দালাল লোভ দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের দেশের অন্য এলাকায় পাচার করছে। মোটা অংকের টাকার লোভ দেখিয়ে তারা ভাগিয়ে নিচ্ছে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের অন্যত্রে। চক্রটি উখিয়া টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে গিয়ে তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে। বিদেশে নেওয়ারও লোভ দেখাচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে দেশের অন্যান্য এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা হয় হেল্প কক্সবাজার (এইচসিবি)’র নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেমের সাথে। তিনি প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি কিছু মানবপাচারকারী টাকার লোভ দেখিয়ে বিদেশ নিয়ে যাওয়ার কথা বলে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যুবতী মেয়েদের চাকরির কথা বলে লোভ দেখানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

যেসব সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা
উখিয়া টেকনাফের ঘুমধুম, তমব্রু, বালুখালী, আঞ্জুমানপাড়া, রহমতের বিল, ধামনখালী, লাম্বারবিল এলাকা দিয়ে মূলত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
যেখানে রোহিঙ্গাদের অবস্থান

কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের দুই পার্শ্বের বিভিন্ন পাহাড়, উঁচু জমি, রাস্তার ধারে এবং কুতুপালং, বালুখালী ও লেদা ক্যাম্পে বিচ্ছিন্নভাবে ঠাঁই নিয়েছে রোহিঙ্গারা। যারা আগে থেকে এসেছেন তারা বিভিন্ন এলাকার সরকারি ভূমি ও ক্যাম্প এলাকায় জায়গা দখল নিয়েছেন।
আশ্রয়ের নামে অর্থ আদায়

নতুন যারা আসছেন তাদের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় দিতে অর্থ আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সক্রিয় চক্র পাহাড়ের পাদদেশে সরকারী জায়গায় প্রতিজন থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে জায়গা দখল দিচ্ছেন। উখিয়ার টিভি টাওয়ারের ডান পার্শে বখতিয়ার মেম্বারের এ-ব্লক পাহাড়ে গিয়ে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা জানান, এক হাজার থেকে শুরু করে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।
হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন

এদিকে অস্বাভাবিক রোহিঙ্গা স্রোতের কারণে আশ্রয় দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশের প্রশাসন। এত দ্রুত গণহারে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে যে তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে বেগ পেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে নতুন অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফ সড়কের দুই ধারে ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে কোনো মতে বেঁচে আছে। অধিকাংশের কাছে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য পলিথিনের তেরপালটুকুও (ছাউনি) না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।


বাড়ছে রোগবালাই
অসংখ্য রোহিঙ্গার কারণে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। খাদ্য, পানি ও ওষুধের অভাবে হাহাকার করছে অনুপ্রবেশকারীরা। জ্বরে ভুগছে শিশুরা।
গুড়ি বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগ
গত কয়েকদিনের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি যেন রোহিঙ্গাদের মরার উপর খাড়ার ঘাঁ। যেখানে জায়গা না পেয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা এখন রাস্তার পাশে। বৃষ্টির পানিতে জমে যাওয়া কাঁদায় চরম দূর্ভোগে পড়েছে তারা। এ সমস্যা আরো বেশি দেখা দেয় সন্ধ্যার পর।
পানির জন্য হাহাকার

পানির অপর নাম জীবন। পর্যাপ্ত টিউবওয়েল না থাকায় পানির জন্য ছটপট করছে রোহিঙ্গরা। যাদের ঘরে টিউবওয়ের তারাও তাদের বিটেতে না ঢুকতে বারণ করছে। এমতাবস্থায় সীমাহীন দূর্ভোগে পেড়েছেন রোহিঙ্গারা। রাখাইনের মংডুজুড়ে মিয়ানমার সৈন্যদের নৃশংসতা এখনো চলছে বলে দাবি করেছেন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। সেখানকার রোহিঙ্গা এক্টিভিস্টদের পোস্ট করা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন ছবি ভিডিওতে নৃশংসতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। নতুন অনুপ্রবেশকারীরা বলছেন, ‘এখনো সেখানে সৈন্যরা তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে।’