
হাকালুকি হাওর যখন ভোরের রোদের সঙ্গে মিলেমিশে সোনা ছড়ায়, তখনই প্রাণ জেগে ওঠে বড়লেখার মাটি। জলজ ঘাসের নরম দোলায় মহিষেরা নেমে পড়ে দুধে ভরা জীবনের খোঁজে, আর গ্রামের কোনো এক কোণে, বাঁশ-বেতের শিকায় নিপুণ হাতে তৈরি হয় এক স্বাদ-নির্ভর চিত্রকাব্য—যার নাম ‘দুছনীর দই’।
মৌলভীবাজার জেলার এক নৈসর্গিক কোণায় অবস্থিত বড়লেখা উপজেলা। পাহাড়ি ঢাল আর হাওরের জল মিলে এক অপূর্ব ভূপ্রকৃতি রচনা করেছে এই জনপদে। এখানকার বর্ণি ইউনিয়ন যেন হাকালুকির নরম কোলে জন্ম নেওয়া এক সংস্কৃতির গোধূলি। মানুষজন সাদামাটা, সরল, কিন্তু শিল্পপ্রেমী।
সিলেটে বাঁশ-বেতের তৈরি হাড়িকে ‘দুছইন’ বলা হয়। এটি এক ধরনের গোল পাত্র, এর গায়ে ছিদ্র থাকে, যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। সাধারণতঃ ‘দুছইন’ ব্যবহার করা হয় রান্না-বান্নার কাজে। কিন্তু দুধ রাখার পাত্র হিসেবে বোধহয় কেউ চিন্তাও করেনি কোনোদিন! ‘দুছইন’ কারিগরা সে অসাধ্য সাধন করেছেন।
দুধ যেন গড়িয়ে না পড়ে, তাই ছিদ্রগুলোতে ময়দার প্রলেপ দিয়ে তারা সিল করে দেন। এই বিশেষ প্রক্রিয়াতেই একটি তরল উপাদান—গাঢ় দুধ—নিয়ন্ত্রিতভাবে দইয়ে রূপ নেয় দুছইনের ভিতরে। প্রতিটি দুছইন যেন একেকটি শিল্পকর্ম—যা দেখতে যেমন চমৎকার, তেমনি শক্তপোক্ত।

মিহারী গ্রামের ৫৪ বছর বয়সী গৌরাঙ্গ দাস ঝাড়ন যেন এই ঐতিহ্যের নিরব স্বাক্ষর। তাঁর হাতে ধরা বাঁশের দুছইন আর হৃদয়ের সুরে বাঁধা স্বপ্ন—এই দুই নিয়েই তিনি গড়েছেন নিজস্ব এক ভুবন। ভোরে বের হন খাঁটি দুধ সংগ্রহ করতে। গ্রাম-গঞ্জ চষে, বাজার থেকে দুধ কিনে ফেরেন দুপুরে।
তারপর ঘরের চুলায় জ্বলে ওঠা আগুনের তাপে দুধ বদলায় রং, বদলায় রূপ—ঘন হতে হতে গাঢ় হয়, আর গাঢ় হতে হতে জন্ম নেয় এক নতুন সত্তা।
গৌরাঙ্গ দাস জানান, এটা তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা। তাঁদের গ্রামটি হাকালুকি হাওরের পারে। হাওরে ঘাস, শালুকসহ নানা জলজ উদ্ভিদের প্রাচুর্য থাকায় অনেকেই গরু-মহিষ পালন করেন। তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় নির্ভেজাল দুধ।
পাত্র ও স্বাদের ভিন্নতায় এই দইয়ের আলাদা কদর রয়েছে। আগে মাটির হাড়িতে দই হতো, কিন্তু তা ভেঙে যাওয়ার প্রবণতায় বাঁশ-বেতের দিকে তারা ঝোঁকেন। আর সেখানেই রচিত হয় দুছইন দইয়ের পরিচয়—এক ঐতিহ্য ও উদ্ভাবনের মেলবন্ধন।
যখন সবাই প্লাস্টিক, মেশিন ও রাসায়নিক মিশ্রিত দই খায়, তখন ‘দুছনীর দই’ যেন প্রকৃতির কোলে জন্ম নেয়া এক শিশুর মতো, একেবারে খাঁটি, নিখাদ।

এলাকাবাসী জানান, দিন দিন এ দইয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। দেখতে চমৎকার, স্বাদেও ভিন্নতা থাকায় কয়েক বছরের মধ্যে লোকমুখে এর ব্যাপক পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। শুধু বড়লেখা নয়, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ সহ বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন এই দই কিনতে।
যে দইয়ের ঘ্রাণে মিশে থাকে হাওরের শিশির, বাঁশের ঘ্রাণে লেগে থাকে শিল্পের বিনুনি—তাকে এক কোণে রাখা চলে না। এটি হতে পারে বাংলাদেশের একটি জিআই (Geographical Indication) পণ্য। দেশের বড় বড় সুপারশপ, হোটেল, রেস্টুরেন্টে এই দই ব্র্যান্ডিং করে তুলে ধরা যেতে পারে। ‘বর্ণির দুছনীর দই’ নামে একটি প্যাকেজিং, একটি লোগো, একটি গল্প—সব কিছুই মিলে এটি হতে পারে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের এক বিজয়গাথা।
এই দই যদি কোনোদিন বৈশাখী উৎসবে কিংবা বাণিজ্যমেলায় স্থান পায়, এই দইয়ের ঘ্রাণ যখন ছড়িয়ে পড়বে দিকে দিকে, তখন সবাই গর্ব করে বলবে—এটা আমাদের বাঁশের পটে আঁকা দুধের উপাখ্যান। এমন একদিন হয়তো আসবেই, যখন এই দই বড়লেখায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাংলাদেশ ছাড়িয়ে—লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, টরন্টোসহ সারা বিশ্বের সুপারশপের শেলফে ঠাঁই করে নেবে—লেখা থাকবে: ‘A Taste of Tradition – Born in Sylhet’।
*** স্থানীয়ভাবে বাঁশ-বেতের তৈরি পাত্রকে ‘দুছইন’ বলা হয়, তবে অনেকে একে ‘দুছনি’ নামেও ডাকেন। এই নামেই দইটি পরিচিতি পেয়েছে।