সম্পাদকের পাতা

একটি ছিন্নভিন্ন নক্ষত্রের গল্প: ফাহিম সালেহ হত্যাকাণ্ড

নজরুল মিন্টো

ফাহিম সালেহ

নিউ ইয়র্কের আকাশে তখনও আলো জ্বলে, তবে অন্তরালে জমে আছে এক নিঃশব্দ অন্ধকার। লোয়ার ইস্ট সাইডের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টগুলোর জানালায় রাতের আলো খেলা করে, ট্যাক্সির হর্ন মিশে যায় মানুষের ব্যস্ত পায়ে হাঁটার শব্দে। এই শহরে প্রতিদিন হাজারো স্বপ্ন জন্ম নেয়—কেউ কেউ সে স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেলে, কেউবা হারিয়ে যায় ছায়ার ভেতর।

সেই শহরেই একদিন গড়ে উঠেছিল এক তরুণ বাঙালি ছেলের স্বপ্ন। সে শুধু নিজের জন্য নয়, তার মাতৃভূমি বাংলাদেশ, আর কর্মভূমি নাইজেরিয়াসহ অসংখ্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য ভেবেছিল। তার নাম—ফাহিম সালেহ। একজন প্রযুক্তি উদ্ভাবক, স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি “পাঠাও” আর “গোকাডা”-র মতো উদ্যোগের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন, প্রযুক্তি শুধু বিলাস নয়—এটি হতে পারে জীবনের রূপান্তর।

কিন্তু ২০২০ সালের এক গুমোট গ্রীষ্মদিনে, সেই স্বপ্ন থেমে যায়। থেমে যায় এক প্রাণ, ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে এক শরীর, আর কেঁপে ওঠে নিউ ইয়র্ক শহরের হৃদয়।

ফাহিম সালেহ ছিলেন সহানুভূতিশীল একজন মানুষ। তাঁর অফিস সহকারী টাইরিজ হাসপিলকে তিনি নিজের প্রোটেজ মনে করতেন—যাকে পরামর্শ দিয়ে বড় করে তোলা হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, ফাহিম জানতে পারেন, হাসপিল তাঁর কোম্পানি থেকে ৯০ হাজার ডলার চুরি করেছে। কিন্তু মামলা করেননি। বরং কিস্তিতে ফেরত দেওয়ার সুযোগ দেন। সেই ক্ষমাশীল সিদ্ধান্তই কাল হয় তাঁর জন্য।

বোনেদের সাথে ফাহিম সালেহ

টাইরিজ হাসপিল তখন একটি গোপন সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিল ফরাসি প্রেমিকা মারিন শাভেউজ-এর সঙ্গে। সে বিশ্বাস করত, চুরির খবর ফাঁস হলে প্রেমিকা তাকে ছেড়ে যাবে। সেই ভয়ের বশে সে খুনের সিদ্ধান্ত নেয়। সে ভাবে আত্মহত্যা অথবা হত্যা—এই দুই পথই খোলা। সে বেছে নেয় দ্বিতীয়টি।

হাসপিল অনলাইনে একটি টেজার (ইলেকট্রিক শক অস্ত্র) কেনে, যা তার ব্রুকলিনের ঠিকানায় পৌঁছায়। মুখে মাস্ক পরে, একদিন জোর করে প্রবেশ করে ফাহিমের ২.৪ মিলিয়ন ডলারের অ্যাপার্টমেন্টে। প্রথমে টেজার দিয়ে শক দেয়, এরপর ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। পরদিন ফাহিমের দেহ ছিন্নভিন্ন করে—মাথা কেটে আলাদা করে, দেহাংশগুলো রেখে দেয় কনস্ট্রাকশন ব্যাগে।

হত্যার পর হাসপিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চেষ্টা করে, কিন্তু একটিমাত্র “anti-felon ID disk” পড়ে থাকে, যা টেজারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং যা পুলিশকে হাসপিলের ঠিকানায় পৌঁছে দেয়।

ফাহিম সালেহ-এর হত্যাকারী টাইরিজ হাসপিল

তরুণ এই উদ্যোক্তার মৃত্যুতে সংবাদমাধ্যমে শোকের ঢেউ বয়ে যায়। বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটি শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য আবেগঘন বার্তা। তাঁকে স্মরণ করা হয় “সফলতম প্রবাসী তরুণ” হিসেবে—যিনি দেশকে ভুলেননি।

টেক দুনিয়া শোকাহত হয়। গোকাডা, পাঠাও, এবং অন্যান্য স্টার্টআপের সহকর্মীরা তাকে স্মরণ করেন একজন ভিশনারি হিসেবে। প্রযুক্তি, উন্নয়ন, এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। নাইজেরিয়ায় গোকাডার শত শত কর্মী তাঁর স্মরণে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করে।

২০২৪ সালের মে মাসে হাসপিলের বিচার শুরু হয়। তাঁর আইনজীবী দাবি করেন, হাসপিল ছিলেন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ছোটবেলায় মায়ের হাতে নির্যাতনের শিকার। কিন্তু প্রসিকিউশন প্রমাণ করে, এটি ছিল পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পিত হত্যা—টেজার কেনা, দরজার কোড জানা, প্রমাণ মুছতে ক্লিনিং উপকরণ কেনা—সব ছিল সচেতন পদক্ষেপ। অবশেষে ২৪ জুন হাসপিল প্রথম ডিগ্রির হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। ১০ সেপ্টেম্বর তাঁকে ৪০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

মৃত্যুকালে ফাহিম সালেহ প্রায় ৬ মিলিয়ন ডলার রেখে গেছেন। তিনি কোনো উইল তৈরি করেননি, তাই নিউইয়র্কের উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী তার সম্পত্তির মালিকানা তার পিতা-মাতার কাছে হস্তান্তরিত হয়। তার একমাত্র বড় ঋণ ছিল ১.৮ মিলিয়ন ডলারের মর্টগেজ, যা তিনি ২.২ মিলিয়ন ডলারের ইস্ট হাউস্টন স্ট্রিটের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কেনার জন্য নিয়েছিলেন—সেই অ্যাপার্টমেন্টেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

পরিবারের সাথে ফাহিম সালেহ

ফাহিম সালেহ ১৯৮৬ সালে সৌদি আরবে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা-মা বাংলাদেশি। ১৯৯১ সালে পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। প্রথমে লুইজিয়ানা, পরে রোচেস্টার, নিউইয়র্কে স্থায়ী হয়। ছোটবেলা থেকেই ফাহিম ছিল কৌতূহলী ও প্রযুক্তিপ্রেমী। ১০ বছর বয়সে স্কুলে ক্যান্ডি বিক্রি করে ব্যবসা শুরু, তারপর গহনা বানিয়ে বিক্রি—এভাবেই তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের সূচনা। ১২ বছর বয়সে “The Saleh Family” নামে পারিবারিক ওয়েবসাইট তৈরি করে, ১৩ বছরেই গুগল অ্যাডসেন্স থেকে প্রথম আয়।

পরবর্তীতে “Monkeydoo” নামে প্র্যাঙ্ক সাইট, “PrankDial” নামের কল-ভিত্তিক সার্ভিস—যেখান থেকে লক্ষ লক্ষ ডলার আয় করেন। সেই আয় দিয়েই তিনি বাংলাদেশে পাঠাও এবং নাইজেরিয়ায় গোকাডা চালু করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল উন্নয়নশীল দেশের সমস্যার সমাধান প্রযুক্তির মাধ্যমে করা।

আজও পাঠাও বা গোকাডা যারা চালান, তারা অনেকেই জানেন না—এই প্ল্যাটফর্মগুলোর পেছনে ছিল এক তরুণ, যার চোখে ছিল স্বপ্ন, আর মনে ছিল দায়িত্ব।

কিশোর বয়সে ফাহিম সালেহ

ফাহিমের বোন রুবি সালেহ ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করে লেখেন, “আমার ভাই, আমি দুঃখিত। তোমার জীবন ছিল অর্থবহ, কাজ ছিল অসাধারণ, ভালোবাসা ছিল সত্যি। এই পৃথিবী যেন তোমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেখে—প্রতিভা নষ্ট করে, বিশ্বাসঘাতকতা করে কিছু অর্জন হয় না।”

রাতের আকাশে যখন কোনো উজ্জ্বল তারা হঠাৎ নিভে যায়, আমরা শুধু শূন্যতা দেখি। কিন্তু সেই তারার আলো ছড়িয়ে যায় দূরের অসীমে। ফাহিম সালেহ ঠিক এমনই একটি তারা—যার আলো আজো আমাদের হৃদয়ে জ্বলছে।

এই লেখার শেষে আমরা তুলে ধরছি ফাহিম সালেহ-এর বড় বোন রুবির সেই চিঠি, যা শুধু অশ্রুভেজা একটি স্মৃতিচারণ নয়—এটি একটি হৃদয়ভাঙা ভালোবাসার নিঃশব্দ প্রতিবাদ, যা বিশ্ববাসীকে কাঁদিয়েছে। নীচে লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

আমার ছোট ভাই ফাহিমের জন্য শোকগাথা
– রুবি অ্যাঞ্জেলা সালেহ

১৪ জুলাই রাত ১০টা ৪৭ মিনিট।

আমার ফোন বেজে উঠল। আমি তখন স্বামীর পাশে বিছানায় শুয়ে একটু একটু করে ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। কলটি নিউইয়র্ক থেকে আসা আমার খালার। তিনি বললেন, “খুব খারাপ একটা খবর আছে।” তার কণ্ঠে ভয় ধরা ছিল, তিনি বিস্তারিত বলতে চাচ্ছিলেন না। আমার শরীর শক্ত হয়ে গেল, মনে হচ্ছিল কিছু ভয়াবহ ঘটেছে।

“কি হয়েছে?” আমি বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম। আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি ফোন স্পিকারে দিলাম, যাতে আমার স্বামীও শুনতে পারেন।

তিনি বললেন, “খুব খারাপ।”

আমি বললাম, “খালাম্মা, প্লিজ, বলুন কী হয়েছে।”

তিনি বললেন, “ফাহিম আর আমাদের সঙ্গে নেই।”

এই কথার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কীভাবে আমার ৩৩ বছর বয়সী প্রাণবন্ত, সৃষ্টিশীল, সুন্দর ভাইটা আর আমাদের সঙ্গে থাকবে না?

তারপর তিনি বললেন, “কেউ তাকে হত্যা করেছে।”

আমি চিৎকার করে বললাম, “আপনি কী বলছেন?”

আমি ফোন কেটে দিলাম এবং আমার বোনকে ফোন করলাম। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি এখন ডিটেকটিভের সঙ্গে আছি, বেশিক্ষণ কথা বলতে পারব না। আমরা অনেক দিন ওর কোনো খবর পাচ্ছিলাম না, তাই এ (আমাদের কাজিন) ওর অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিল।”

তার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। “সে লিভিং রুমে ওর দেহের ধড়টা পেয়েছে,” সে বলল। “আমি রাখছি, ডিটেকটিভের সঙ্গে আছি।”

আমি ফোনটা মেঝেতে ফেলে দিলাম। ঠান্ডা কাঠের মেঝেতে হাত ছুঁয়ে বসে পড়লাম। মাথা নাড়তে নাড়তে বললাম, “না, না। কী বলছে সবাই?”

আমার স্বামী কাঁদছিলেন, তিনি এই খবরটাকে সত্যি ধরে নিয়েছেন। কিন্তু আমার কাছে এসব অবাস্তব লাগছিল।

পরদিন আমি আটলান্টিক পেরিয়ে নিউইয়র্কে পৌঁছালাম। খবরের শিরোনামে তখন ফাহিমের হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা।

“ম্যানহাটনে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ছিন্নভিন্ন দেহ উদ্ধার,” “শরীরের পাশে বৈদ্যুতিক করাত”—এগুলো আমার ভাইয়ের কথা বলছে!

আমার সেই ভাই, যার জন্মের সময় আমি আট বছর বয়সী ছিলাম। বাবা-মা ওকে হাসপাতাল থেকে একটা কমলা ফ্লিস কম্বল মোড়ানো অবস্থায় নিয়ে এসেছিলেন।

আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, আমি নিজেকে ওর বড় বোন না, বরং একজন মায়ের মতো আদর দিতাম। ও খেতে চাইত না, আমি ভাতের চামচ হাতে ওর পেছনে পেছনে ঘুরতাম। আমি ওকে গোসল করাতাম, ডায়াপার বদলাতাম। যেদিন প্রথম ওর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখেছিলাম, আমি ভয়ে কেঁপে উঠেছিলাম—তিন বছর বয়সের ছোট ভাইটির হলুদ জামায় লাল রক্ত ছিটে পড়েছিল। আমি তখন এগারো।

আর এখন, তিরিশ বছর পর জানতে পারলাম কেউ আমার ভাইকে টুকরো টুকরো করে গার্বেজ ব্যাগে ভরে ফেলেছে—যেন তার জীবন, শরীর, অস্তিত্বের কোনো দামই নেই।

৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের বলা হলো, কোভিডের কারণে ভাইয়ের মরদেহ দেখতে পারব না—তবে ছবি পাঠানো হবে। আমি, আমার বোন, আর কাজিন একসঙ্গে বিছানায় বসে হাত ধরে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করলাম। তারপর ইমেইলের অ্যাটাচমেন্ট খুললাম।

ছবিটি খুলতেই দেখি—আমার প্রাণপ্রিয় ভাই, নিথর, নিস্পন্দ পড়ে আছে; যেন ঘুমিয়ে আছে, অথচ ঘুম নয়, চিরনিদ্রা। আমার বোন চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। মন চাইছিল পর্দার ভিতরের সেই মুখে হাত বুলিয়ে বলি, “ফাহিম, আমি দুঃখিত। আমার ভাই, আমি খুব দুঃখিত।” আমার চোখের জল পর্দার গায়ে গড়িয়ে পড়ছিল।

আমরা ছিলাম এক সাধারণ বাংলাদেশি পরিবার। বাবা একসময় ক্যানভাস বিক্রি করতেন, স্বপ্ন বিক্রি করতেন চোখে চোখে। ১৯৮৫ সালে তিনি কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি নিয়ে সৌদি আরবে শিক্ষকতা শুরু করেন—ভালো জীবিকার আশায়। ফাহিম ১৯৮৬ সালে জন্ম নেয়। ও ছোট থেকেই খুব কৌতূহলী ছিল। খেলনা পেলে খুলে দেখত ভিতরে কী আছে।

১৯৯১ সালে আমরা যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসি। আমি ১২, ফাহিম ৪, আর আমাদের ছোট বোন তখন শিশু। লুইজিয়ানা রাজ্যে বাবা পিএইচডি করছিলেন, মা স্থানীয় লন্ড্রিতে কাজ করতেন। পাঁচজনের পরিবার চলত বাবার স্কলারশিপ আর মায়ের মজুরি দিয়ে।

১০ বছর বয়সে ফাহিম দোকান থেকে কিনে আনত ক্যান্ডি, বিরতির সময় স্কুলে বেশি দামে বিক্রি করত। স্কুল বন্ধ করে দিলে সে গহনা বানানোর কিট চায় জন্মদিনের অগ্রিম উপহার হিসেবে। তারপর খেলাঘরে ব্রেসলেট আর হার বিক্রি শুরু করে—ওর দ্বিতীয় ব্যবসা।

ফাহিমের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ছিল প্রযুক্তি। যখন সে ইন্টারনেট আবিষ্কার করে, তখন যেন তার কল্পনার ডানা পেল ছোঁয়া। মাত্র ১২ বছর বয়সে সে নিজের প্রথম ওয়েবসাইট বানায়—”The Saleh Family”। আমার ছবির নিচে সে লিখেছিল, “এটা আমার বড় আপু। ও বেশ কুল, তবে রিমোট কন্ট্রোল চুরি করে, যেটা আমার একদমই পছন্দ না।”

ফাহিম বুঝে গেল, ইন্টারনেট থেকে সে অর্থ আয় করতে পারে। ১৯৯৯ সালে, ১৩ বছর বয়সে, সে তার প্রথম সাইট থেকে অর্থ উপার্জন শুরু করে। তখন আমাদের পরিবার লুইজিয়ানা থেকে নিউইয়র্কের রোচেস্টারে চলে আসে। আমি তখন কলেজে।

ওর সেই সাইটের নাম ছিল “Monkeydoo”—এখানে কিশোরদের জন্য রসিকতা, প্র্যাঙ্ক, মজা, এমনকি নকল পটি আর ফার্ট স্প্রের মত জিনিস বিক্রি হতো।

যখন প্রথম $৫০০ ডলারের চেক গুগল থেকে পোস্টে আসে—ঠিকানা “Fahim Saleh”—তখন আমাদের বাবা চমকে যান। তিনি ভাবেন, “একটা ছেলে এত টাকা কীভাবে আয় করছে? এটা তো বিশাল অর্থ!”

বাবা সবসময় দুশ্চিন্তা করতেন, আর ফাহিম ছিল চিন্তামুক্ত। কিন্তু ফাহিমই একমাত্র ব্যক্তি ছিলো, যে বাবার মন শান্ত করতে পারতো। সে বাবাকে তার সাইট দেখাত, বুঝিয়ে বলত সে কীভাবে প্রোগ্রামিং করছে, কীভাবে সব কাজ করছে। বাবা ধীরে ধীরে মুগ্ধ হন।

কয়েক বছরের মধ্যেই ফাহিম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে উদ্যোক্তা হিসেবে। সে প্র্যাঙ্ক ডায়াল নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করে—যেখানে মজা করে ফোনকল পাঠানো যায়। এই ব্যবসা থেকে সে লক্ষ লক্ষ ডলার আয় করে।

এরপর সে একের পর এক নতুন স্টার্টআপ তৈরি করে—’পাঠাও’, ‘গোকাডা’, এবং আরও অনেক কিছু। বাংলাদেশে, নাইজেরিয়ায়, এবং অন্য উন্নয়নশীল দেশে সে নতুন প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়েছে। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট—প্রযুক্তি হওয়া উচিত সর্বজনীন, সহজলভ্য এবং উন্নয়নের হাতিয়ার।

যেদিন সে খুন হয়, সেদিন আমাদের পরিবারে যেন চিরন্তন অন্ধকার নেমে আসে। তবে আমরা বুঝতে পারি, সে একা নয়। হাজার হাজার মানুষ তাকে ভালোবেসেছে, অনুসরণ করেছে, এবং তার মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করেছে।

তার বন্ধুরা, সহকর্মীরা, এমনকি যারা কেবল তাকে অনলাইনে চিনত—সবাই বলেছে, ফাহিম ছিল একজন “ড্রিমার,” “চেঞ্জমেকার,” এবং “সত্যিকারের ভালো মানুষ।”

শেষ কথাগুলো আমার ভাইয়ের উদ্দেশে- ফাহিম, আমি চাই, তুমি জানো—তোমার জীবন ছিল অর্থবহ, তোমার কাজ ছিল অসাধারণ, এবং তোমার ভালোবাসা ছিল সত্যি। আমি চাই, এই পৃথিবী তোমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কিছু শিখুক—যে প্রতিভা নষ্ট করা, বিশ্বাসঘাতকতা, এবং সহিংসতা দিয়ে কিছু অর্জন হয় না।

আমি চাই, তুমি যেখানেই থাকো, শান্তিতে থাকো।

তোমার বোন,
রুবি


Back to top button

দয়া করে ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনের অনুমতি দিন

দেখে মনে হচ্ছে আপনি কোনও বিজ্ঞাপন ব্লকার ব্যবহার করছেন। আমরা বিজ্ঞাপনের উপর ভরসা করি ওয়েবসাইটের ফান্ডের জন্য