শিক্ষা

বিভাগীয় প্রধান নিয়োগে আইনের তোয়াক্কা করেন না বেরোবি উপাচার্য

রংপুর, ১৬ ফেব্রুয়ারি – রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বিভিন্ন বিভাগে বিভাগীয় প্রধান নিয়োগে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহর বিরুদ্ধে। সেইসঙ্গে উপাচার্য কয়েকটি বিভাগের দায়িত্ব নিজের কাছে রেখে চরম ভাবে ক্ষমতার অপব্যাহার করছেন বলে শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর আইন ২০০৯ অনুযায়ী, ‘যদি কোনও বিভাগে অধ্যাপক না থাকেন তাহলে ভাইস-চ্যান্সেলর সহযোগী অধ্যাপকের মধ্যে থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে একজনকে বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, সহযোগী অধ্যাপকের নিম্নের কোনও শিক্ষককে বিভাগীয় প্রধান পদে নিযুক্ত করা যাবে না। আর সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার কোনও শিক্ষক কোনও বিভাগে কর্মরত না থাকলে, সংশ্লিষ্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বিভাগের প্রধান হবেন।’ কিন্তু এ আইনের কোনও তোয়াক্কাই করছেন না উপাচার্য। তিনি আইন অমান্য করে তার অনুসারীদের দায়িত্ব দিচ্ছেন বিভাগীয় প্রধানের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ জানুয়ারি সফলভাবে লোকপ্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের মেয়াদ পূর্ণ করেন ওই বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক যুবায়ের ইবনে তাহের। এরপর আইন ও জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী বিভাগটির শিক্ষক আসাদুজ্জামান মন্ডল আসাদ বিভাগীয় প্রধান হওয়ার কথা থাকলেও অবৈধভাবে উপাচার্য তাকে দায়িত্ব না দিয়ে নিজেই বিভাগটির বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। নিয়োগ বঞ্ছিত শিক্ষক আসাদুজ্জামান মন্ডল অভিযোগ করেন তিনি। উপাচার্যের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব অবস্থানে থাকার কারণে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় ওই বিভাগে চরম অস্থিরতা আর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, ২০১৭ সালেও উপাচার্য ওই বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদ দখল করে বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করেন। শিক্ষার্থীদের কঠোর আন্দোলনের মুখে পড়ে তিনি বিভাগীয় প্রধানের পদ ছাড়তে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, তিনি বিভাগটির প্রধান থাকাকালীন ওই বিভাগটির একজন শিক্ষক তার বিরুদ্ধে বিভাগের অর্থ তছরুপের লিখিত অভিযোগ করেন। এছাড়া জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের যোগ্য শিক্ষক থাকার পরেও সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিভাগটির বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বও নিয়ে রেখেছেন উপাচার্য। অথচ তিনি ক্যাম্পাসে আসেন না। বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর নিতে হয়রানির শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। শুধু তাই নয়, বিভাগটির প্ল্যানিং কমিটিতে অবৈধভাবে একাই দুই সদস্যের পদ নিয়ে প্ল্যানিং কমিটির অন্য সদস্যের স্বাক্ষর ছাড়াই নিয়োগ বোর্ড সম্পন্ন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন : কাউকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে দেয়া হবে না : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

একই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। বিভাগটির একজন সহযোগী অধ্যাপক থাকা সত্ত্বেও সহকারী অধ্যাপক তানিয়া তোফাজকে অবৈধভাবে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী সহযোগী অধ্যাপক ড. বিজন মোহন চাকী বিভাগীয় প্রধান হওয়ার কথা থাকলেও উপাচার্যের পছন্দের না হওয়ায় তাকে নিয়োগ দেয়নি বলে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। এ ঘটনার পর থেকে থেকে বৈধভাবে বিভাগীয় প্রধান নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বিভাগটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে ঢাকায় গিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে ফটোসেশন না করায় অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের যোগ্য শিক্ষককে বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ না দিয়ে বিভাগটির অপর শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। উপাচার্যের সঙ্গে ওই শিক্ষকের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে তিন বছরের জন্য বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ দেওয়ার আইন ও রীতি থাকলেও ভিসি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান নিয়োগে নিয়ম ভঙ্গ করে দুই বছরের জন্য নিয়োগ প্রদান করেন। এ ঘটনাকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও নারীর প্রতি অবিচার উল্লেখ করে ভিসি বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। শুধু লোকপ্রশাসন বিভাগ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রসায়ন বিভাগ, একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ ও জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগই নয়, এর আগেও আইন লঙ্ঘন করে ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে।

এ ব্যাপারে রসায়ন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান এইচ এম তারিকুল ইসলাম বলেন, আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে উপাচার্য প্রমাণ করতে চাচ্ছেন দেশে আইন বলে কিছু নেই। উপাচার্য এ ধরনের নেতিবাচক বিষয় প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন না যদি না তাকে কেন্দ্র করে যে চক্র কাজ করছে তাদের ইন্ধন পেতেন। রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘনের জন্য ভিসির বিচার হওয়া উচিত বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি এই আইন লঙ্ঘনে যারা একের পর এক সহযোগিতা করে চলেছেন তাদেরকে অবশ্যই কঠোর বিচারের আওতায় নিয়ে আসা উচিত বলে দাবি করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, আইনের মধ্যে থেকে যে বিভাগীয় হওয়ার কথা তাকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেয়া প্রয়োজন। এতে করে বিভাগের কাজ গতিশীল হয় আর আইনেরও লঙ্ঘন হয় না।
এসব অনিয়মের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আইন ও বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় প্রধান নিয়োগের আহ্বান জানান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. আবু কালাম ফরিদ উল ইসলাম।

সার্বিক বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহর মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন
এন এইচ, ১৬ ফেব্রুয়ারি


Back to top button
🌐 Read in Your Language