অপরাধ

ক্যান্ডির বদলে ড্যান্ডির নেশায় বুঁদ

ফারুক আলম

ঢাকা, ০৫ মার্চ – ডাক নাম রুবেল। পুরো নাম শরীফ রুবেল। বয়স সাত বছর। এ বয়সে রুবেলের হাতে বই-খাতা থাকার কথা। স্কুলে যাওয়ার পথে তার বাবা-মা আদার করে পছন্দের ক্যান্ডি কিনে দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। রুবেলের হাতে ক্যান্ডি নয়, ঝুলছে ড্যান্ডি। ড্যান্ডির নেশা বুঁদ সকাল, বিকেল ও রাত। নেশার নাম ড্যান্ডি হলেও পুরো নাম ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ বা ড্যান্ড্রাইট আঠা।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শুধু রুবেল নয়, রুবেলের মতো শতশত শিশু ড্যান্ডির নেশায় বুঁদ। যে বয়সে শিশুরা মাঠে খেলাধুলা করা, পুকুরে সাঁতরানো কিংবা নিজের বাড়িতে বাবা-মার সঙ্গে শুয়ে গল্প শোনা। সেই বয়সে ছিন্নমূল শিশুরা ঘুমাচ্ছে পথে পথে। শুয়ে থাকছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কিংবা ট্রেনের বগিতে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কমলাপুর স্টেশনে রুবেল মানুষের ব্যাগ টেনে যে টাকা পায় তা দিয়ে ড্যান্ডি খাবার ও ড্যান্ডি কিনে। পরে রাতভর বন্ধুদের সঙ্গে ড্যান্ডি টানে, আর ভোর হলে কমলাপুর স্টেশনে ঘুমিয়ে পড়ে। নেশার এই নীল ছোঁবলে অন্ধকার পথে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে এরা। নেশার টাকার জন্যে জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে। করছে ভিক্ষাবৃত্তিও।

পথশিশু শরীফ রুবেল তিন বছর ধরে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আছে। এর আগে কড়াইল বস্তিতে বাবা-মার সঙ্গে থাকতো। কিন্তু তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় তার মায়ের সঙ্গে প্রায় তর্ক-বিতর্ক লাগে। একদিন রুবেলের মাও আরেক জনের হাত ধরে ঘর থেকে বের হয়ে যান। পিতামাতার কাছ থেকে ছিন্ন হয়ে পরে রুবেলের শৈশব জীবন। তখন রুবেল ঘর ছেড়ে চলে আসে কমলাপুর স্টেশনে। স্টেশনে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই রুবেল অন্যসব পথশিশুর সঙ্গে মিশে যায়। তৈরি হয় বন্ধুত্ব। সেই থেকেই কমলাপুর স্টেশন কেন্দ্রীক বেড়ে উঠছে রুবেল।

শরীফ রুবেল বলেন, এখন সে আর একা নয়, কমলাপুর স্টেশনে তার অনেক বন্ধু হয়েছে। আউয়াল, অন্তর, রাকিব, আশরাফ, দিলোয়ার, ফখরুল ও সোহেব নামে কয়েকজন বন্ধু আছে তার। শুধু ছেলে বন্ধু নয়, লিপি ও আকলিমা আক্তার নামেও মেয়ে বন্ধু আছে রুবেলের। রাজধানীসহ সারা দেশের জেলা শহরগুলোতে বস্তি জীবনে অনেক নারী-পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করায় সন্তানদের ওপর অবহেলা, দরিদ্রতার কষাঘাতে পিষ্ট হওয়া, বস্তির জীবনে পতিতাবৃত্তি করে নারীরা সন্তান জন্মে দেওয়ার পর কিছুদিন লালন-পালন করে রাস্তাপথে ছেড়ে দেওয়া, কেউবা সৎ মায়ের জ্বালায় শিশুরা সংসার ছেড়েছে। পথশিশু আকলিমা আক্তার (৯) নিজ গ্রামের ঠিকানা না জানলেও সে জানায়, সুনামগঞ্জ থেকে সে মায়ের সাথে এসেছে। তার সহপাঠীরা প্রত্যেকেই নেশাগ্রস্ত।

পথশিশুদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প প্রায় একই। তারা নিজেদের বাবা-মা’র পরিচয় জানে না। ড্যান্ডি নেশায় বুঁদ থাকার বিষয়ে পথশিশুরা বলছে, সন্ধ্যার সময় সবার কাছ থেকে চাঁদা করে নেশার ব্যবস্থা করা হয়। দিনে তিন থেকে চার বার ড্যান্ডির নেশায় বুঁদ করতে হয়। না হলে তাদের শরীর ‘ঝিনঝিন’করে।

রাজধানীসহ দেশের জেলা শহরগুলোর পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবন-মান উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জুম বাংলাদেশ। সংগঠনটির ঢাকায় সাড়ে চারশ পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর প্রতিদিন শিক্ষা ব্যবস্থা, সাংস্কৃতি চর্চা ও খাবারের ব্যবস্থা করে চলছে।

জুম বাংলােেদশর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এসটি শাহীন বলেন, ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত পথশিশুরা পার্ক, খোলা মাঠ, রেল স্টেশনে, রাস্তায়, বাসস্ট্যান্ড কিংবা ফুটওভার ব্রিজের উপর ঘুমায়। এসব শিশুদের কাছে নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে ভাল-মন্দ বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি। পথশিশুদের মধ্যে কিছু কিছু শিশু আমাদের কথা শোনে এবং অনেকটাই ভালোর পথে চলে আসে। মাঠপর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে অধিকাংশ পথশিশু পরিবার থেকে বিচ্ছেদ। অনেক সময় শহর জীবনে কিছু নারী পতিতাবৃত্তি করতে গিয়ে গর্ভে সন্তান ধারণ করেন। সন্তান জন্ম দিয়ে কিছুদিন লালন-পালন করে সন্তানকে এক এলাকায় রেখে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, পথশিশুদের ড্যান্ডিসহ বিভিন্ন নেশায় আসক্ত হয়। এসব শিশুদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে হলে শেল্টার হোম জরুরি। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে আমরা যতই কাউন্সিলিং কিংবা এক বেলা খাবার দেওয়া হোক, খুব বেশি পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেজন্য সরকারিভাবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পিতামাতা পরিচয়হীন ০-৭ বছর বয়সী পরিত্যক্ত/পাচার হতে উদ্ধারকৃত শিশুদের ছোটমনি নিবাসে লালনপালনে রাজধানীতে ৬ থেকে ৭টি শেল্টার হোম করছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ৬ বিভাগে অবস্থিত ৬টি ছোটমনি নিবাসে শিশুদের মাতৃস্নেহে প্রতিপালন, রক্ষণাবেক্ষণ, খেলাধুলা ও সাধারণ শিক্ষা প্রদান করছে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষার লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে দুইটি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্প দু’টি হচ্ছে, চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ (সিএসপিবি) প্রকল্প এবং সার্ভিসেস ফর দ্যা চিলড্রেন এট রিস্ক।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে পথশিশুদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে আসছে আরেকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সবুজ ছায়া। সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবক আরিফ সোহেল বলেন, ব্যস্ততম শহর ঢাকায় দেড় কোটির বেশি মানুষের বসবাস। দেড় কোটি মানুষের মধ্যে অলি-গলিতে অনাদর, অবহেলায় বেড়ে মানুষগুলো রয়েছেন। কিন্তু তাদের খবর কেউ রাখেন না। তাদের নেই কোনো শৈশব। নেই শিক্ষা। নেই বাবা-মায়ের আদর। আমাদের সংগঠন পথশিশুদের নিয়ে দীর্ঘদিন নিয়ে কাজ করে আসছে।

মানুষের প্রধান মৌলিক খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। পথশিশুদের এসব অধিকারের জায়গা নেই। অথচ একটা শিশুর সবার আগে বাসস্থানের অধিকার, নিরাপত্তার অধিকার, খাদ্যের অধিকার রয়েছে, শিক্ষার অধিকার রয়েছে৷ এসব কিছুই কিন্তু পথশিশুদের জন্য প্রযোজ্য৷ কোনো অধিকারই তারা পাচ্ছে না। পিতামাতাহীন পথশিশুদের ভবঘুরে জীবনযাপন রাস্তা-ঘাটে, রেলওয়ে স্টেশন, ফুটওভার ব্রিজ কিংবা ফ্লাইওভারে। দিনের বেলায় ঘাড়ে বস্তা নিয়ে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় প্লাস্টিকের বোতল কিংবা লোহা কুড়িতে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে পেট চালায়। আর যে টাকা হাতে থাকে তা দিয়ে ড্যান্ডি কিনে নেশা করে। কেউ কেউ দিনের বেলা নেশা করলেও বেশিরভাগই নেশা করে রাতে। কেউ একা, আবার কেউ কেউ গোল হয়ে বসে সংঘবদ্ধ হয়ে নেশা করে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ড্যান্ডি এক ধরনের নেশা। নেশার প্রধান বৈশিষ্ট শরীরের ভেতরের যেসব কাজ কর্ম তা অভ্যস্ত করে তোলা। ফলে ড্যান্ডির নিয়ে পথশিশুদের মধ্যে এক ধরনের উৎসূক তৈরি হয়। একজন পথশিশু যখন ড্যান্ডিতে আসক্ত হয়, তখন অন্য শিশু মনে মনে ভাবে আসলে ড্যান্ডিতে আছে। কৌতূহল থেকে আস্তে আস্তে ড্যান্ডিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এরফলে শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশের পথশিশুদের নিয়ে সরকারের কাজ করার কথা। কিন্তু এনজিওগুলো কিছুটা কাজ করলেও সরকারি সংস্থাগুলো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দিন পার করে। সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। পথশিশুদের সঠিকভাবে তৈরি করতে পারলে দেশের সম্পদ হবে।

সূত্র : আর টিভি
এন এ/ ০৫ মার্চ


Back to top button
🌐 Read in Your Language