বাল্যবিয়ের কারনে যেভাবে হারিয়ে গেল দেশ সেরা ফুটবলারসহ সাত কিশোরী

কুড়িগ্রাম, ১৮ মার্চ – বাল্যবিয়ের কালো থাবায় অন্ধকারে হারিয়ে গেল দেশ সেরা কুড়িগ্রামের কিশোরী ফুটবলার স্মরলিকাসহ একই দলের সাত কিশোরী। অবহেলা আর নজরদারীর অভাবে সম্ভাবনাময় এসব কিশোরী ফুটবলার বাল্যবিয়ের কারণে হারিয়ে গেল ফুটবল জগত থেকে। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং দারিদ্র্যতার কাছে হার মেনে বাল্যবিয়ে দিয়ে দিচ্ছে পরিবারের সদস্যরা।
স্মরলিকা, দুর্দান্ত এক খুদে ফুটবলার। ২০১৭ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপে হ্যাট্রিক কন্যা খ্যাত দেশ সেরা খেলোয়াড়। টুর্নামেন্টে নিজ বিদ্যালয় বাঁশজানি সরকারী প্রাথমিকের হয়ে দেশ কাঁপিয়েছে সে। দল চ্যাম্পিয়ন না হতে পারলেও স্বরলিকা হয়েছিল দেশ সেরা খেলোয়াড়। হ্যাটট্রিক কন্যা খ্যাত সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে। তার এমন কৃত্বিতে প্রশংসা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাথরডুবি ইউনিয়নের সাবেক ছিটমহল দীঘলটারী দক্ষিণ বাঁশজানী গ্রাম। বছর তিনেক আগে বাঁশজানি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০ জন কিশোরীকে নিয়ে গঠন করে তাদের ফুটবল দল। সেই দল বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপে অংশগ্রহণ করে। স্মরলিকার নেতৃত্বে আসে নানান সাফল্যের মেডেল, ক্রেষ্ট ও কাপ। ভারত-বাংলাদেশ বিলুপ্ত ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশীদের কাছে পাওয়া প্রথম উপহার আসে স্মরলিকা পারভীনের হাত ধরেই।
আরও পড়ুন : বায়ুদূষণে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে ঢাকা
স্বরলিকা পারভীন বলেন, ইচ্ছে ছিল জাতীয় দলে খেলব। দেশের জন্য কিছু করব। কিন্তু সেই স্বপ্নের ইতি টানতে হয়েছে বিয়ের পিড়িতে বসে। সামাজিক নানা কথা- মেয়েরা ফুটবল খেললে বিয়ে হবে না। ভালো ছেলে পাওয়া যাবে না। আর্থিক অনটনসহ এমন অনেক কারণে বাবা-মা বিয়ে দিয়ে দিছে। আমার টিমের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে।
স্বরলিকার বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন,আমি কৃষি কাজ করি। ৫ জনের সংসার চালাই। সীমান্ত এলাকা এখানে কোনো কাজ নাই। করোনার জন্য অভাব আরো বেশি হইছে। ভালো ঘর পাইছি। ডিমান্ড ছাড়াই বিয়া দিছি মেয়ের। গত ৫ মার্চ একই উপজেলার পার্শ্ববর্তী শিলখুড়ি ইউনিয়নের মোটর মেকানিক কামরুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে স্মরলিকার।
আরেক খেলোয়াড় লিশামনির মা বলেন, এই তিনবছরে কেউ খোঁজ নেয়নি। স্কুল বন্ধ, পড়াশুনা নাই, মেয়েরা বসে থাকে। ভালো ছেলে পাইছে স্বরলিকার বিয়ে দিছে ওর বাবা-মা। আমিও ভালো ছেলে পাইলে আমার মেয়েকেও (লিশা) বিয়ে দিয়ে দিব। কেননা, আমাদের তো সামর্থ্য নাই যে মেয়েকে বাইরে রেখে পড়াশুনা করাবো কিংবা খেলোয়াড় বানাব। মেয়ে লিশামনি বলেন, আমি বাঁশজানি টিমে খেলেছি। সেদিনের সেই অনুভূতি বলার মতো না। সেখান থেকে আসার পর আমাদের কেউ কোনো খোঁজখবর রাখেনি। গেল তিন মাসে আমাদের টিমের ৭ জন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বাঁশজানি দলের অধিনায়ক ১০ম শ্রেণি পড়ুয়া স্বরলিকা, ১০ম শ্রেণির জয়নব, ৯ম শ্রেণির শাবানাসহ ৮ম শ্রেণির রত্না, আখি, শারমিন এবং আতিকা।
বাঁশজানি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কায়সার আলী বলেন, করোনার সময় স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর তেমনটা নেয়া সম্ভব হয়নি। অনেকের বিয়ের বিষয়টি আমি পরে জানতে পেরেছি। বিয়ের সময় জানতে পারলেও বিয়ে আটকানো যেত। আসলে বিয়ে হয়ে যাবার পর আমাদের কিছু করার থাকে না। পাথরডুবি ইউপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরফান আলী বলেন, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধির অগোচরেই বাঁশজানি দলের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা জানান, কিশোরী ফুটবলারের বাল্যবিয়ের বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না। কেউ তাকে জানায়নি। জানলে তিনি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারতেন। তবে বাকি খেলোয়াড়রা যেন বাল্য বিয়ের শিকার না হয় সেজন্য তিনি নজর রাখার পাশাপাশি তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সূত্র: আরটিভি
এন এ/ ১৮ মার্চ









