Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১১ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২৩-২০১২

‘তোমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি বাবা’

ফারুক ওয়াসিফ



	‘তোমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি বাবা’

 

নিয়তির সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলো নেই জেনেও আশা ছাড়েননি গাদ্দাফি। বড় ছেলে আহত ও পলাতক, মেজো ছেলে ন্যাটোর বিমান হামলায় নিহত, ছোট ছেলে মুতাসিম কেবল বাবার সঙ্গী। ত্রিপোলি থেকে বিভিন্ন পথে সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিরা অক্টোবরের মাঝামাঝি সির্তে শহরে জড়ো হন। ইতিমধ্যে মুতাসিমকে পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় সির্তে শহর ঘিরে কৌশলগত পরিকল্পনা থাকাই স্বাভাবিক। হয়তো এখান থেকে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু একদিকে সমস্ত যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া, অন্যদিকে ন্যাটোর বিমান অবরোধ ও হামলার কারণে প্রতিরোধ ক্রমশ আশাহীন হয়ে আসছিল। এ অবস্থায় ১৯-২০ অক্টোবর ভোররাত সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে গাড়িবহর নিয়ে সির্তে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল। কিন্তু আহত আর বেসামরিক লোকজনদের গাড়িতে তোলার বন্দোবস্ত করতেই সকাল আটটা হয়ে গেল। রাতভর গোলাবর্ষণ চলেছে। ভোরের দিকে মিলিশিয়ারাও ফিরে এসেছে যুদ্ধ অবস্থানে। তাদের ব্যূহ ভেদ করা ছাড়া উপায়ই বা কী? 
 
পথের খোঁজে
সকাল আটটায় রওনা হলো ৫০টি গাড়ির বহর। কিছু গাড়িতে মেশিনগান ও বিমানবিধ্বংসী বন্দুক বসানো। মিলিশিয়ারা জানত যে একটা বহর আসছে। কিন্তু তারা জানত না, গাদ্দাফি ও তাঁর ছেলের এই গাড়িবহরই ছিল সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ টার্গেট। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন আর ফ্রান্সের যুদ্ধবিমান পাক খাচ্ছে আকাশে, মাটিতে মিলিশিয়ারা তক্কে তক্কে আছে। এরই মধ্যে সন্তর্পণে বহরটি পশ্চিমে সমুদ্রের দিকে চলল। শিগগিরই মিলিশিয়ারা হামলা শুরু করল। সেটা সামলে বাঁক নিয়ে চলল শহরের দক্ষিণ দিকে। কিন্তু খোলা রাস্তায় পড়ামাত্রই আকাশ থেকে একটা মিসাইল গাদ্দাফির সামনের গাড়িকে বিধ্বস্ত করে দিল। যুদ্ধবিমান আর ড্রোন থেকে বাঁচতে গলিপথে ঢুকল বহর। তাঁদের জানা ছিল না, নাক বরাবর রাস্তার ওপর বিদ্রোহীদের ঘাঁটি। তখন আর থামার বা পিছু হটার উপায়ও ছিল না। ততক্ষণে মরুসিংহ ফাঁদে আটকে গেছেন। ব্যারিকেড ভেঙে বেরিয়ে যাওয়াই তখন একমাত্র কাজ। সেই ঘাঁটির কমান্ডার খালিদ আহমেদ রিয়াদ বলছেন, ‘গাড়িবহর সোজা আমাদের ব্রিগেড ভবনের দিকে এসে রকেটচালিত গ্রেনেড ছুড়ল। আমরাও গোলাগুলি শুরু করলাম। ওরা চেয়েছিল আমাদের ভেতর দিয়ে পথ তৈরি করে নিতে...।’
বহরের যোদ্ধারা তখন মিলিশিয়াদের সঙ্গে লড়ছেন, সেই ফাঁকে ন্যাটোর বিমানগুলো সহজেই ৫০০ পাউন্ডের দুটি শক্তিশালী বোমা ফেলতে পারল। আরোহীদের বেশির ভাগই সেখানেই মারা গেল। পরদিন, ২১ অক্টোবর এইচআরসি সেখানে ৫৩টি লাশ পায়, ২৮ জনের দেহ চেনার উপায় ছিল না। সেই ঘটনায় মোট ১০৩ জনেরও বেশি নিহত হয়।
 
নিরুপায় চেষ্টা
হামলার পর যারা যেভাবে পারল আশপাশের ভবনে আশ্রয় নিল। গাদ্দাফি তাঁর ঘনিষ্ঠ চক্রসহ পাশের একটা ভিলায় ঢুকে পড়লেন। এদিকে মিলিশিয়াদের গোলাবর্ষণের তোড়, ওদিকে আকাশ থেকে বিমান হামলা। লিবিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউনিস আবু বকর ইউনিস ও তাঁর ছেলেও সেখানে ছিলেন। অজ্ঞাতনামা সেই ছেলে এইচআরসিকে জানায়: ‘দেখলাম, মুতাসিম আহত। তাঁর গাড়িটাই ছিল বহরের একদম সামনে। গাদ্দাফিকে পেলাম ভিলার প্রহরীকক্ষের ভেতরে। গায়ে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, মাথায় হেলমেট। পকেটে একটা হ্যান্ডগান আর হাতে অটোমেটিক অস্ত্র। মনসুর ধাও এসে বাবাকে আর মুয়াম্মারকে আরেকটি বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সবগুলো গাড়িই বিধ্বস্ত। ভিলার ভেতরেও বোমার আক্রমণে টেকা যাচ্ছিল না। সেখানে বিস্তর সিমেন্টের কাঠামো থাকায় তার আড়ালে পরিবার-পরিজন ও রক্ষীরা মিলে আশ্রয় নিলাম।’
 
‘তোমাকে বের করার চেষ্টা করছি, বাবা’
মুতাসিমই হাল ধরলেন। ৮ থেকে ১২ জন যোদ্ধা নিয়ে বের হওয়ার পথ তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। যাওয়ার আগে বাবাকে বললেন, ‘আমি তোমাকে এখান থেকে বের করে বাঁচাবার চেষ্টা করছি।’ ওখান থেকে বেরিয়ে তাঁরা সড়কের তলা দিয়ে যাওয়া চওড়া পাইপের দিকে দৌড়ে গেলেন। খোলা মাঠের মধ্য দিয়ে গাদ্দাফিসহ ১০-১২ জন হামাগুড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছালেন। পাইপের অপর প্রান্ত দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মিলিশিয়ারা তাঁদের দেখতে পায়। মিলিশিয়ারাও দৌড়ে গাদ্দাফিদের লুকিয়ে থাকা পাইপের ওপরের রাস্তায় চলে আসে। ইউনিস আবু বকর ইউনিসের জবানিতে: ‘দেখামাত্রই গাদ্দাফির দেহরক্ষীরা তাদের দিকে কয়েকটি গ্রেনেড ছোড়ে। কিন্তু তৃতীয় গ্রেনেডটি দেয়ালে বাড়ি খেয়ে আমাদের দিকেই পড়ল। একজন রক্ষী সেটা হাতে নিয়ে আবার ছোড়ার চেষ্টা করতে না-করতেই বিস্ফোরিত হলো। বাবা আহত হলেন, গাদ্দাফির গায়েও গ্রেনেডের শার্পনেল বিঁধল। দেখলাম, রক্ষীটি মারা গেছে, বাবার শরীর নিস্তব্ধ, গাদ্দাফির গা থেকে রক্ত ঝরছে, মনসুর ধাও-ও মাটিতে পড়ে আছেন!’
 
আহত ও বন্দী
মিলিশিয়ারা লাফিয়ে নামল সেখানে। তাদের ধারণাই ছিল না যে গাদ্দাফিকে তারা হাতে পেয়ে যাবে। তাদের উদ্যত বন্দুকের সামনে গাদ্দাফি কেবল বলতে পেরেছিলেন, ‘গুলি কোরো না, গুলি কোরো না।’ আনাড়ি হাতের তিন মিনিট ৩৮ সেকেন্ড দীর্ঘ একটি ভিডিওচিত্রের বরাত দিয়ে এইচআরসি বলছে, ‘আটক হওয়ামাত্রই তারা গাদ্দাফিকে মারধর করা শুরু করল। আগেই তিনি মাথায় বোমার আঘাত পেয়েছিলেন। রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় একজন তাঁর পেছনটায় বেয়নেট চালাল। সেই ক্ষত থেকেও রক্ত ঝরা শুরু হলো। গাদ্দাফিকে ঘিরে ‘আল্লাহু আকবর’ আর ‘মিসরাতা’ বলতে বলতে মারছিল তারা। মারতেই থাকল। মিসরাতায় সেই বিদ্রোহী কমান্ডারের সাক্ষ্য:
‘গাদ্দাফিকে আটকের সময় অবস্থা ছিল চরম গোলমেলে। চারপাশে অনেক যোদ্ধা। আমি যখন তাঁকে দেখি, তখনো তিনি জীবিত ছিলেন। তার মানে, তাঁকে গুলি করা হয় আরও পরে। তাঁকে একটা পিকআপ ট্রাকে রাখা হলো, কিন্তু তিনি পড়ে গেলেন। যোদ্ধারা তাঁর চুল ধরে টানছিল, মারছিল। পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল।’
অবশেষে তারা গাদ্দাফিকে একটা অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে রওনা হলো, পেছনে অজস্র গাড়ির বহর। ফোনে তোলা ভিডিওচিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রায় নগ্ন গাদ্দাফি একটা অ্যাম্বুলেন্সে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। এ থেকে বোঝা যায় যে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। দুই ঘণ্টা পরে অ্যাম্বুলেন্সটি মিসরাতায় পৌঁছায়। সেখানে তাঁর মৃতদেহ প্রকাশ্যে রাখা হয়। লিবীয় বিপ্লবের নেতা, একটা গোত্রীয় যাযাবর সমাজকে সমৃদ্ধ সেবামূলক দেশে পরিণত করার নায়ক, ৪২ বছরের একচেটিয়া শাসনের ক্ষমতা উপভোগকারী মুয়াম্মার গাদ্দাফি ইতিহাস হলেন। জীবনে অজস্র নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিতে দিতে নিজেও হয়ে গেলেন এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির প্রধান চরিত্র। 
 
কার হত্যা কে করে?
ঠিক কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। বেনগাজির কিছু মিলিশিয়া কৃতিত্ব দাবি করে বলেছে, তাঁকে কোথায় নেওয়া হবে, তা নিয়ে মিসরাতার যোদ্ধাদের সঙ্গে বিবাদের একপর্যায়ে তারা গাদ্দাফিকে গুলি করে। কিন্তু এই দাবিও প্রমাণিত হয়নি। ঘটনার ধারা অনুসরণ করলে দেখা যায়, ন্যাটোর নামে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন আর ফ্রান্সের তিনটি বিমান থেকে প্রথম গাদ্দাফির বহরে বোমা হামলা চালানো হয়। সম্ভবত গাদ্দাফির অবস্থান তারা আগেভাগেই জেনে গিয়েছিল এবং সে অনুযায়ীই হামলার পরিকল্পনা এঁটেছিল। মুতাসিমের নেতৃত্বে বহরটি গেরিলাদের এড়িয়ে মূল সড়কে উঠে পড়ার সময়ই হামলাটি হয়। বিমান হামলা না হলে গাদ্দাফির বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর মিসরাতায় গণহত্যার শুরু এই হামলা থেকেই। ন্যাটো বিমানের দুটি মিসাইলেই গাড়িবহর ধ্বংস হয়। তারপর আসে মিলিশিয়ারা এবং তাদের হাতেই মুয়াম্মার গাদ্দাফি, মুতাসিম গাদ্দাফি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউনিস নিহত হন। বিনাবিচারে যুদ্ধবন্দী হত্যার দায় তাই ন্যাটো এবং তাদের দেওয়া অস্ত্রসজ্জিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মিলিশিয়ারা এড়াতে পারে না। লিবিয়ার মরুভূমির অজ্ঞাত কোনো স্থানে গোপনে এই তিনজনের কবর দেওয়া হয়। গাদ্দাফির অনুগতরা কবরগুলোকে প্রতিরোধের প্রেরণা হিসেবে যাতে নিতে না পারে, তা ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা।
এই লিবিয়ার মরুভূমিতেই ১৯১১ সালে আরেকটি যুদ্ধের শুরু হয়েছিল। আগ্রাসী ইতালি বাহিনী লিবিয়া দখল করে নিলে মক্তবের শিক্ষক ওমর আল মুখতারের নেতৃত্বে ২২ বছরব্যাপী স্বাধীনতাযুদ্ধ চলে। অবশেষে ১৯৩৪ সালে মুখতার যুদ্ধরত অবস্থায় আটক হন। দখলদারেরা তিন দিনের মাথায় বন্দীদের শ্রমশিবিরে অনুসারীদের সামনে তাঁকে ফাঁসি দেয়। ইতিহাসের কী মর্মান্তিক মিল, মুখতার আর গাদ্দাফি বিনাবিচারে নিহত হন; মৃত্যুর সময় উভয়েরই বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। 
 
শেষ পর্ব আগামীকাল: মানবিক হস্তক্ষেপের অমানবিক যুদ্ধ
ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে