Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২০ , ২৪ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (31 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-২৩-২০১৭

লজ্জায় ফেলেছে বাংলাদেশিদের

হাসান ফেরদৌস


লজ্জায় ফেলেছে বাংলাদেশিদের

এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশের দুই উচ্চপদস্থ নাগরিক নিউইয়র্কে গৃহকর্মী নির্যাতন ও নিয়মমাফিক বেতন না দেওয়ার অভিযোগের সম্মুখীন হয়েছেন। তাঁদের একজন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের ডেপুটি কনসাল জেনারেল শাহেদুল ইসলাম, জামিনের অর্থ সময়মতো জমা না দিতে পারায় তাঁকে এক রাত হাজতে কাটাতে হয়েছে। অন্যজন জাতিসংঘের সামাজিক ও অর্থনীতিবিষয়ক দপ্তরের অন্যতম পরিচালক হামিদুর রশীদ। তাঁরা দুজনেই এখন জামিনে মুক্ত রয়েছেন।

ঘটনা দুটি অভিবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সঞ্চার করেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদ্বয় শুধু উচ্চপদস্থ কর্মচারীই নন, সামাজিকভাবে অত্যন্ত সম্মানিত। ডেপুটি কনসাল জেনারেল হিসেবে শাহেদুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে অভ্যস্ত ছিলেন। 

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হামিদুর রশীদ দারিদ্র্য ও দুর্নীতি বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। 

তাঁরা দুজনেই সুবিধাভোগী শ্রেণির অন্তর্গত। তাঁদের হাতে নিম্নবিত্ত মানুষের নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা সত্যি হলে তা একদিকে লজ্জার, অন্যদিকে গভীর বেদনার। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে ঘটনা দুটির সঙ্গে বাংলাদেশের নামটি জড়িয়ে ফেলায় এর সঙ্গে জাতীয় সম্মানের প্রশ্নটিও চলে এসেছে।

তাঁদের উভয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, যে বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁরা বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নিয়োগ করেছিলেন, সেই বেতন তাঁরা দেননি। কুইন্সের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি রিচার্ড ব্রাউন তাঁর অভিযোগনামায় জানিয়েছেন, শাহেদুল ইসলাম তাঁর গৃহকর্মীকে আদৌ কোনো বেতন দিতেন না। 

মাঝেমধ্যে তাঁর অতিথিদের কেউ কেউ খুশি হয়ে যে দু-চার ডলার গৃহকর্মীর হাতে গুঁজে দিতেন, সে অর্থই চেক আকারে শাহেদুল তাঁর গৃহকর্মীকে দিতেন। নিয়মিত বেতন দিচ্ছেন, এমন ‘মিথ্যা প্রমাণ’ তৈরি ছিল শাহেদুলের ওই প্রতারণার লক্ষ্য। তাঁর বিরুদ্ধে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

হামিদুর রশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও গুরুতর। জাতিসংঘের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে এই সংস্থার মাধ্যমে বিশেষ ভিসায় তিনি বাংলাদেশে তাঁর সাবেক গৃহপরিচারিকাকে নিউইয়র্কে নিয়ে আসেন। প্রতি সপ্তাহে তাঁকে ৪২০ ডলার বা ঘণ্টাপ্রতি সাড়ে ১০ ডলার বেতন দেবেন, এই মর্মে একটি চুক্তিপত্র সম্পাদন করে ও তাঁর অনুলিপি জাতিসংঘে বিভাগীয় দপ্তরে জমা দেন তিনি। গৃহকর্মীকে প্রতিশ্রুত বেতন নিয়মিত দিচ্ছেন, এই প্রমাণপত্রও তিনি নিয়মিত দপ্তরে জমা দিতেন। 

কিন্তু ম্যানহাটনের অস্থায়ী ফেডারেল কৌঁসুলি আদালতে তাঁর অভিযোগনামায় বলেছেন, রশীদ তাঁর গৃহকর্মীর সঙ্গে একটি দ্বিতীয় চুক্তি করেন, যাতে সাপ্তাহিক বেতনের পরিমাণ ধার্য করা হয় ২৯০ ডলার বা ঘণ্টাপ্রতি ৭ ডলার ২৫ সেন্ট। শুধু তাই নয়, খাওয়া ও থাকা বাবদ ৭৫ ডলার কেটে নিতে পারবেন এমন শর্তও তাতে অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে গৃহকর্মীটির ঘণ্টাপ্রতি বেতন কমে দাঁড়ায় সাড়ে তিন ডলারে। তাঁর অপরাধের এখানেই শেষ নয়। 

তিনি তাঁর গৃহকর্মীর নামে নিজে একটি ব্যাংক হিসাব খোলেন, নিজের নাম ব্যবহার করে তাঁর বেতনের টাকা তিনি নিজেই জমা দিতেন ও তুলতেন। গৃহকর্মীকে সরাসরি দেওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশে তাঁর স্বামীর কাছে সে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন হামিদুর। তিনি গৃহকর্মীর ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে একটি কার্ড নিয়ে নিজে ব্যবহার করতেন, এর প্রমাণ (‘এটিএম ইমেজ’) তাঁর হাতে রয়েছে বলে সরকারি কৌঁসুলি আদালতকে জানান।

তৃতীয় বিশ্বের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক কর্মকর্তাদের হাতে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। কুয়েত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশসমূহের কূটনীতিকদের হাতে গৃহকর্মী নির্যাতনের ব্যাপক নজির আছে। নব্বইয়ের দশকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের একজন স্থায়ী প্রতিনিধিও একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। চার বছর আগে নিউইয়র্কে ভারতের ডেপুটি কনসাল জেনারেল একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বড় রকমের বচসার সূচনা হয়।

মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে এমন বিভিন্ন সংস্থার মতে, কূটনীতিকদের হাতে গৃহকর্মী নির্যাতন ও বেতন না দেওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের হিসাব অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে বছরে কূটনৈতিক সূত্রে দুই হাজার বা তার চেয়েও বেশি কর্মীকে গৃহভৃত্যকে আনার সুযোগ দেওয়া হয়। অনেক সময় এরা বিভিন্ন নির্যাতনের সম্মুখীন হয়। বেতন কম দেওয়া বা আদৌ না দেওয়ার ঘটনা ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রেই এরা দৈহিক নির্যাতন, পাসপোর্ট লুকিয়ে রাখা, পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার মতো ভয়ভীতির সম্মুখীন হয়।

তৃতীয় বিশ্বের বাইরে অন্য কোনো কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে গৃহকর্মীর সঙ্গে অপব্যবহারের এ ধরনের অভিযোগ কার্যত নেই। শুধু আমাদের মতো দেশের কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠে কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতের সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক এই প্রতিবেদককে জানান, নিজের দেশে গৃহভৃত্যের সঙ্গে এমন ব্যবহার করে এরা অভ্যস্ত। কূটনীতিক হলেও এঁরা খুব স্বল্প বেতন পেয়ে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্রে গৃহকর্মীদের জন্য নির্ধারিত বেতন দেওয়া তাঁদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। জাতিসংঘ কর্মীদের ক্ষেত্রেও গৃহকর্মীদের স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত ন্যূনতম বেতনের কম দেওয়া যাবে না, এই নিয়ম রয়েছে।

জাতিসংঘে কাজ করেন এমন একাধিক বাংলাদেশি এ ঘটনায় তাঁদের লজ্জার কথা জানিয়েছেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, তাঁদের সহকর্মীদের কেউ কেউ এ নিয়ে বিদ্রূপ করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, নিউইয়র্ক টাইমস এ নিয়ে যে প্রতিবেদনটি ছেপেছে, তাতে কিছুটা পরিহাসের সঙ্গে বলা হয়েছে, হামিদুর রশীদ দারিদ্র্য ও দুর্নীতিবিরোধী কাজ করেছেন।

এ কথা উল্লেখ করা দরকার যে অভিযুক্ত হলেও এই দুই বাংলাদেশির কেউ এখন পর্যন্ত দোষী প্রমাণিত হননি। নির্যাতন করেও কূটনৈতিক নিষ্কৃতি বা ইমিউনিটির অজুহাতে এসব কূটনীতিক অনেক সময় ছাড়া পেয়ে যান। জাতিসংঘে কর্মরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবশ্য এই কূটনৈতিক নিষ্কৃতি কার্যকর নয়, জাতিসংঘের একজন মুখপাত্র ইতিমধ্যেই সে কথা জানিয়েছেন। দোষী প্রমাণিত হলে এই দুই বাংলাদেশি ১৫ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময়ের জন্য সাজা ভোগ করতে পারেন।

বিদেশে কূটনীতিকদের অনৈতিক ব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারের, বিশেষত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো দায়দায়িত্ব আছে কি না, জানতে চাইলে বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক বলেন, এ ব্যাপারে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। ‘কিন্তু আসল দায়িত্ব তো আমাদের, অর্থাৎ কূটনীতিকদের। নীতিমালা করা যায়, কিন্তু যাঁরা সে নীতিমালা পালন করবেন তাঁরা যদি নিজের দায়িত্ব বিষয়ে উদাসীন হন, তাহলে সরকার একা কী করতে পারে?’

আর/১৭:১৪/২৩ জুন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে