Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১২ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-১০-২০১২

নিশ্চিন্তপুর ট্র্যাজেডি : জীবন-মৃত্যুর ম্যানেজারি

ফারুক ওয়াসিফ



	নিশ্চিন্তপুর ট্র্যাজেডি : জীবন-মৃত্যুর ম্যানেজারি

কত মানুষ পুড়ে গেছে নিশ্চিন্তপুরে! তবু নিশ্চিন্তপুরে মানুষ আর মানুষ। অভিশপ্ত সেই তাজরীন ফ্যাশনসের ঠিক আগে রাস্তার ধারে মানুষের জটলা। কালো মতো এক মধ্যবয়সী মানুষকে ঘিরে। লোকটির সারা গায়ে ধুলামাখা, পরনে লুঙ্গি আর শার্ট। লোকে তার নামধাম জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু তাঁর মুখে কথা নেই, চোখে ভাষা নেই। একজন বলল, মৃগী রোগী। হতে পারে। সঙ্গের ব্যাগ থেকে বোঝা গেল, লোকটি এলাকার নন। নিখোঁজ কাউকে খুঁজছেন কি তিনি? তাজরীনে কি তাঁর কেউ কাজ করতেন? শোকে-দুঃখে পাথর হয়ে গেছেন?

চাঁদপুরের স্বর্ণা গ্রামের আসমা আক্তারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ২ ডিসেম্বর। তিনিও খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছেন ঢাকায়। তাজরীন ফ্যাশনসে তাঁর বোন নাসিমা, বোনজামাই আর কন্যা কাজ করতেন। অন্তিম সময়ে আগুনের মধ্যে থেকে বোন তাঁকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আমরা আর বাঁইচত পারতাম না, তুমি আমাগো লাশ নিত আইস।’ আসমা আক্তার তাই আশুলিয়া থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিজিএমইএ ভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের রাজদুয়ার পর্যন্ত স্বজনের লাশ দাবি করে গেছেন। পাননি। বুক চাপড়ে তিনি বলছিলেন, ‘আমাগো লাশ গুলা না দিক, আমারেসহ জ্বালাইয়া দিক। আমার টাকা লাগত না।’ কেউ শোনেনি, শোকে আর রাগে তিনি একাই জ্বলছেন। সরকার ভুলতে পারে নাগরিককে, মা কীভাবে ভুলবেন নাড়িছেঁড়া কন্যাকে? জীবনের অধিকার না হোক, লাশ পাওয়ার অধিকার ছাড়বেন কেন তিনি? তাই ছুটে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশের রাজধানীতে।
 
উঁচু উঁচু ভবন, খাটো খাটো মানুষ
সাভারের বাইপাইল থেকে ডানে ঘুরে ম্যাক্সি ভ্যানে উঠলে ১৫ মিনিট পরেই নিশ্চিন্তপুর। শুক্রবার হওয়ায় অনেক শ্রমিকেরই সেদিন ছুটি। রাস্তার আশপাশ, বাজার, কসমেটিকসের দোকান, মুঠোফোনে গান ডাউনলোড করার দোকান—সবখানেই মানুষের মুখ। মানুষ আর ভবন, ভবন আর মানুষ দেখতে দেখতে জ্ঞান হলো: নিশ্চিন্তপুর উঁচু উঁচু ভবন আর খাটো খাটো মানুষের স্থান। যাঁরা পুড়ে মরেছেন, তাঁদের উচ্চতা জানি না। কিন্তু এই যাঁরা নিশ্চিন্তপুরজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, কাজ করছেন, তাঁদের ৯০ ভাগেরই উচ্চতা পাঁচ ফুটের দু-এক ইঞ্চি এদিক-ওদিক। মেয়েদের উচ্চতা আরও কম। গ্রামের গরিব মানুষের অপুষ্টি আর দৈহিক অবিকাশের প্রমাণ এসব মানুষ। অভাব তাঁদের এমন বানিয়েছে, অভাবই তাঁদের ঠেলে নিয়ে এসেছে পোশাক কারখানায়। অভাবের আগুন থেকে বাঁচলেও তাঁরা পুড়ে মরেছেন মুনাফার আগুনে।
 
সব অশ্রুই সমান নোনা
মূল সড়ক থেকে বাঁয়ে ঢুকে গেলেই বাজার আর দোকানের সারি। বাজারের মধ্যেই চায়ের দোকানে বসে কথা হলো মানিকের সঙ্গে। দোকানটা সুজনের। মানিক, সুজা, জয়নাল সেখানে বসা। তিনজনই তরুণ এবং তিনজনই নিশ্চিন্তপুরের অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেডের শ্রমিক। কত মানুষ সেদিন আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন—জানতে চাইলে মানিক বলেন, ‘কমপক্ষে ৫০০।’ সুজা বলেন, ‘আরও বেশি।’ জয়নালের ভাষ্য হলো, ‘বেশি লোক তো বারাইতে পারে নাই।’ চায়ের দোকানদার সুজন বলেন, ‘যত ভ্যানরে দ্যাখছি লাশ নিয়া যাইতে, সেই সংখ্যা সরকারের ১১১-এর অনেক ওপরে।’ 
নিশ্চিত হওয়ার উপায় রাখেনি সরকার, তাই নিশ্চিন্তপুরের মানুষ অনিশ্চিত। ১১১ জনের নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে সরকার। অথচ নিউইয়র্ক টাইমসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে উপস্থাপিত হওয়া সর্বোচ্চ সংখ্যা ১২৫। ৮ ডিসেম্বর ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে অ্যাকটিভিস্ট নৃবিজ্ঞানী নামে একটি গবেষক দল জরিপ ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দাবি করেছে, সরকারঘোষিত ৫৩ জন নন, কমপক্ষে ৫৯ জন শ্রমিক নিখোঁজ। তারাও দেখতে পেয়েছে, এলাকার মানুষের চোখে মৃতের সংখ্যা ১১১-এর থেকে অনেক বেশি। সরকারের চোখে যে লাশগুলো কেবলই সংখ্যা, তা আসলে মানুষের একেকটি জীবন, পরিবারের স্বজন, নাম-চেহারা-পরিচয়বান নাগরিক। হোক তারা উচ্চতায় খাটো, তাদের রক্তও তো লাল, তাদের অশ্রুও তো নোনা, স্বজন হারানোর যন্ত্রণা কারও চেয়ে কম নয় তাদের। 
 
পোড়া মাংসের ঘ্রাণ
‘ওই কারখানা টিকব না, সব ঝুরা ঝুরা হয়া রইসে, দুই দিন বৃষ্টি হইলেই ধইসা পড়ব’, বলেছিলেন মানিক। তা দেখতে পড়ন্ত বিকেলে তাজরীন ফ্যাশনসের বিশাল আটতলা দালানটির সামনে দাঁড়ালাম। কালো ধোঁয়ায় সামনের দিকের অনেকটাই কালচে। লোহার গেটের সামনে কৌতূহলী জনতা। তাদের পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। জনা ১৫ শিল্প পুলিশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছেন। তাঁদের কর্তাকে পরিচয় দিয়ে ভবনটায় ঢুকলাম। ভেতরে অদ্ভুত এক গন্ধ। কাপড়ের গন্ধের সঙ্গে মানুষের হাড়-মাংস-চুলের গন্ধ মেশানো। বিকেলের শেষ আলো জানালা গলে ফলকের মতো এসে পড়েছে পুড়ে কালো হওয়া সিঁড়িতে। মেঝের টাইলস পুড়ে-ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড, ছাদ যেন খরায় চৌচির মাটি। একের পর এক তলা পার হয়ে গেলাম। প্রতিটি তলাতেই লম্বা বিরাট হলঘর, তার কলাপসিবল গেট বন্ধ, ভেতরে শত শত সেলাই মেশিন আর চেয়ার। সবই সম্পূর্ণ বা আধপোড়া। ছাদ দেয়াল আর থাম ঢেকে আছে জমাট ধোঁয়ার কালো চাদরে। 
হঠাৎ যেন মৃত্যুপুরী জেগে উঠল। কর্মমুখর দৃশ্য চোখের সামনে। শত শত তরুণী একমনে কাজ করে চলেছেন। কেউ বা পাশের জনের সঙ্গে একটু হাসাহাসি করে নিচ্ছেন। সুপারভাইজাররা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ডে-কেয়ারের চত্বরে শিশুরা হইচই কান্নাকাটি লাফালাফি করছে। হুঁশ ফিরলে নিমেষেই সব মুছে গেল। চোখের সামনে দেখি, কালো ছাইয়ে ঢাকা একটি স্যান্ডেল—মেয়েদের। আরেকটি জায়গায় দেখি লাশ মোড়ানোর ১৫-২০টি সাদা ব্যাগ, হয়তো বেঁচে গেছে। সব কটি গেটে নতুন তালা দেওয়া। পুরোনো তালাগুলোও আছে পাশে। তার মানে, মানুষগুলো যখন পুড়ছিল তখন চাবিওয়ালা আসেননি, কিন্তু পরে ঠিকই লাশ বের করার জন্য এসেছেন। তালাগুলো খুলে আবার লাগিয়েও দিয়েছেন।
একেবারে ছাদে দেখলাম অদ্ভুত এক দৃশ্য। প্লাস্টিকের বড় বড় পানির ট্যাংকের কোনোটিতেই পানি নেই। একটার কাছে টেবিলের মতো একটা কিছু দাঁড় করানো। তার নিচে মেঝেতে একটি স্টিলের টিফিন ক্যারিয়ার ছত্রখান হয়ে পড়ে আছে। আগুনে পোড়া মানুষগুলো কি টেবিল দিয়ে পানির ট্যাংকে উঠে টিফিন ক্যারিয়ারের বাটি দিয়ে পানি তুলে গায়ের আগুন নেভাতে চাইছিলেন?
ছাদ থেকে নামতে নামতে হিসাব কষছিলাম: নিচের এবং একদম ওপরের তলা বাদ দিলে বাকি ছয়তলার প্রতিটিতে তিন শ থেকে চার শ শ্রমিকের কাজ করার কথা। সেই হিসাবে কমপক্ষে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক সে সময়ে ভেতরে ছিলেন। ভবনের বাইরের দিকে কোনো ফায়ার এক্সিট ছিল না। নিচতলার দরজা বন্ধ ছিল, প্রতিটি ফ্লোরের কলাপসিবলও ছিল আটকানো। সুতরাং আটকে পড়া শ্রমিকদের জানালা ছাড়া বাইরে বেরোনো বা লাফিয়ে পড়ার কোনো সুযোগও ছিল না। কোনো কলাপসিবল গেট ভাঙার চিহ্নও দেখিনি। জীবন-মৃত্যুর ম্যানেজারের নির্দেশে লাগানো তালা খোলা হয়নি। এর একটাই অর্থ: ধোঁয়ায় বা আগুনে পুড়ে মরা বা আহত হতে থাকা ছাড়া কারও কোনো উপায় আসলেই ছিল না। এবং জীবন-মৃত্যুর চাবি যাঁর হাতে, সেই চাবিওয়ালাও অজ্ঞাত কারণে আসেননি! সুতরাং পুড়ে কাবাব হওয়া শ্রমিকের সংখ্যা মাত্র ১১১ হওয়াটা অবিশ্বাস্য!
 
হে জীবন-মৃত্যুর ম্যানেজার
সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রই নাগরিকদের জীবন-মৃত্যুর দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার বা ব্যবস্থাপক। রাষ্ট্র চাইলে আইনত জীবন নিতে পারে, কিন্তু নাগরিকদের জীবন রক্ষার দায়িত্বে অবহেলার কোনো সুযোগ তার নেই। জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধনের দায়িত্বও এই ম্যানেজারের ওপরই ন্যস্ত। নাগরিকেরা যাতে তাদের সাংবিধানিক অধিকার পায় এবং সেই অধিকার পেতে যাতে কোনো বাধা না থাকে, বা কেউ বাধা দিলে তাকে ঠেকানোর ব্যবস্থাপকও রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের ম্যানেজারির কাজ করে সরকার ও প্রশাসন। তাদের ব্যবস্থাপনার গুণে গ্রামের মানুষের উচ্চতা কমে যাচ্ছে আর শহরে উঁচু উঁচু ভবন উঠছে। পোশাকশিল্প খাতের মালিকেরা সেই সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবহেলায় গণমৃত্যুর দায়মুক্তি উপভোগ করে আসছেন। জলজ্যান্ত মানুষ পুড়ে মরছে এবং তাদের লাশগুলোও গায়েব হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ নিয়ে চলছে টালবাহানা। জীবন-মৃত্যুর নিদায় ম্যানেজারের ভয়ংকর দোষের শিকার তাজরীনের পোড়া মানুষগুলো। 
আমার হাতে এখন তাজরীনের ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া কয়েক হাজার শ্রমিকের নাম, বেশ কটি পরিচয়পত্র এবং আর অনেক শ্রমিকের ছবি। কী তারুণ্যভরা চেহারা আর কী সুন্দর সুন্দর সব নাম: আদুরী, কনক, খুরশেদা, হেলেনা, লিলিফা, জুয়েল, আশুরা, আয়শা, শাহারা, দেলোয়ার...। কত নাম কত মুখ। এঁরা সবাই আমাদের ভাইবোন, আমাদের সহ-নাগরিক। হে জীবন-মৃত্যুর ম্যানেজার, এঁদের কতজন বেঁচে আছেন, কতজন মরে গেছেন, তার জবাব দিন। আমরা জানতে চাই, কার অপরাধে এই পৃথিবীতেই তাঁরা দোজখ-যন্ত্রণা পেলেন!!!
ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে