Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২০ , ২৫ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.7/5 (47 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২২-২০১২

দুই নৌকায় পা দেওয়ার দিন শেষ

আনিস আলমগীর



	দুই নৌকায় পা দেওয়ার দিন শেষ

‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরাও চাই কিন্তু সেটা হতে হবে নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন।’ এ রকম একটি বাক্য আজকাল টিভিতে কিছু কথিত ‘টকশোজীবীর’ মুখে ফ্যাশনের মতো শুনি। ওদের মুখে এই বাক্য শোনার পর তাদের মনে কী আছে সেটা বুঝতে কারও কষ্ট করতে হয় না। টকশোর পর পরই তাদের ওইসব বুলি দিয়ে, ছবি দিয়ে, কার্ড বানিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে কেন তারা এসব বুলি দেন, কারা এসব ছড়ায়, কী কাজে ছড়ায়— সবাই জানে। পাগলও বোঝে। শুধু ওইসব টকশোজীবী আর জামায়াত-শিবিরের প্রোপাগান্ডা সহযোগীরা মনে করেন— এ জাতি নির্বোধ, এসব ছলাকলা তারা কিছুই বোঝে না। জাতি বোঝে না, এরা টক শোর জন্য হাজার দুয়েক টাকার একটা খাম পেলেও, সেই মুখ দেখানো আর দশ-পনেরো মিনিটের বুলির জন্য বিশেষ দলের বিশেষ ফান্ড থেকে পান ‘মাসোহারা’।

জামায়াত নেতারা তো এমনটা বলবেনই, কিন্তু বিএনপির জামাতপন্থী কিছু নেতাও আজকাল জোরেশোরে বলছেন,  তারাও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান কিন্তু সেটা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। আমি বলি, এই মাননির্ণয়ের ব্যারোমিটার কী? এখন যেভাবে বিচার হচ্ছে, তা নিম্নমানের হল কীভাবে? নুরেমবার্গের বিচারে যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের কোনও বিধিবিধান ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের ট্রাইব্যুনালের রায়ের পরে তো তারা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আপিল, দর-আপিলের মাধ্যমেই তো বিচারিক ত্রুটি থাকলে তা দূর হয় জানি।
 
ক’দিন শোরগোল গেল বিচারপতির সঙ্গে এক বিষেশজ্ঞের ‘স্কাইপ সংলাপ’ নিয়ে। পড়লাম কষ্ট করে দিস্তা দিস্তা— আঞ্চলিক, সাধু-চলিত বাংলা, ইংরেজি মেলানো সংলাপগুলো। সেটাতে একবারও মনে হল না কাউকে সাজানো রায়ের মাধ্যমে, বিনা বিচারে দণ্ডিত করার চেষ্টা চলছে।
 
বিচারপতি পদত্যাগ করলেন। এবার শোরগোল যেন আরও প্রাণ পেল। যেসব কথিত বুদ্ধিজীবী, টকশোজীবী, জামায়াতপন্থী বিএনপি নেতা বলছিলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান, কিন্তু সেটা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন’ তারা এবার বলা শুরু করলেন, বিচার হতে হবে ‘ফের পহেলে চে’, আবার শুরু করতে হবে বিচার প্রথম থেকে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানবদল হয়েছেন। নতুন বিচারপতি, তাই নতুন করে বিচার আরম্ভ করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, যারা বিচারই চান না, তাদের কাছে শুরুইবা কী, শেষইবা কী। তাদের কেউ-কেউ এটাও বলেন, ‘৪০ বছর পর আবার কিসের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার? শেখ মুজিব কেন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়েছেন?’ বঙ্গবন্ধু কেন সেদিন বিচার করলেন না, দ্বিপক্ষীয় সে বিষয় নিয়ে আরেক দিন লিখব ভাবছি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীপ্রেমীদের এইটুকু বলে রাখি, স্বাধীনতার পর-পর যদি গোলাম আযম-নিজামীদের বিচার করা হত, তারা তাহলে তাদের পক্ষে এত টকশোজীবী, বুদ্ধিজীবী কোথায় পেতেন? কোথায় পেতেন সাত হাজার সাফাই সাক্ষি, কোথায় পেতেন ডজন-ডজন উকিল? মাঝপথে এসে মন্ত্রীইবা হতেন কীভাবে? চান-তারা পতাকা নিয়ে তারা তো কোনও দিন মন্ত্রী হননি! এখন দেখছি বিলম্ব তো তাদের জন্য সাপে বর হয়েছে।
 
যুদ্ধাপরাধীপ্রেমীদের আরেকটি মামুলি বাক্য হচ্ছে, ৪০ বছর পর এই বিচারের  প্রশ্ন এনে জাতিকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অতীতে হাঁটছি শুধু আমরা, সামনের দিকে এগোব কীভাবে! আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের সব ফ্রন্টে পরাজিত করেছি, কিন্তু  ৪০ বছর পর এসে যদি দেখি জামায়াত-শিবির নামে পাকিস্তানিদের একটা ফ্রন্ট এখনও টিকে আছে তখন কী করার আছে? জাতি হিসেবে তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করতেই হবে। এ বিষয়ের ইতিটানা জাতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। কত বছর পর বিচার হচ্ছে, সেটা এখানে বিষয় না; ঘটনাই এখানে প্রধান বিষয়। কারণ নিরপরাধীর মৃত্যু হয় একবার আর অপরাধীর মৃত্যু হয় চিরকাল। জগত্ চিরকাল অপরাধীদের বিচারের আসনে বসাবে আর ইতিহাসের সাক্ষ্য নিয়ে তাদের ওপর দণ্ডাদেশ ঘোষণা করবে। এটাই অপরাধীর নিয়তি। এই নিয়মের যারা অবজ্ঞা করেন, তারাও অপরাধী।
 
গোলাম আযমরা ১৯৭১ সালে কোনও রাখঢাক করে মানুষ হত্যা করেনি, বাড়ি-বাড়ি গিয়ে আগুন দেয়নি, নারী নির্যাতন করেনি বা বুদ্ধিজীবী হত্যা করেনি— তারা সবই করেছে প্রকাশ্য দিবালোকে, নিখুঁত স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে। জেলায়-জেলায় তারা আলবদর, আলশামস দিয়ে ডেথ ক্যাম্প খুলেছিল। তারা বলে কয়ে সব কিছু স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে করেছে। সুতরাং তাদের বিচার করতে অস্বচ্ছতার আশ্রয় নিতে হবে কেন! মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে কোন দুঃখে! এ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সত্যকে সত্য দিয়েই বিচার করা হচ্ছে। কতিপয় মাসোহারা পাওয়া টকশোজীবী, কথিত বুদ্ধিজীবী, জামায়াতি এবং জামায়াতপন্থী বিএনপি নেতা ছাড়া দেশের সবার কাছে এ বিচারকে স্বচ্ছ মনে হচ্ছে। ১৯৭১ সালের সাড়ে সাত কোটি বাঙালির যারা এখনও বেঁচে আছেন, তাদের সবাই তো এই বিচারের সাক্ষি।
 
১৯৭১ সালের ২ জুন ‘লন্ডন টাইমস’ লিখেছে, ‘ছাত্ররা তাদের বিছানায় মারা গেছে, নারী ও শিশু তাদের ঘরে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়েছে।’ ৩ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ লিখেছে, ‘একজন বৃদ্ধলোক যখন সিদ্ধান্ত নিলেন সান্ধ্য-আইনের চেয়ে শুক্রবারের নামাজ অধিক গুরুত্ববহ, তখন তিনি মসজিদের দিকে পথচলা আরম্ভ করলেন। আর কিছু দূর যেতে না যেতেই বৃদ্ধকে গুলি করে হত্যা করা হল।’ ২৭ মে টেলিগ্রাফ লিখেছে, ‘আলবদর বাহিনী দিয়ে হালুয়াঘাটে যুবকদের একত্রিত করে পাকিস্তানি সৈন্যরা জানায় যে, আহত পাকিস্তানি সৈনিকদের জন্য রক্তের প্রয়োজন। রক্ত দেওয়ার জন্য যুবকদের শুয়ে পড়ার পরামর্শ দেওয়া হল। আর যুবকরা যখন শুয়ে পড়ল তখন তাদের শরীরে সুই ঢুকিয়ে রক্ত নেওয়া আরম্ভ করল। ছেলেগুলো রক্তশূন্য হয়ে মরে যাওয়া পর্যন্ত সুই তুলে দেওয়া হল না।’ ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট নিউইয়র্ক ম্যাগাজিন লিখেছে, ‘৫৬৩ জন বাঙালি যুবতিকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে রাখা হয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা পর্যায়ক্রমে এসব যুবতির সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হয়। অধিকাংশ যুবতি বর্তমানে গর্ভবতী।’ এমন নির্মম নিষ্ঠুর বাহিনীকে সহযোগিতা করতে যারা পাপবোধ করেনি বরং ইসলাম রক্ষার জেহাদ বলে ধর্মীয় লেবাস পরাবার চেষ্টা করেছে, তাদের মতো নরপশুদের বিচার না করাও আরেকটা পাপ। বিচার এড়িয়ে যাওয়া হবে আমাদের আরেকটি অপরাধ।
 
ভিত নড়ে গেলে দেয়াল ঠিক থাকতে পারে না। আজকে বাঙালি জাতির ভিত ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র  হচ্ছে দেশে-বিদেশে। তাকে মোকাবিলা করতে হবে। জামায়াতিরা যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে বায়তুল মোকাররমের গেটে জনসভা করতে চেয়েছিল ডিসেম্বর মাসে, সেটা করতে দেওয়া হয়নি। সেটা আইনি কী বেআইনি এই প্রশ্নে কয়দিন আগে চীনাপন্থী এক টকশোজীবী বলেছেন, ‘আমাদের ভুললে চলবে না আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জনতা বিচারকের ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল।’ কী নির্লজ্জ দালালি জামায়াতিদের জন্য! কত বড় সাহস! স্বাধীনতার প্রসব যন্ত্রণার প্রত্যূষে যে ঘটনা বাঙালি ঘটিয়েছিল নরঘাতকদের বিচার বন্ধে, সে ঘটনা ঘটানোর জন্য কতিপয় টকশোজীবী আজ উস্কানি দিচ্ছে এভাবেই। এটা স্পষ্ট যে কিছু টকশোজীবী, বুদ্ধিজীবী, কিছু সংগঠন আর কিছু  রাজনীতিবিদ আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে একজোট হয়েছেন, নানারকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। ষড়যন্ত্রকারীরা গত ৪০ বছর ধরে দৃঢ়মূলে ভিত্তি গেড়েছেন। তাকে প্রতিহত করা কিছু কঠিন হলেও সাধ্যাতীত নয়। স্বাধীনতাপন্থীদের আজ তাই সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।
 
আনন্দের বিষয় যে, এবারের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উত্যাপনে সারা দেশে লাখ-লাখ মানুষ রাস্তাায় নেমে এসেছিল। এ যেন মানুষের বিস্ফোরণ। তাদের সবার কণ্ঠে ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি। হয়তোবা আওয়ামী  লীগের গত চার বছরের শাসনে মানুষ সন্তুষ্ট হতে পারেনি, তাই আওয়ামী লীগের ওপর তাদের বিরক্তি থাকতে পারে, কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে তাদের কোনও বিরক্তি ও আপত্তি নেই। ১৬ ডিসেম্বর সেটা জানিয়ে দিয়েছে তারা। যেসব মুক্তিযোদ্ধা বিজয় দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন তারাও তাদের অভিব্যক্তি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন— যুদ্ধাপরাধী বিচার প্রশ্নে আপস নেই। গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, আবদুল আলীম, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, কামারুজ্জামান, কাদের মোল্লা, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, আবুল কালাম আযাদের মতো লোকদের যুদ্ধাপরাধ নিয়ে জাতির কোনও সন্দেহ নেই। তারাই যুদ্ধের সময় পদে-পদে বাধা সৃষ্টি করেছে, পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে দিয়েছে, নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে, নারী নির্যাতন করেছে, বাড়ি-বাড়ি তল্লাশি করে বুদ্ধিজীবীদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছে।
 
যারা স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলে বিচারকাজকে আরও প্রলম্বিত করতে চান, জাতিকে বোকা না ভেবে তাদের হুঁশ ফিরে আসা উচিত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিরও অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত। কলা-কৌশলে দুই নৌকায় পা রাখার কোনও অবকাশ নেই। ১৯ ডিসেম্বর বিএনপি মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও ছিলেন সেখানে। বেগম জিয়া কিছুদিন আগেও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত বন্দিদের মুক্তি দাবি করেছেন। খালেদা জিয়া যদি এসব যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি তার সহানুভূতি অব্যাহত রাখেন, তাদের মুক্তির দাবিতে জামায়াতের ডাকা হরতালে নৈতিক সমর্থন দেন, তখন মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া এই সংবর্ধনা প্রহসনে পর্যবসিত হয়। অপমাণিত হয় তার দলের মুক্তিযোদ্ধারা, তার সমর্থক মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে লাখ-লাখ মানুষ। সে কারণে খালেদা জিয়া এবং বিএনপি নেতাদের স্পষ্টভাবে বলার সময় এসেছে তারা প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় কি চায় না। কোনও কারণে এই সরকার আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ না হলে আগামীতে তারা যদি ক্ষমতায় আসেন— যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করবেন কি না। যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে জাতিকে বিপদগামী করার কোনও জামায়াতি ষড়যন্ত্রে বিএনপি যদি পা দেয়, সে পথ হবে অনেক ভয়ঙ্কর। এই পথে হেঁটে বিজয় পর্যন্ত পৌঁছতে না পারলে বিনাশ অনিবার্য। কারণ বাঙালি জাতি তার স্বাধীনতার গৌরবের কাছে, কোনও নেতা-নেত্রী বা দলের প্রতি তাদের ভালবাসাকে তুচ্ছ করতে তোয়াক্কা করবে না। এই দেশে স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তি অন্যের গাড়ে বসে গাড়িতে লাল-সবুজ পতাকা লাগাতে পারবে সত্য কখনোই বিজয়ী হতে পারবে না।
 
লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে