Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ৭ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 1.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২২-২০১২

ভয়ের হাতে যখন দেশের লাগাম

ফারুক ওয়াসিফ



	ভয়ের হাতে যখন দেশের লাগাম

জীবনের গল্প, আশার গল্প চাপা পড়ে যাচ্ছে। চারদিকে এখন যেন মৃত্যুরই ইঁদুরদৌড়। কে কত বিচিত্র উপায়ে মরতে বা মারতে পারে, তার আন্দাজ করা কঠিন। আপনার শান্ত সুন্দর চলাফেরা কত বীভৎস দৃশ্যের পরিণতি পাবে, তা কেউই বলতে পারে না। কিংবা যে আপনি আজ অন্যের বিপদের কথা পত্রিকায় পড়ছেন বা চানাচুর খেতে খেতে তার চলমান ছবি দেখছেন টেলিভিশনে, পরদিন হয়তো আপনাকেই তেমনই বিপদের মধ্যে আবিষ্কার করবে অন্য কোনো টেলিভিশনের দর্শক। নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাস হারবার্ট-এর একটি কথা আমাদের জন্য দৈববাণী হয়ে উঠেছে: ‘কখন কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটবে এবং তা কে ঘটাবে তা জানতে রাষ্ট্রযন্ত্রের এখনো বাকি আছে’। কখন কোথায় কে কীভাবে খুন হবে বা অপঘাতে প্রাণ হারাবে, তা কেউ বলতে পারে না। 

রত্না নামের যে মা দুটি শিশুসন্তান নিয়ে জেলে আটক স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন রিকশায় করে, তিনি জানতেন না বিকল রেলক্রসিংয়ে তাঁর জন্য মৃত্যু হানা দিয়ে আছে। কিংবা তাঁর যে স্বামী রিপন খন্দকার, যিনি কিনা একটি হোটেলের ম্যানেজার, তিনিও ১১ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় জানতেন না, পুলিশ তাঁকে ধরার জন্য ওত পেতে আছে। তার আগের দিন ছিল বিএনপি জোটের অবরোধ। সেই অবরোধে মার খাওয়া ও প্রতিহিংসাপরায়ণ পুলিশ যদি সেদিন তাঁকে ধরে নিয়ে হাজতে না পাঠাত, তাহলে রত্নাকেও হয়তো জেলখানা অভিমুখে দুই সন্তান নিয়ে রওনা হয়ে মৃত্যুর ফাঁদে গিয়ে পড়তে হতো না। বিশ্বজিৎও বুঝতে পারেনি, দ্বিদলীয় হানাহানির মধ্যে কতটা উদোম হয়ে পড়েছিল তাঁর জীবন। কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘এত যদি ব্যূহচক্র তীর তীরন্দাজ/ তবে কেন শরীর দিয়েছ প্রভু, বর্মখানে গেছ ভুলে দিতে’। রাজনীতির তির, মুনাফার তির, বিশৃঙ্খলার তির, দায়িত্বহীনতার তিরে তিরে জর্জরিত আমাদের জীবনের নিরাপত্তা। আমরা আজ সত্যিই বর্মহীন। রাষ্ট্র ও রাজনীতি এই বর্ম হতে পারত, কিন্তু তারা হয়েছে তার উল্টোটা। 
ঈর্ষা-হিংসা জীবিত মানুষদের ছায়াসঙ্গী। কিন্তু দুনিয়ায় এমন দেশও আছে, সেখানে এক মৃত আরেক মৃতকে ঈর্ষা করতে পারে। দুই ধরনের মৃত্যুর মধ্যে প্রতিযোগিতা হচ্ছে এখন বাংলাদেশে। মানবিক মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে অমানবিক মৃত্যু। স্বাভাবিক পরিবেশে, আত্মীয়স্বজনের মাঝে, প্রিয়জনের হাতে শেষ পানি পান করে শেষ অশ্রু আর অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগের মধ্যেও একটা সৌন্দর্য আছে, পবিত্রতা আছে। জীবিতরা তখন মৃতকে পরম ভালোবাসা আর শোকের মধ্যে বিদায় জানাতে পারে। লোকে বলে, আহা রে, লোকটা শান্তিতে মরেছে। কিন্তু আচম্বিতে যে মৃত্যু আসে চাপাতি দিয়ে কোপাতে কোপাতে, আগুন দিয়ে পোড়াতে পোড়াতে, ওভারব্রিজ বা ভবন ধসাতে ধসাতে, সেই মৃত্যুর জন্য কারও কোনো প্রস্তুতি থাকে না। এই মৃত্যু অশান্তির মৃত্যু। দেশে যখন শাস্তি থাকে না, তখন এমন মৃত্যুর ছড়াছড়ি বেড়ে যায়। ইতালীয় দার্শনিক আগামবেনের ভাষায় মানুষের জীবন তখন উদোম (Baৎe Life) হয়ে যায়। বাংলাদেশে জীবন অনেকটা উদোম, এ কথার প্রমাণ হিসেবে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। যখন-তখন যে কারও খুন হয়ে যাওয়া ও খুনিদের পার পেয়ে যাওয়াই তার বড় প্রমাণ। নির্বাচনের আগে দলীয় পাল্লাপাল্লির স্বার্থে এখানে বিকাশের মতো বড় বড় সন্ত্রাসীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আন্দোলন জমাতে নেতা-নেত্রীরা এখন ত্যাগী কর্মী চান না, বোমাবাজ পিকেটার চান। এর সবই ঘটছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, রাজনীতির মধ্যে সংগঠিত পাষণ্ডশক্তির ছত্রচ্ছায়ায়। যখন এমন পাষণ্ডশক্তি দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে লড়াই করে, তখন মানবিক শক্তির গণমিছিল অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়।
রাষ্ট্র ও রাজনীতির জন্ম ভয় থেকে। প্রত্যেকের প্রতি প্রত্যেকের ভয়ের রক্ষাকবচ হিসেবে এবং প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিভিন্ন হুমকির মীমাংসা হিসেবে মানুষ একদা রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল। ভয়মুক্ত জীবনের প্রতিশ্রুতিই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতি সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চলেছে। আজ দেখতে পাচ্ছি, এই রাষ্ট্র এবং এ ধরনের রাজনীতি নিজেই হয়ে উঠেছে ভয়ের কারখানা। 
কিন্তু একে পোলিশ সমাজ-দার্শনিক জিগমুন্ট বৌম্যানের ভাষায় ‘লিকুইড ফিয়ার’ বা তরল ভয় বলা যাচ্ছে না। এই ভয় ইউরোপ-আমেরিকার মতো হঠাৎ কোনো স্কুলে বিকারগ্রস্ত কোনো খুনির নির্বিচার গুলিবর্ষণ বা কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ বা ওয়াল স্ট্রিট ধসে নিঃস্ব হওয়া বা কোনো সন্ত্রাসীর আত্মঘাতী বোমায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়ার গায়েবি ভয় না। আমাদের ভয়ের উৎস আমাদের আত্মঘাতী রাজনীতি, দ্বিদলীয় দোনলা বন্দুকের ভয়ে আমরা ভীত। এই ভয় অতি কঠিন পদার্থ, এই ভয়ের অবয়ব ও উৎস দৃশ্যমান। দুর্বৃত্ত রাজনৈতিক গোষ্ঠী, দস্যুরূপ বণিক আর রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো এই ভয়ের উৎপাদক, তারাই এই বঙ্গভূমিতে জীবন-মৃত্যুর ম্যানেজার।
সেই ম্যানেজাররা এখন অতীব ব্যস্ত। দুটি রাজনৈতিক জোটে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। আগামী তিন মাস চলবে তাদের জব্বারের বলী খেলার কুস্তিগিরি। যে যাকে মাটিতে পেড়ে শোয়াতে পারবে, সেই জয়ী সেই সিকান্দার। সরকারি দল বিরোধী দলের চাপে ‘ক্ষমতা হইতে পতনের’ ভয়ে ভীত। বিরোধী দল ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ হারানোর ভয়ে ভীত। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা-নেত্রীরা মামলা-হামলায় রাজনীতির মাঠ থেকে উচ্ছেদ-আতঙ্কে আছেন। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের আসামিদের শাস্তির ভয়ে ভীত জামায়াতে ইসলামী। আরেকটা জরুরি অবস্থায় দুর্নীতির দায়ে ফৌজি দৌড়ানির ভয়ে ভীত অনেক ব্যবসায়ী-কোটিপতি। অন্যদিকে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মারামারির ক্রসফায়ারে পড়ে জীবন ও সম্পদ হারানোর ভয়ে ভীত সাধারণ মানুষ। বিরোধীদলীয় ডরতাল আর তা ঠেকাতে সরকারি দলের ভয়তালের শিকার বিশ্বজিৎ এ অবস্থার মর্মান্তিক প্রতীক। 
এ ধরনের ভয়ের প্রতীক সৃষ্টিতে মিডিয়ার ভূমিকাও কম নয়। সেদিন আরও দুজন মারা গেলেও বিশ্বজিতের মৃত্যুদৃশ্যটি বারবার টেলিভিশনে প্রচারিত হতে হতে তাঁর মৃত্যু সামষ্টিক ভীতির প্রতীকে পরিণত হয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বরাতে গোলমালে বিপর্যস্ত ঢাকাই এখন সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিমূর্তি। ঢাকার মুডই এখন জাতীয় মুড এবং সেই মুডটা ভয়ের। এই ভয়কে উপজীব্য করা খবর ও সংবাদ প্রতিবেদন বারবার মানুষের সামনে হাজির হয়ে ভয়ের অতিরঞ্জন ঘটাতেও কসুর করছে না। দেশের ৮০ শতাংশ বাড়িতেই এখন টেলিভিশন চলে। এসব টেলিভিশনে ভয়ের দৃশ্যের বারবার প্রচার আর টক শোর কথাশিল্পীদের উত্তেজিত বাতচিত জাতীয় জীবনে অনায়াসে ভয়ের আবহ সৃষ্টি করে চলেছে। অবস্থা এমন থাকলে অচিরেই জাতীয় জীবনের লাগাম চলে যাবে ভয়ের রাজনীতি আর ভয়ের সংস্কৃতির হাতে। ভয়ের মহামারির থেকে খারাপ কিছু আর হয় না। 
আমাদের এখন অবাক হওয়া ভুলে যেতে হবে। উচ্চ মহলে নিষ্ঠুর উদাসীনতা। আত্মপরতার পিচ্ছিল ঢাল দিয়ে গড়াতে গড়াতে ‘আম’-রাও চলছি পতনের দিকে। আমাদেরও লাগানো হচ্ছে অপঘাতে, গণপিটুনিতে, দলবাজিতে। গরিব পুরুষেরা হইহই করে মিছিল করে তাদের শোষকদের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। তরুণদের কাঁধে সিন্দাবাদের ভূতের মতো জেঁকে বসেছে গত শতকের বার্ধক্যপীড়িত রাজনীতি। নৈরাজ্যের লক্ষণ আমাদের আচরণে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সবাই সবাইকে ওভারটেক করতে চাইছি, অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি, নিয়ম ভাঙছি। সবাই মরলেও আমি বেঁচে যাব—এমন অদ্ভুত নিয়তিবাদ জারি আছে। প্রতিবাদ নেই, সুবিধাবাদ আছে, পলায়ন আছে। ভয় দেখলে কচ্ছপের মতো খোলের মধ্যে মাথাটা লুকিয়ে ফেলছি আমরা। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ ক্ষমতাসীনদের দাপটে বাড়তে পারে না। সাধারণ মানুষের ন্যায্য প্রতিবাদের ফল বিরোধী দল ছিনতাই করে নিয়ে যায়। 
শোষণের ভয়, গণহত্যার ভয় আর অপমানের ভয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধই ছিল আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের মর্মশাঁস। ভয় থেকেই গড়ে উঠেছিল জাতীয় ঐক্য। আজ আমাদের তেমনি জাতীয় ঐক্য চাই, চাই সাধারণ মানুষের ভয়বিধ্বংসী জাগরণ। ভীত মানুষ পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসে, গায়ে গা ঘেঁষে মানবদেয়াল তৈরি করে। ভীত মানুষই মরিয়া হয়, কারণ সে মরতে চায় না। বাংলাদেশের জনসমতলে আজ সে রকম এক জনজাগরণ চাই ভয়ের বিরুদ্ধে, অমানবিকতার বিরুদ্ধে—পাষণ্ড রাজনীতির বিরুদ্ধে চাই মানবিক রাজনীতির উদ্বোধন। 
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে