Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ৭ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (50 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-৩০-২০১২

বিজয় মেলা থেকে জুবিলিয়ান উৎসবে

পীর হাবিবুর রহমান



	বিজয় মেলা থেকে জুবিলিয়ান উৎসবে

 ১. জাতীয় রাজনীতির অনেক তারকা নেতাই আমার কলাম পড়ে বলেন, স্মৃতি নাকি খুব প্রখর। কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করেন, রাজনীতির ঘটনা প্রবাহের এত ছোটখাটো বিষয় মনে রাখি কেমন করে! আমার মনে পড়ে শৈশবে বাবার সঙ্গে বের হলে তিনি একটি বিশাল স্কুলের দিকে আঙ্গুল তাক করে বলতেন, ওই দেখ কত বড় স্কুল। ওই স্কুলে তুমি পড়বে। অনেক বড় হবে। আমি বড় হয়েছি কিনা জানি না। বয়সে অর্ধেক জীবন পার করেছি। বাবা আজ নেই। কিন্তু বাবার সেই স্বপ্নের স্কুলে আমি টানা আট বছর পড়েছি। স্কুলটির নাম সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চবিদ্যালয়। কালের সাক্ষী হয়ে ১২৫ বছরের পুরনো এ স্কুল তার গৌরবের কৃতিত্ব নিয়ে শহরের বুকে দাঁড়িয়ে আছে। নজরকাড়া টিনশেডের এই বিশাল স্থাপত্যশৈলী যে কারও নজর কাড়ে। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত জায়গা, পাশেই খেলার মাঠ, পেছনে কলকল ধ্বনিতে ছুটে চলে সুরমা, পাশেই ছাত্রাবাসের সামনে পুকুর, বাঁধানো ঘাট, স্কুলের সামনে একদিকে বিশাল রেইন্ট্রি, অন্যপাশে কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষ এখনো চোখে ভাসে। সুরমা থেকে ছুটে আসা লঞ্চের সাইরেন, রিকশার টুং-টাং শব্দ, বর্ষার তুমুল বর্ষণে টিনের চালে নাচন, ছাতা ফেলে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঘরে ফেরার কত স্মৃতিময় সুখ ভেতরে খলবল খলবল করছে। ১৮৮৭ সালে মহারানী ভিক্টোরিয়ার সিংহাসন আরোহণের জুবিলি উৎসবকে স্মৃতিময় করে রাখতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এ অঞ্চলে যে দু-চারটা স্কুলের নামকরণ হয় তার মধ্যে অন্যতম এই সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চবিদ্যালয়। শত বছর পূর্তি হওয়ার কথা ছিল। সেই এরশাদ শাসনামলের কথা। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র। ব্যাপক আগ্রহ ছিল। কিন্তু হয়নি। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতৃত্বের দলাদলিতে তা হয়ে ওঠেনি।

 
২. ১২৫ বছর পূর্তি দুই দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন হয়েছে ২১ ও ২২ ডিসেম্বর সাবেক ছাত্রদের আবেগঘন আনন্দময় মিলনমেলার মাধ্যমে। এই অসাধ্যটি রাজনৈতিক নেতারা সাধন করে দেননি। এই অসাধ্য সাধন করেছেন জুবিলি স্কুলের ৬৮ ব্যাচের এসএসসি পরীক্ষার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, সুখেন্দু সেন হারু, রঞ্জিত কুমার দাস কটি ও আমাদের বন্ধু রুহুল তুহিন, দেওয়ান ইমদাদ রেজা এবং অনুজ শাহ আবু নাসের, সামসুল আবেদীন, নাদের আহমদ, পীর মিসবাহ ও খায়রুল হুদা চপল। তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন শ্রম ও মেধায় আ ত ম সালেহ, বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, সালিক আহমদ, ওয়াকিফুর রহমান গিলমান, দীলিপ রায়, মালেক হোসেন পীর, রবিউল লেইস রোকেশ, আ ত ম মিসবাহ, সালেহ আহমদ, শাহাবুদ্দিন আফেন্দী, জিএম তাশহিদসহ বিভিন্ন বর্ষের ছাত্ররা। প্রবীণ শিক্ষক আবদুর রহিমকে আহ্বায়ক ও মতিউর রহমানকে সদস্যসচিব করায় রাজনৈতিক অঙ্গনও প্রশ্ন তোলেনি। বরং পৌর মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আইয়ুব বখত জগলুল সক্রিয় সহযোগিতা দিয়েছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরি পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রবীণ আইনজীবী, সাবেক হুইপ ও জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক আসপিয়াও সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে নিরাপত্তা দিয়েছে তাতে এএসপি (সার্কেল) তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীর ভূমিকা অনন্যসাধারণ। জেলার ডিসি-এসপিও সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। জুবিলির উৎসবে আমাকে জড়ান আ ত ম মিসবাহ। ঢাকায় আয়োজকরা এলে এখানে বসবাসরত জুবিলি স্কুলের সনামধন্য সাবেক ছাত্রদের নিয়ে এক মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করি। সেখান থেকে আমরা সেই কৈশোরের স্মৃতিমাখা আবেগ নিয়ে সম্পৃক্ত হয়ে যাই। প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. ইজহারুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিচারপতি মিফতা উদ্দীন চৌধুরী রুমি, সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার, নির্বাচন কমিশন সচিব ড. মুহাম্মদ সাদিক, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গোলাম রব্বানী চৌধুরী, ইসতিয়াক আহমদ, মুতাসিম আলী, সেলিম চৌধুরী, সাবরি সাবেরীন, সুকুমল রায়, সৈয়দ তারিক হাসান দাউদসহ অনেকেই জড়িয়ে যান। উৎসবের সিংহভাগ ব্যয় নির্বাহ থেকে উন্নতমানের ম্যাগাজিন 'জুবিলির জানালায় প্রকাশ' থেকে শুরু করে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনকে নিয়ে যাওয়াসহ অনেক দায়িত্বই কাঁধে নিয়েছি আমরা এবং সাধ্যের বাইরে গিয়েও আন্তরিকতার সঙ্গে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। ড. মুহাম্মদ সাদিক যখন কথা বলেন তখন মনে হয় তিনি হৃদয় ছোঁয়া আবেগে মোড়া একখানি কবিতা পাঠ করছেন। জুবিলি উৎসবে ৪০ মিনিটের স্মৃতিচারণ থেকে নামার পর অনেকে যখন আবেগে আপ্লুত হয়ে আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন তখন আমার সাদিক ভাইয়ের কথা মনে হচ্ছিল। কারণ তিনি থাকলে যে স্মৃতিচারণ করতেন তা বলার ভঙ্গি, আবেগ, তাল-লয় ও শব্দশৈলী আর ভাষার গাঁথুনিতে জুবিলিয়ানদের মধ্যে এনে দিত পিনপতন নীরবতা। সুবক্তা না হলে তিনি যত উচ্চতার মানুষই হন তার বক্তৃতা অনেকেই শোনেন না। সাদিকের বক্তৃতা খুব মিস করেছি। রংপুর মেয়র নির্বাচনের জন্য সাদিক যেতে পারেননি। জ্বরে শয্যা নেওয়ায় যাননি হাসান শাহরিয়ার। মুতাসিম আলীরও যাওয়া হয়নি। রুমি ভাই, ফারুক ভাই, আশরাফ ভাইদের গ্রুপ একদম ছেলেবেলার মতো এই উৎসবে আনন্দে অবগাহন করেছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী স্মৃতিফলকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। জুম্মার নামাজ পড়ে সহপাঠীদের খুঁজতে গেছেন। খাবার টেবিলে সেই গ্রামীণ শহরের রহস্যঘেরা স্মৃতিময় মধুর গল্পের ডালি খুললেন। সবচেয়ে প্রবীণ ছাত্র সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক চৌধুরী এই উৎসবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন। ফেরার তাড়া ছিল। জার্নির ক্লান্তি ছিল না। চোখে-মুখে যেন কৈশোরের উজ্জ্বলতা। যোগ্য কন্যা অভিভূত হয়ে বাবার স্কুলের আঙিনায় খুশিমনে ছবি তুলছিলেন। সেই কৈশোরের মতো ৮২ বছর বয়সী আবদুল বারী হুইল চেয়ারে বসে হলেও যেমন অ্যাসেম্বলিতে উপস্থিত হয়েছেন, তেমনি কত প্রবীণ-নবীন সাদা টুপি মাথায় পরে যখন 'আমার সোনার বাংলা' গাইছিলেন তখন বুকের ভেতর কেমন করে উঠেছিল। আনন্দের কান্না ছুয়ে গেল অন্তরটা।
 
৩. সব ছাত্রের যাকে বেশি মনে পড়েছে তিনি পিআই স্যার। মানে সামসুদ্দিন আহমেদ স্যার। স্যার নেই। তার সঙ্গে জুবিলিয়ানদের যেন আত্দার সম্পর্ক। তার প্রতি নির্মোহ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বিরল দৃশ্য দেখে গেছেন উৎসবে যোগ দেওয়া তার পুত্র-কন্যা, নাতি-নাতনিরা। যোগ্য পুত্র ডা. পারভেজ শামস গর্বে অমন আদর্শ শিক্ষক পিতার জন্য কেঁদেছেন। স্কুল ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেই মনটা খারাপ হয়ে যায় যখন দেখা যায় ভেতরের কাঠের ভবন ভেঙে পাকা দালান হয়েছে। ঐতিহ্যের স্মারক প্রশাসনের ঊধর্্বতন কর্মকর্তারা তখনই ভেঙে দেয় যখন তাদের ভেতরে সৃজনশীলতা, রুচি ও আভিজাত্যের অভাব দেখা দেয়। স্মৃতিচারণে পরিষ্কার বলে দিয়েছি স্কুলের মূল ভবনের যে স্থাপত্যশৈলী টিনশেডের দালান তা কখনো ভাঙার চেষ্টা হলে জুবিলিয়ানরা প্রতিরোধ করবে। সমর্থন জানাতে কেউ কার্পণ্য করেননি। জুবিলির দু-দিনের উৎসবে কত স্মৃতিময় ঘটনা হাতড়ে বেড়িয়েছি বন্ধু, অনুজ, অগ্রজদের সঙ্গে। কত প্রিয় মুখ, প্রিয় শহর থেকে হারিয়ে গেছে। কত ভালোবাসার মানুষ, এই প্রেমের শহরে অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। জল-জোছনার এই শহরে যাদের সঙ্গে ছায়ায় ছায়ায়, পায়ে পায়ে বেড়ে উঠেছিলাম তাদের কাউকে কাউকে না পাওয়ার বেদনাও অনুভব করেছি আনন্দ-উৎসবের ফাঁকে ফাঁকে। আমাদের সহপাঠী মাহবুব এলাহী বড্ড সহজ-সরল মাটির ছেলে ছিল। স্কুল জমানায়ই সুনামগঞ্জ সরকারি কলোনিতে সাইকেল চুরির অপবাদ তার কাঁধে দেওয়ায় অভিমানে আত্দহত্যা করেছিল। বাজারের সালাম হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়ায় তার শূন্যতা গভীরভাবে অনুভব করেছি। সুনামগঞ্জ জুবিলি স্কুলের আমার সতীর্থরা আলাদা আয়োজন করেছিল। এ জন্য কুসুম, ময়না, জুনেদ, বাবলু, জীপন অনেক কষ্ট করেছে। ডা. ননী ভূষণ তালুকদার এখন শহরের জনপ্রিয় গাইনোলজিস্ট। ঘরে ঘরে তার সেবা। মনটা ভরে যায়। হারিয়ে যাওয়া অরুণ চন্দ্র পালকে খুঁজে পেলাম। সিলেট এমসি কলেজে অধ্যাপনা করে। জাকির এখন নানা হয়েছে। সাহারুল ইসলাম সুনামগঞ্জ বারের একজন সৎ সিভিল ল-ইয়ার। ফজলুল কবীর তুহিন এসেছিল লন্ডন থেকে। শাফকাত গিয়েছিল বউ-বাচ্চা নিয়ে। আশিস, আনিস, সমশের, হামিদ, বিকাশ, তারেক, মুকিত, বিমান, মাসুম, ফজলুল হক, রজত তালুকদারদের সঙ্গে দেখা হল কত বছর পর। ভাবতে কতই না ভালো লাগে। উৎসব মঞ্চে সাবিনা ইয়াসমিনের আগে দারুণ জমিয়েছে আমাদের বন্ধু সেলিম চৌধুরী। প্রথম দিন ফরিদা পারভীনের লালনগীতি সবাইকে মুগ্ধ করেছে। ফকির শাহাবুদ্দিনের গানের প্রতি দেওয়ান সুমন রাজা এতটাই পাগল যে, সে সুনামগঞ্জে বসতি গাড়তে চাইলে বাড়ি করার জায়গা দেবে বলেছে। জুবিলি স্কুলের ছাত্র ও আমাদের কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবদুর রশিদ শিশুর মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন তার জানি দোস্ত ও একমাত্র পুত্র মঞ্জুর মোরশেদ টিপুর সঙ্গে। বাপ-বেটার এমন জুটি বিরল। তারা যেখানে দাঁড়িয়েছেন সবাইকে আনন্দে মাতিয়েছেন। ২২ তারিখ মধ্যরাতে গানের সঙ্গে জুবিলিয়ানদের শীতের কনকনে বাতাস উপেক্ষা করা উত্তাল নাচের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটেছে উৎসবের। পরদিন শহর যেন প্রাণহীন। এক মৃতপুরী। এই উৎসব ঘিরে টানা মাসাধিককাল সন্ধ্যা নামলেই ছোট-বড় জুবিলিয়ানরা মিলিত হতেন জুবিলি স্কুলের অস্থায়ী ক্যাম্পে। একে ঘিরে চায়ের আড্ডা, গান-বাজনা, প্রস্তুতি বৈঠক, টেবিল টেনিস খেলা, তারুণ্যের মিছিল_ সব হয়েছে। এমন উৎসব আর কখনো হয়নি। যেখানে সব দল, মত ও পথ ভুলে জুবিলিয়ান হয়ে একস্রোতে এসে সেই '৪১ সাল থেকে ২০১২ সালের এসএসসি উত্তীর্ণ বা ওই সময়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা মিলিত হয়েছিলেন। রাজনীতিকে দূরে রাখতে পারলে কত নির্মল, আনন্দময়, বর্ণাঢ্য উৎসব করা যায়, কতটা কাছাকাছি স্বজন আসে স্বজনের কাছে তা জুবিলির ১২৫ বছর পূর্তি উৎসবে না গেলে উপলব্ধি করা যেত না। এই জীবনে কখনো দেখা হয়নি, হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না এমন সব অগ্রজের সঙ্গে দেখা হয়েছে জুবিলিয়ান উৎসবে। এই উৎসব বর্ণময়, উজ্জ্বল হয়ে থাকবে স্মৃতির অ্যালবামে। একজন মাত্র ছাত্রী এসেছিলেন উৎসবে। জেলা গার্লস স্কুলে বিজ্ঞান না থাকায় তিনি এখানে পড়েছেন। ডা. সৈয়দা মনসুরা খাতুন তার নাম। তার বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। জুবিলি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হলেও প্রথম ক্লাসের স্মৃতি মনে নেই। পিআই স্যার, ভিম স্যার, পাঞ্জাবি স্যার, বাচ্চু স্যার, কাজী স্যার, বাম্বু স্যার_ এ স্যারদের মূল নামে এক-একটি। কিন্তু এই নামগুলো এখনো তাদের ভয়ঙ্কর মূর্তি সামনে এনে দেয়। ডাস্টারের বাড়ি, বেধড়ক লাঠিপেটা, মাগো-বাবাগো বলে সেই সময়ে আমাদের ডাক এখনো যেন জুবিলির দেয়ালে দেয়ালে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তবুও স্মৃতি কতটা যে মধুর তা এই উৎসবে গিয়ে নতুন করে উপলব্ধি করা গেছে। এই জুবিলি স্কুল আমার দুরন্ত কৈশোরের উজ্জ্বল ঠিকানা। এইখানে আমার আটটি বছর দস্যি ছেলের মতোই নয়, রবীন্দ্রনাথের 'ছুটি' গল্পের ফটিক চরিত্রকে হার মানিয়ে কাটিয়েছি। আমার প্রথম স্কুলে যাওয়ার স্মৃৃতি এখনো উজ্জ্বল। মুক্তিযুদ্ধের আগে মোহাম্মদ আলী স্যারের কেজি স্কুলে প্রথম স্কুলে যাওয়া। সেই ছেলেবেলায় সঙ্গী ছিল পাড়ার ইয়াসমিন, সঙ্গে তার বড় ভাই লন্ডন প্রবাসী কয়েস আর আমার অগ্রজ অকাল প্রয়াত সাবিত আহমদ পীর। দ্বিতীয় দিন বাসা থেকে বলা হয়েছিল কয়েস ভাইয়ের সঙ্গে ইয়াসমিনের সঙ্গে স্কুলে যেতে। লজ্জায় আমি কেঁদেছি। পরে মেঝভাই আমাকে নিয়ে যান। এই উৎসবে প্রিয় স্যারদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আবদুর রহিম, মাসয়ুদুল হাসান, অমিয়াংসু, মকবুল হোসেন, আবদুর রউফ ও বেনু স্যারের সঙ্গে।
 
৪. ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম বিজয় মেলায়। সকালের ফ্লাইটে গেছি। সাংবাদিক রিয়াজ হায়দার ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম চিশতি অন্যবারের মতো এবারও দেখভাল করলেন। বিজয় মেলা থেকে চট্টগ্রাম নগরীর আকাশ-বাতাসে যেন ধ্বনিত হচ্ছিল যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবি। নগরীতে নেমেই দেখলাম বিজয় র্যালি। একটি জাতির জন্মের আনন্দ এখনো ফুরায়নি। কত আত্দত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে এই বিজয়। জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতা সংগ্রামী, বীর যোদ্ধা ও শহীদদের অন্তর দিয়ে শ্রদ্ধা জানালাম। শ্রদ্ধা জানালাম ভারতের গণতন্ত্রের নেত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে। ভারতবাসীকে। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতেই হয়। রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের উৎসব, কুষ্টিয়ার লালন মেলা, নড়াইলের সুলতান মেলা, চট্টগ্রামের বিজয় মেলা সব বাঙালি জাতির সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামের বিজয় মেলা '৮৯ সালে এককালের তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা তৎকালীন চট্টগ্রাম মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় ফারুক-ই-আজম বীর প্রতীক ও সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম ভুইয়ারা শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের জননন্দিত রাজনীতিবিদ সাবেক মেয়র এই বিজয় মেলার দায়িত্ব নিলে উৎসব যেন বৃহত্তর চট্টগ্রামেই নয়, দেশের অন্যান্য জেলায়ও ছড়িয়ে যায়। মহিউদ্দিন চৌধুরী এখনো বুক আগলে এই বিজয় মেলার মঞ্চকে একটি দলের ঊধের্্ব উঠে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছেন। ওখানে গেলে যুদ্ধের কথাই নয়, গণমানুষের কথাও মন খুলে বলা যায়। এক সময় মহিউদ্দিন চৌধুরীকে দেখতাম খাওয়া-দাওয়ায় নিয়ন্ত্রণহীন। বাইপাস সার্জারির পরও গরুর মাংসের প্রতি তার দারুণ আসক্তি ছিল। ২০০৫ সালের মেয়র নির্বাচনের সময় তার বাড়ির বেডরুমে বসে খেতে খেতে তা লক্ষ্য করেছি। এখনো তার বাড়িতে দুপুর-রাতে গণরান্না হয়। যারাই যান তাকে পান আর না-ই পান খেয়ে আসতে হয়। চট্টগ্রামের মানুষ নগরপিতার আসন থেকে তাকে সরিয়ে এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন আর তার নাম নিচ্ছেন। রাতে খেতে বসে খুব মায়া লাগল। চিত্রনায়ক ফারুকও ছিলেন। ভীষণ মুজিবভক্ত কট্টর আওয়ামী লীগার। শেখ হাসিনার প্রতি খুবই অনুগত। অসুস্থ শরীর নিয়ে সেখানে গেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ও দেশের প্রতি তার ভালোবাসার কথা অন্তর দিয়ে বলেছেন। তিনিও খেতে পারছিলেন না। খেতে খেতে বঙ্গবন্ধুর নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক চিত্রনায়ক ফারুক বলছিলেন, আওয়ামী লীগ আদর্শহীন বামের খপ্পরে। বাম হাতের চড় ভাই খুব লাগে। আওয়ামী লীগ বামের চড় খাচ্ছে। মহিউদ্দিন চৌধুরী লাউ তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে উঠলেন। চিকিৎসকের মানা। মনের জোর কমেনি। সারাদিন বিজয় র্যালি থেকে অনেক অনুষ্ঠান করেছেন। রাতের খাবার খেয়ে ১০টার দিকে ছুটলেন পতেঙ্গার দিকে। বললেন, দলের কর্মিসভা আছে। যেতেই হবে। একটি বিয়ের দাওয়াতেও হাজিরা দেবেন। তার মতো সংগঠক আওয়ামী লীগ বা অন্য দলে সারা দেশে ক'জন আছে? চট্টগ্রামে গেলে জুবিলি রোডের ওপর দিয়ে যেতে যেতে সড়কটিকে খুব প্রিয় মনে হয়। চট্টগ্রামের মানুষও খুব অতিথিপরায়ণ ও আন্তরিক। চট্টগ্রামের সবখানে ঘুরে বেড়াতেই ভালো লাগে। জুবিলি রোডও সেই মহীয়সী রানী ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহণের জুবিলি উৎসবকে স্মরণে রাখতে নামকরণ হয়েছিল। জুবিলি রোড যেন জুবিলি স্কুলেরই সহোদর। ঢাকায় ফিরেই জুবিলি স্কুলের ১২৫ বছর পূর্তির কাজে টানা সময় দিয়ে ১৯ তারিখেই চলে যাই আমার জল-কাদায়, জল-জোছনায়, রোদ-বৃষ্টিতে বেড়ে ওঠা মায়ার শহর সুনামগঞ্জে। সেখানে মিলিত হই জুবিলিয়ানদের প্রাণের উৎসবে।
 
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে