Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২০ , ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (22 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১১-১০-২০১৭

আশ্রয় দীর্ঘমেয়াদি হলে রোহিঙ্গা-বাঙালি দ্বন্দ্ব অনিবার্য

সায়েম সাবু


আশ্রয় দীর্ঘমেয়াদি হলে রোহিঙ্গা-বাঙালি দ্বন্দ্ব অনিবার্য
অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী। অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। রামরু’র (রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। গবেষণা করছেন শরণার্থী ও অভিবাসীদের নিয়ে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। ভারত ও চীনের আগ্রাসন নীতির সমালোচনা করে বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলা করতে হলে বিশ্ব সংস্থার মধ্যস্থতা জরুরি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নানা অব্যবস্থাপনা দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ মতামতও ব্যক্ত করেন এই বিশেষজ্ঞ।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু। দুই পর্বের শেষটি আজ প্রকাশিত হলো।
 
প্রশ্ন : রোহিঙ্গাদের পাশে মানবিক বাংলাদেশকে কেমন দেখছেন? 
 
ড. তাসনিম সিদ্দিকী : ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রোহিঙ্গাদের প্রবেশ করতে দেবে না। আমি মনে করি, এটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।এবার বাংলাদেশ বুক উজাড় করে দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে চাপ প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে। আলোচনা করার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এখানে বাংলাদেশকে ইতিবাচক ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছি। 
 
প্রশ্ন : ব্যক্তি মানুষের এগিয়ে আসাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? 
 
ড. তাসনিম সিদ্দিকী : এক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে আমার এ ব্যাপারে কথা হয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি এখানে এগিয়ে না আসত, তাহলে হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মারা যেত।
 
এগিয়ে আসা মানুষের একটি অংশ মনে করছে, বাঙালি একদিন শরণার্থী ছিল। তারা সেই চেতনা থেকেই এগিয়ে যাচ্ছেন। আরেকটি অংশ মনে করছে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ কারণে এগিয়ে যাওয়া ধর্মীয় দায়। 
 
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক বা ত্রাণ মন্ত্রণালয় ব্যক্তি মানুষদেরও কাজ করতে দিচ্ছে। এতে করে অনেক সাহায্য মিলছে। অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে ব্যক্তিকে এসব জায়গায় কাজ করতে দেয়া হয় না। 
 
প্রশ্ন : অব্যবস্থাপনা নিয়েও তো নানা কথা আছে। 
 
ড. তাসনিম সিদ্দিকী : এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে নানা অব্যবস্থাপনা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এখন অনেকটাই গুছিয়ে আসছে বলে মনে হয়। তবে আমি মনে করি, সাহায্য ব্যবস্থাপনার সব দায়িত্বের কেন্দ্রে থাকবে ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ব্যক্তি, প্রশাসন ও রাষ্ট্র যেভাবে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। 
 
তবে ত্রাণ নিয়ে নানা অব্যবস্থাপনার কারণে অসহায়রা বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য ভিআইপি যাচ্ছেন সেখানে। রাস্তা বন্ধ করে তাদের প্রটোকল দিচ্ছে পুলিশ, জেলা প্রশাসন। এতে মূল কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সবাই যাচ্ছেন ভালো কথা। কিন্তু মূল কাজ ব্যাহত করে বিমানবন্দরে ভিআইপি দেখভাল নিয়ে ব্যস্ত রাখা মানে জেলা প্রশাসনের ওপর অন্যায়। রাস্তা বন্ধ করে ত্রাণ দেয়ার নীতিও পরিহার করতে হবে। রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে সামান্য ত্রাণ দেয়া মানে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। 
 
সরকারও এমন অব্যবস্থাপনা চায় বলে আমি বিশ্বাস করি না। অতি উৎসাহী লোকেরা ছবি তোলার নীতিতেই সেখানে গিয়ে শত সমস্যার সৃষ্টি করছেন। অনেকেই নীরবে-নিভৃতে ত্রাণ দিচ্ছেন। তারা কোনো সমস্যা সৃষ্টি করছেন না।  
 
প্রশ্ন : দীর্ঘমেয়াদি কী হতে পারে?  
 
ড. তাসনিম সিদ্দিকী : সমন্বয় সঠিকভাবে না থাকলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। এ কারণে স্থানীয় কমিউনিটিকে কাজে লাগাতে হবে। যারা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করছেন, তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। এই কারণে আমরা বারবার বলছি, ইউএনএইচসিআরকে (জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা) সামনে নিয়ে আসতে হবে। তাদের শরণার্থী ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা আছে। আশ্রয় দীর্ঘমেয়াদি হলে রোহিঙ্গা-বাঙালি দ্বন্দ্ব অনিবার্য। এটি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। 
 
এখন বড় বড় এনজিওকে সেখানে ত্রাণকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। এটি সঠিক নীতি নয়। সেখানে অনেক ছোট ছোট এনজিও আছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তারা শরণার্থীদের ভাষা বোঝে। তারা রোহিঙ্গাদের মনোভাব বোঝে। তাদের পক্ষে কাজ করা যত সহজ হবে আমি হঠাৎ করে একদিনে গিয়ে তত সহজে কাজ করতে পারব না। দাতা সংস্থাগুলো এটি বুঝতে পারছে না। তারা বাংলাদেশে যাদের চেনেন, কেবল তাদেরই ব্যবহার করতে চাইছেন। প্রচারের জন্য এটি করতে চাইছেন। এতে মানবাধিকার রক্ষা হয় না।
 
সবাইকে কাজ করার জায়গা দিতে হবে। আর ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে থাকতে হবে নেতৃত্বে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন তৎপর। তবে তারা নিরাপত্তার কাজেই শুধু থাকতে পারেন, ত্রাণে নয়। সেনাবাহিনী আসায় ভরসা বাড়ছে। 
 
নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারীদের মাঝে আতঙ্ক হয়তো এখনও আছে। কারণ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে তারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের ভয় কাটাতে কাউন্সিলিংয়ের প্রয়োজন। এটি স্থানীয় সংস্থার জনবলই করতে পারে বলে মনে করি।
 
প্রশ্ন : এর দায় কার? 
 
ড. তাসনিম সিদ্দিকী : সরকার হয়তো না বুঝেই বড় বড় এনজিও’র ওপর ভরসা করছে। আবার হতে পারে ছোট ছোট এনজিও সেভাবে সরকারের কাছে প্রস্তাব রাখতে পারছে না। স্থানীয় সংস্থাকে কাজে লাগাতে না পারলে স্থানীয় দ্বন্দ্ব নিরসন করা যাবে না। 
 
যেমন- ‘রোহিঙ্গা’ নামে নিবন্ধন হচ্ছে বলে অনেকেই এগিয়ে আসছেন না। নিবন্ধনের গতি মন্থর। তারা হয়তো মনে করছেন এই নামে নিবন্ধন না হলে সে দেশে আর ফিরে যেতে পারবে না। এটি এখন কে বোঝাবে? আগে তো তার নাম নিবন্ধন করে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। এ বিষয়গুলো বোঝানোর জন্য স্থানীয় প্রতিনিধি বা সংস্থাকে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। 
 
প্রশ্ন : এ কারণে কি নতুন রোহিঙ্গারা ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, পুরনো রোহিঙ্গা বা বাঙালিরাও এ ত্রাণে ভাগ বসাচ্ছেন?
 
ড. তাসনিম সিদ্দিকী : এটিই এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাস্তবতা। এখানে নজর দেয়া জরুরি। অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে বাঙালি-রোহিঙ্গারা দ্বন্দ্বে জড়াবে।  এমন চলতে থাকলে স্বার্থের দ্বৈতনীতিই প্রকট হয়ে উঠবে। নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে এ সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। প্রতিনিয়ত সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। সবাইকে কাছে টানার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এখানে কোনো দ্বিধা থাকলে চলবে না। 
 
প্রশ্ন : ভালো কিছুর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান মিলবে, এমনটি আশা করেন কি না?
 
ড. তাসনিম সিদ্দিকী : ভালোর মধ্যেই এর শেষ পরিণতি দেখতে হবে। নইলে কোনো উপায় থাকবে না। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিশাল সমস্যা। 
 
আমি আশাবাদী এই কারণে যে, রোহিঙ্গা ইস্যু এখন আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং বাংলাদেশ সরকার তা তুলে ধরছে। উচ্চ মহলে এ সমস্যা নিয়ে যেভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও সতর্কতার সঙ্গে এ নিয়ে কাজ করতে হবে। বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের কূটনীতিকদের ব্যবহার করতে হবে, রোহিঙ্গা সমস্যার সঠিক চিত্র তুলে ধরতে হবে। 
 
একইভাবে সাংস্কৃতিক ফোরামগুলোকেও কাজে লাগাতে হবে। রোহিঙ্গাদের সমস্যা নিয়ে গান, নাটক, সিনেমা তৈরি করে তা প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এ সমস্যার চিত্র সারাবিশ্বে জানান দিতে হবে। ভারতের সাধারণ মানুষ, চীনের সাধারণ মানুষ যাতে করে এসব কর্মকাণ্ড দেখে সমবেদনা জানাতে পারেন, জাগ্রত হতে পারেন। মনে রাখতে হবে, ভিয়েতনাম থেকে ফেরত যেতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। তেমনি এ ইস্যুতে ভারত ও চীনের আগ্রাসনকে ভুল প্রমাণিত করতে হবে। 
 
মিডিয়া এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তথ্যের কোনো ঘাটতি নেই। হাজার হাজার ছবি রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও হাজার হাজার ছবি প্রকাশ পাচ্ছে। এগুলো নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। থেমে গেলে চলবে না। 
 
প্রশ্ন : রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক উঠছে। এ ব্যাপারে আপনার মত কী? 
 
ড. তাসনিম সিদ্দিকী : এই বিতর্ক অযথা। তারা ‘অনুপ্রবেশকারী’ নাকি ‘বাস্তুচ্যুত’ এমন বিতর্ক তুলে সমস্যা আরও বাড়ান হচ্ছে। এ বিতর্কের সময় এখন নয়। এগুলো হলো কথার রাজনীতি। 
 
রাজনীতি হওয়া দরকার সমাধান কীভাবে মিলবে, তা নিয়ে। কোন সংস্থাকে এখানে ডেকে আনা যায়, তা নিয়ে রাজনীতি হওয়া দরকার, আলোচনা হওয়া দরকার। অনুপ্রবেশকারী, অবৈধ নাগরিক- এসব কথা বলে শুধু বিতর্ক বাড়ান হচ্ছে। এমন দ্বন্দ্ব কেবল রোহিঙ্গাদের বিপক্ষেই যায়। 
 
সুতরাং আমি মনে করি, একটি সাধারণ প্লাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে সমাজের সবাই মত দিতে পারবেন এবং রাষ্ট্র সেখান থেকে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে পাবে।  
 
এমএ/০৮:২৪/১০ নভেম্বর

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে