Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ৪ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 4.5/5 (4 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-০৭-২০১৩

বাংলাদেশের প্রাণভোমরার নাম এখন শাহবাগ

ফারুক ওয়াসিফ



	বাংলাদেশের প্রাণভোমরার নাম এখন শাহবাগ

বিচার শব্দটাই এখন বাংলাদেশ। শাহবাগে গণ-আদালত বসেছে। তার সমর্থন আসে সুদূর চিলমারী থেকে, ‘কী কাণ্ড দ্যাখেন, গ্রামের যে মানুষগুলান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়া সরাসরি কথা বলত না, এখন তারাই জোরেশোরে বিচার চাইছে। বলে, আর কোনো টালবাহানা না।’ বলছিলেন রৌমারী চরের স্কুলমাস্টার সমাজসংগঠক নাহিদ নলেজ। বরিশালের শিশু সাংবাদিক তাহসিন উদ্দিন লাল সবুজ নামের একটা পত্রিকা বের করে। এবার এসএসসি দেবে, সেও তার ছোট্ট পত্রিকায় লিখে যাচ্ছে। অবিচার এত বেশি হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশে, বিচার ছাড়া মানুষ আর কিছু বুঝছে না। এই বিচারের জন্য তারা রাষ্ট্রশক্তির ওপর পূর্ণ ভরসা করতে পারছে না, তাই সমাজশক্তি জেগে উঠে দায়িত্ব নিচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আজ সব বিচারের প্রতীক ও প্রতিনিধি। আমাদের অবদমিত সামষ্টিক অচেতন হঠাৎ চেতন হয়ে ফুটছে। তরুণেরা তাঁদের কাজ করছেন। এখন দায়িত্ব হলো এই চেতন-ফেরাকে আইন, যুক্তি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শুদ্ধীকরণে কাজে লাগানো। একাত্তরের আদি পাপের বিচার হলে, অন্য সব অবিচারের সংস্কৃতিও কমজোরি হবে। বাংলাদেশে নতুন রাজনীতির জমিন এভাবেই তৈরি হচ্ছে ও হবে।

রূপকথায় বলা প্রাণভোমরায় আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের প্রাণভোমরাটা লুকানো আছে তরুণদের মধ্যে। আজ তা জেগে উঠে জমায়েত হয়েছে শাহবাগ মোড়ে। দেশের অনেক জেলায় সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন শাহবাগ। ক্যাম্পাসের কোনো মিছিল শাহবাগ পেরোতে দিত না পুলিশ। আজ সেই শাহবাগই কেন্দ্র হয়ে গেছে বাংলাদেশের। জেলা-মফস্বল ছাপিয়ে অজস্র শাহবাগ জন্মাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকায়। বানের জলের সব কটি স্রোতের মুখই বহন করে সমগ্র নদীর শক্তি। কে নেতা, কার ব্যানার, কার বত্তৃদ্ধতা—এসব প্রশ্ন জরুরি। আবেগের পালের সঙ্গে হালের গতিটাও খেয়াল করতে হবে। কিন্তু সবাই একমত, শাহবাগ জাতীয় ঐকমত্যকে তুলে ধরছে। শাহবাগ বিচারের নামে আপস চায় না, শাহবাগ একাত্তরের রাজনৈতিক অর্জনকে দলীয় রাজনীতির কাছে বলি দিতে নারাজ। এই শাহবাগ আর কোনো স্থান নয়, তা একটা চেতনার প্রচ্ছদ।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমার মধ্যে অবিচারের ভয়, ক্ষমতার আপসের মধ্যে অবিচারের ভয়, টাকার জোরের কাছে নতি স্বীকারের মধ্যে অবিচারের ভয়, মার্কিন-সৌদি চাপের মধ্যে অবিচারের ভয়, আইনের শুভংকরের ফাঁকের মধ্যে অবিচারের ভয়, রাজপথের নাশকতার মধ্যে অবিচারের ভয়। ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে গুটিয়ে ছিল বাংলাদেশ। ভয়ে ভয়ে কাটাকাটি হয়ে গেছে আজ। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া কবিতা ‘ঝড়ের রাতে’র কথাই ফলে গেল, ‘সবাই অবাক সবাই ভাবে ব্যাপারখানা কী! ভয়কাতুরে মাহবুব আজ দারুণ সাহসী!’ বাংলাদেশের ইতিহাস হাতড়ে দেখুন, গত এক শতাব্দীতে প্রতিটি দশকেই একবার করে এ রকম ভয় তাড়ানো ঝড় এসেছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টি থেকে একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলন, একাশি থেকে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন, নব্বই-তিরানব্বইয়ে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণজাগরণ। পরের দশকটি দ্বিদলীয় স্বার্থবাদী রাজনীতির মাইনক্যা চিপায় তরুণেরা বেশি কিছু করতে পারেননি বটে, তবে ২০০২ সালে শামসুন্নাহার হলে গভীর রাতে পুলিশি অনাচারের বিরুদ্ধে বিরাট বিস্ফোরণ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময়ের ফুলবাড়ী-কানসাট আন্দোলনও গণজাগরণের সামর্থ্যকে তুলে ধরেছিল। শেষ বড় বিস্ফোরণটি হয়েছিল বিগত সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগস্ট অভ্যুত্থানে। এগুলোর প্রতিটিরই কারিকা শক্তি ছিলেন তরুণ-তরুণীরা। চরিত্রের দিক থেকে এগুলো ছিল রাজনৈতিক-রাষ্ট্রিক অপশক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ। তরুণেরা হলেন এই জনসমাজের প্রাণভোমরা। ব্লগার-অ্যাকটিভিস্ট ও প্রগতিশীলছাত্রকর্মীরা তাঁদের প্রতিনিধি। এঁরা সবাই মিলে জনগণের প্রতিনিধি। জনগণ শব্দটাকেও তাঁরা জীবন্ত করেছেন আবার। 
নিজ নিজ বুকের ভেতরের জাগরণ টের পাচ্ছেন বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ। সেই নিজস্ব জাগরণে বিশ্বাস রাখুন, টিকিয়ে রাখুন। সেটাই স্পর্ধিত একাত্তরের প্রাণভোমরা। ভোট দিয়ে, সমর্থন দিয়ে, ধৈর্য ধরে ধরে ত্যক্ত-বিরক্ত তারুণ্য আত্মবিশ্বাসী আজ। আর কত তাঁরা ক্ষমতার মসনদের কাঠ-পাথরে মাথা কুটে মরবেন? আমরাই ৯০ শতাংশ। আমরাই একাত্তরের শহীদ নর-নারী আর নির্যাতিতার বংশ। একাত্তরকে আমরা চার দশক আগে ফেলে আসিনি। বাংলাদেশ আর একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম আর তার বীর শহীদান এক ও অবিভাজ্য। আরও শতবর্ষ তা আমাদের পথ দেখাবে। কায়েমি রাজনীতি বারবার একাত্তরকে দলীয় মাপে কেটে-ছেঁটে মসনদের ঝালর বানাতে গিয়েছে। কিন্তু বারবারই মানুষ সেই ঝালর ছিঁড়ে একাত্তরকে পতাকা করেছে। আজকের তরুণেরা এই কাজের কাজি। এই তরুণদের আপনি টেলিভিশনে দেখতে পান না, বিজ্ঞাপন মাতিয়ে নাচাগানা করেন না, টক শো মাতোয়ারা করে খুশিতে ডগমগ হন না। তাঁরা অনভিজাত, জনসমতলের অতি সাধারণ তাঁরা। এত দিন পেছনে বসে দেখেছেন, তারপর একদিন একটি ঘটনায় তাঁরা ফেটে পড়েন। প্রমাণ করেন, অনেক অনেক নেতা, বুদ্ধিজীবী আর সেলিব্রিটির চাইতেও তাঁরা কম দূষিত, অধিক শাণিত। নব্বইয়ের পর আবার তাঁরা বাংলাদেশের নবায়ন ঘটিয়ে দিচ্ছেন।
তবে শাহবাগের সঙ্গে মিসরের তাহরির স্কয়ারের তুলনা বেমানান। তাহরিরের মতো মরণপণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এখানে নেই। দ্বিতীয়ত, তাহরিরে শত্রু-মিত্র যতটা স্পষ্ট ছিল, বাংলাদেশে ততটা নয়। এই আন্দোলনকে তাই যুদ্ধাপরাধ, দায়মুক্তি ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। যাঁরা ওপরের, তাঁরা একসময় রাশ টানতে চাইবেন। কিন্তু জনতার কেবল জনতাই আছে। আপনার কাছাকাছি লোকটা সে-ই, যে আপনার পাশে কাঁধে কাঁধ হাতে হাত নিয়ে চলছে। মসনদের আমরা কেউ নই, মসনদের সনদ আমরাই দিই বা বাতিল করি। কেননা, জাহানারা ইমাম আজও আমাদের পথপ্রদর্শক।
এই জনজাগরণ প্রমাণ করেছে, একাত্তরের চেতনা ক্ষমতাবৃত্তের চাইতে জনগণের মধ্যেই বেশি নিরাপদ। এই আন্দোলনকে সব রকম অবিচার ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নিতে না পারলে এটা হয়ে পড়বে ওষধি বৃক্ষ, একবার ফল দিয়েই শেষ হয়ে যাবে। অতীতে তা-ই হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি লোকজনের শাহবাগে আসার চেয়ে আইন বুঝে, রায় পড়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে উচিত কাজে দ্রুত বসে যাওয়া উচিত। বক্তৃতা দিয়ে দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। 
অন্যদিকে কিছু বিদেশি গণমাধ্যম বলতে চাইছে, বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। যারা তা বলছে, তারা শয়তানি বুদ্ধির গোলাম। নব্বই বনাম দশের দ্বন্দ্বে গৃহযুদ্ধ হয় না। একাত্তরেও কোনো গৃহযুদ্ধ হয়নি। এটা জাতীয় লড়াই, যখন জাতির বৃহত্তর অংশ এক কাতারে। এমনকি বিএনপির সমর্থকদের অনেকেও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আঁতাত পছন্দ করেন না। আন্দোলনের নিশানা তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আখেরি ফয়সালার দিকেই নিতে হবে। সমস্যাটা রাজনৈতিক, সম্ভাবনাটাও রাজনৈতিক। রাজনৈতিক সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান হয় না, হতে পারে না।
এখন কাজ হলো, প্রমাণিত অপরাধের সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমার আইনি পথ বন্ধ করা। প্রকাশ্যে বা আড়ালে যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আঁতাতের বিরুদ্ধে জনমতকে জোরদার করতে হবে। পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি জাতিসংঘে তুলতে হবে। যখনই রাষ্ট্রশক্তি ভুল, অন্যায় বা আপস করবে, তখনই জনতার বাঁধ তৈরি করাকে নিয়মে পরিণত করতে হবে। যে দল, নেতা বা শক্তি আপস করবে, তাদের বিরুদ্ধে গণনজরদারি জারি রাখতে হবে। আপসের শক্তিকে সংবর্ধনা দেবে না শাহবাগ ময়দান। 
একাত্তরের অসম্পূর্ণ হিসাব মেলানোর দায় আজকের তরুণদের সামনে। একটা মুক্তিকামী বৈষম্যহীন সমাজই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জাগ্রত স্বপ্ন। একাত্তরের চেতনার দলিল ইতিহাসে যত না, তার থেকে বেশি মিলবে মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিতে। এ রকমই এক চিঠিতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ জাতির প্রতি ডাক দিয়েছিলেন: ‘দেশবাসী! মীরজাফরী করিও না, কারণ মুক্তিফৌজ তোমাদেরকে মাফ করিবে না এবং এই বাংলায় তোমাদের জায়গা দেবে না।’ জাহানারা ইমামও তাঁর অন্তিম চিঠিতে বিচার সম্পন্ন করার আন্দোলনের দায়ভার কোনো দলকে নয়, জনগণ ও তরুণ প্রজন্মের ওপরই ন্যস্ত করেছিলেন। জাহানারা ইমামের সন্তানেরা আজ এই দুই চিঠিরই উত্তর দেওয়া শুরু করেছে।
 
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে