Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২০ , ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (77 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-১৫-২০১৮

কর্নেল কেন যুদ্ধ ছেড়ে পাকিস্তানে ফিরে গেলেন

জাকির তালুকদার


কর্নেল কেন যুদ্ধ ছেড়ে পাকিস্তানে ফিরে গেলেন

ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বাচ্চুর কথা মনে পড়ে যায় কর্নেলের। এই ছেলেটার সঙ্গে এমনিতে তার ছোটবেলার স্কুলের বন্ধু বাচ্চুর তেমনভাবে কোনো মিলই নেই। বারো-তেরো বছরের ছেলেটির কোমরে প্যাঁচানো একটা ছেঁড়াফাটা লুঙ্গি। গায়ে কোনো জামা-গেঞ্জি নেই। অন্যদিকে বাচ্চু ছিল তাদের স্কুলের সবচেয়ে ফিটফাট ছেলে। আর অসম্ভব পরিচ্ছন্ন। সারাদিন মাঠে ক্রিকেট খেলে আসার পরেও তার গায়ে এক ফোঁটা ধুলো দেখতে পায়নি কেউ কোনোদিন। কীভাবে যে এভাবে নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারত বাচ্চু! কিন্তু এই ছেলেটার সারা গায়ে ধুলোমাখা। তবু তাকে দেখে কর্নেলের কেন যে বাচ্চুর কথা মনে পড়ছে! মনের ভেতর থেকে অস্বস্তি যায় না কিছুতেই। কোনো মিলই নেই দু'জনের, অথচ একজনকে দেখামাত্র আরেকজনের কথা মনে পড়ছে কেন? আবার ভালো করে ছেলেটির দিকে তাকান কর্নেল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করেন আরেকবার। কিন্তু মিল খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে যখন ক্ষান্তি দিতে যাবেন, ঠিক তখনই মনে হয়, পাওয়া গেছে! ছেলেটির দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গির সঙ্গে মিল রয়েছে বাচ্চুর। ঘাড় একদিকে সামান্য কাত করে একরোখা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছেলেটি। ঠিক এভাবেই দাঁড়াত বাচ্চু। তাকে কোনো মিথ্যা কারণে অভিযুক্ত করলে সে কোনোমতেই মাথা নোয়াত না। যত শাস্তির ভয়ই দেখানো হোক না কেন, মচকানো যেত না তাকে। যত লোভই দেখানো হোক না কেন, নিজের জায়গা থেকে টলানো যেত না তাকে। নিজের জেদ বজায় রাখত সবসময়। এমনকি বন্ধুত্বের দোহাই দিয়েও তাকে জেদ থেকে সরানো যেত না। ঠিক একই রকম ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে এ ছেলেটিও। সে জানে কী আছে তার কপালে, সে জানে যে চূড়ান্ত নির্যাতন করা হবে তাকে, তবু তার মধ্যে কোনো ভয়-ডরের চিহ্নমাত্র নেই।

পাকবাহিনীর টহল দল কাল রাতে ধরে এনেছে ছেলেটিকে। ছেলেটি নাকি অন্ধকার পথের পাশের ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থেকে গ্রেনেড ছুড়েছিল আর্মির জিপের ওপর। ভাগ্য ভালো যে, জিপের গায়ে বাড়ি খেয়ে গ্রেনেডটা চলে গেছিল ওর লুকিয়ে থাকা ঝোপের দিকেই। প্রথমে জিপের গায়ে ঠং করে একটা শব্দ। তারপরেই প্রচণ্ড চড়াৎ শব্দে বোমা ফাটা। ভয়ে বুক শুকিয়ে গিয়েছিল জওয়ানদের। ভেবেছিল মুক্তিবাহিনীর কোনো দল আক্রমণ চালিয়েছে তাদের ওপর। কিন্তু বোমার আগুনের আলোয় কোনো মানুষ চোখে পড়েনি তাদের। শুধু দেখা গেল একটি কিশোর ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝোপের ওপাশে। তার হাতে কোনো অস্ত্রও নেই। তখন সাহস ফিরে পেয়ে বাহাদুর জওয়ানের দল ছেলেটিকে পাকড়াও করে নিয়ে এসেছে তাদের ঘাঁটিতে। সারারাত যে ছেলেটির ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা একবার তাকালেই বোঝা যায়। সারা গায়ে ব্যাটনের লম্বাটে চাকা চাকা দাগ, রক্ত লেগে আছে ঠোঁটের গোড়ায়, মুখ ফোলা, একটা চোখ প্রায় বুজে গেছে মার খেয়ে। সারারাত নির্যাতন চালিয়েও ছেলেটির মুখ থেকে মুক্তিবাহিনীর কোনো গ্রুপ বা ঘাঁটি সম্পর্কে একটা কথাও বের করাও যায়নি। এই এলাকার কোন কোন লোক মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, কোথায় কোথায় আশ্রয় নেয় মুক্তিবাহিনী- এসব প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দেয়নি ছেলেটা। ফলে তার ওপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়েই চলছিল ক্রমাগত। কিন্তু ডজনখানেক পাকিস্তানি জওয়ানের বেধড়ক পিটুনি খেয়েও শেষ পর্যন্ত একরোখা পাথরের মতো নিজের জায়গায় অটুট থেকেছে এই তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলেটা। তাই বাধ্য হয়ে আজ সকালে তাকে হাজির করা হয়েছে কর্নেলের সামনে। তিনি এখন সিদ্ধান্ত নেবেন ছেলেটির ব্যাপারে।

ছেলেটার দিকে একভাবে তাকিয়ে রয়েছেন কর্নেল। তাকে দেখেই বুঝেছেন এ ছেলে অন্য ধাতুতে গড়া। বাঙালিদের তিনি ভালো করেই চেনেন। অন্য পাকিস্তানি অফিসারদের চেয়ে বেশি ভালো চেনেন। তারও জন্ম যে এই পূর্ব পাকিস্তানেই। বাঙাল মুলুকেই। বাবার চাকরির সুবাদে ঢাকাতেই থাকতেন তারা সপরিবারে। ম্যাট্রিক পাস করেছেন এই ঢাকাতেই। অনেক বাঙালি বন্ধু এবং সহপাঠী ছিল তার। বাংলা বলতে পারেন অনর্গল। ম্যাট্রিক পাসের পরে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেলেও চিঠিপত্রে আর টেলিফোনে যোগাযোগ ছিল অনেকের সঙ্গে। সেই যোগাযোগ প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে ২৫ মার্চের পর থেকে। তাকে অবশ্য লাহোর থেকে এ দেশে পাঠানো হয়েছে ২৫ মার্চের পরেই। তিনি বাংলা জানেন এবং এই এলাকা মোটামুটি ভালোভাবে চেনেন বলেই এখানে পাঠানো হয়েছে তাকে। পাঠানোর সময় জানানো হয়েছিল, সামান্য কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে ঢাকায়। পূর্ব পাকিস্তানে অল্প কিছু দুস্কৃতকারী পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তাদের দমন করতে হবে। সামান্য কয়েকজন লোককে দমন করলেই হবে। সমস্যাটা মিটে যাবে চিরতরে। কিন্তু এ দেশে আসার পর থেকে কর্নেলের কাছে ব্যাপারটি আর সেই রকম ছোটখাটো বলে মনে হচ্ছে না। হেড অফিস থেকে বলা হয়েছিল, সামান্য কয়েকজন লোক পাকিস্তানের বিরোধিতা করছে। কিন্তু এখানে আসার পর থেকে কর্নেলের মনে হচ্ছে, বাঙালিরা প্রায় সবাই পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে গেছে। তিনি এখন আছেন রাজশাহী অঞ্চলে। এখানে কিছু বিহারি ছাড়া আর কেউ আর্মির ছায়াও মাড়ায় না। চোখে চোখ পড়লেই দেখা যায় বাঙালিদের চোখে রয়েছে ভয় এবং ঘৃণা। এই বাচ্চাটার তো এখন হেসে-খেলে বেড়ানোর কথা, স্কুলে যাওয়ার কথা, বাড়ির কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করার কথা। তার বদলে সে এখন গ্রেনেড ছুড়ছে পাঞ্জাবি মারার জন্য। নিজের জীবনের পরোয়া পর্যন্ত নেই! তার দিকে তাকিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান কর্নেল। কাছে এসে হাত রাখেন ছেলেটার কাঁধে। পরিস্কার বাংলায় বলেন- তুমি কেন বোমা ছুড়েছিলে আর্মির গাড়িতে?

তাকে বাংলা বলতে দেখে একটু অবাক হয় ছেলেটি। মুখের দিকে তাকায়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে কর্নেলের মুখটা। তারপর একটু অবাক কণ্ঠে বলে- আপনে বাঙালি? তাইলে এইসব শয়তান খানসেনাদের সঙ্গে বসে আছেন কেন?

এ কথায় মনে মনে বেশ জোরে হোঁচট খান কর্নেল- তুমি আমার কথার উত্তর দাও! বোমা ছুড়েছিলে কেন?

খানের বাচ্চাদের মারার জন্য। নির্দি্বধায় উত্তর দেয় ছেলেটি।
কোথায় পেয়েছ বোমা?
এ কথার কোনো উত্তর আসে না।
কর্নেল আবার প্রশ্ন করেন- কে দিয়েছে তোমাকে বোমা?
নিশ্চুপ থাকে ছেলেটি।
তুমি কি মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে থাক?
মাথা ঝাঁকায় ছেলেটি। হ্যাঁ।
তোমার দলের অন্যরা কোথায়?
কোনো উত্তর আসে না।
বলো কোথায় মুক্তিবাহিনী ঘাঁটি গেড়ে আছে?
বলব না। আপনে বাঙালি হয়ে শয়তান খানদের পক্ষে থাকেন কী করে? আপনাকে দেখে আমার এখন ঘিন্না হচ্ছে। আমি আপনার সঙ্গে আর কথা কইতে চাই না।

এবার হঠাৎ মাথায় রক্ত চড়ে যায় কর্নেলের। মনে হয়, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাচ্চু, যে বাচ্চুর কাছে চিরদিন জেদের বেলায় পরাজিত হয়েছেন তিনি। নিজের পদমর্যাদা ভুলে চুলের মুঠি চেপে ধরেন তিনি ছেলেটির। ঠাস করে গালে চড় বসিয়ে দিয়ে বলেন- বল শুয়োরের বাচ্চা, কোথায় তোর সাথীরা? 

কোনো উত্তর না পেয়ে এবার প্রচণ্ড জোরে লাথি চালান তিনি ছেলেটির পেট লক্ষ করে।

জয় বাংলা!
গোটা ঘরে যেন বাজ পড়ে! ছেলেটা লাথি খেয়ে আর্তনাদ করার পরিবর্তে চিৎকার করছে জয় বাংলা বলে!

আর সহ্য হয় না কর্নেলের। তিনি সেন্ট্রিদের দিকে ফিরে বলেন- নিয়ে যাও ওকে!

ছেলেটিকে নিয়ে গিয়ে কী করা হবে- জানতে চায় তারা কর্নেলের কাছে। কর্নেল বিরক্ত ভঙ্গিতে বলেন- রুল তো তোমাদের জানাই আছে। অন্য মুক্তিকে ধরলে যা করা হয়, একে নিয়েও তা-ই করবে।

ছেলেটি তখনও পড়ে আছে মেঝেতে। একজন সেন্ট্রি তাকে তুলতে গেলে সে হাত ছাড়িয়ে নেয়। মাটির সঙ্গে বুক মিশিয়ে শুয়ে থাকে আরও কিছুক্ষণ। পরম মমতায় চুমু খায় মাটিকে। তারপর নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে কর্নেলের চোখের দিকে নিস্কম্প তাকিয়ে বলে- এখন আর আমার কোনো চিন্তা নেই। আমি আমার দেশের মাটিকে শেষবারের মতো চুমু খেয়েছি। আমি এখন মরতে প্রস্তুত।

কর্নেল নির্বাক চেয়ে থাকেন ছেলেটির দিকে। এমন করে কথা বলতে জানে একটা বাচ্চা ছেলে! এ যে শুধু বাংলার মাটিতেই সম্ভব!

০২.
পরের সপ্তাহেই বদলি নিয়ে ময়মনসিংহে চলে এলেন কর্নেল।
ময়মনসিংহে এসে কিছুটা ভালো লাগছে তার। এখানে আগে থেকেই চাকরিরত আছে বেশ কয়েকটি পশ্চিম পাকিস্তানি পরিবার। তা ছাড়া কিছু বাঙালি পরিবারের সঙ্গেও সখ্য হয়ে গেছে। দেখা গেল, বাঙালিরা সবাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলে যায়নি। যুদ্ধ এখানেও চলছে। অবিরাম চলছে। মুক্তিবাহিনীর চোরাগোপ্তা হামলারও বিরাম নেই। কিন্তু তারপরও অবসর কাটানোর মতো একটা পরিবেশ পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন কর্নেল। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে পাওয়া গেছে। আনোয়ার। তার স্কুলজীবনের বন্ধু। তাকে পেয়ে খুবই ভালো লাগছে কর্নেলের। স্কুলে তারা তো একসঙ্গে পড়েছেন ম্যাট্রিক পর্যন্ত। তারপরও আনোয়ার কৃষিবিদ হয়ে যখন করাচিতে ট্রেনিং নিচ্ছিলেন, তখনও তার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে কর্নেলের সঙ্গে। আনোয়ারের বাড়িতে গেলেই মনটা ভালো হয়ে যায় কর্নেলের। যুদ্ধের কথা বা গোলাগুলির কথা তারা দু'জনেই এড়িয়ে চলেন। তারা গল্প করেন ক্রিকেট নিয়ে, চাঁদে মানুষ পাঠানো নিয়ে, কৃষি খাতে নতুন নতুন কী আবিস্কার হচ্ছে সেসব নিয়ে, কৃষি খাতে সবুজ বিপ্লব কীভাবে ঘটানো যাবে তা নিয়ে। বাড়ির বৈঠকখানায় বসে তারা গল্প করেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাড়ির ভেতর থেকে মেহমানের জন্য নাশতা আসে, চা আসে। কোনো কোনোদিন কর্নেল সাহেব রাতের খাবারটাও খেয়ে যান এই বাড়িতেই। তিনি বাড়ির লোকদের জন্য উপহারও নিয়ে আসেন নিয়মিত। সবাই তাকে নিজেদের লোক বলেই যেন আদর-যত্ন করে। এই বাড়িতে এলে কর্নেল সাহেব ভুলে যান যে তিনি বাঙালি নন। ভুলে যান যে তিনি এই পরিবারের সদস্য নন। মনে হয় তিনি যেন তার নিজের পরিবারের সঙ্গেই আছেন।

এই রকম একদিন গল্প করছেন দুই বন্ধু। কর্নেল সাহেব নিজের বেল্টসহ পিস্তলটা খুলে রেখেছেন টেবিলের ওপর। এমন সময় দেখা গেল পর্দা সরিয়ে উঁকি দিচ্ছে ফুটফুটে এক শিশু। আনোয়ার সাহেবের সাত বছরের ছেলে মনু। তাকে দেখে খুশি হয়ে উঠলেন কর্নেল। আদর করে ডাকলেন- এসো মনু মিয়া এসো! আজ তোমার সঙ্গে গল্পই করা হয়নি। আমি তোমার জন্য চকোলেট এনেছি। এই নাও!

পকেট থেকে চকোলেট বের করে দিলেন কর্নেল। মনু খুলতে পারছে না দেখে নিজেই তিনি একটা চকোলেটের প্যাকেট খুলে মুখে তুলে দিলেন মনুর। মনু চকোলেট পেলেই খুশি হয়। মনের সুখে চকোলেট চোষে। আজও চকোলেট চুষছে। কিন্তু তার চোখ টেবিলের ওপরে। কর্নেল সাহেবের পিস্তলের দিকে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে কর্নেল নিজেও টেবিলের দিকে তাকালেন। দেখলেন মনু পিস্তলের দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। তিনি হেসে বললেন- ওটা নেবে?

হ্যাঁ।
আচ্ছা আমি তোমার জন্য একটা খেলনা পিস্তল এনে দেব।
মনু একটু আবদারের সুরে বলে- আমি ঐডাই নিমু! 

তার বাবা একটু শাসন করেন মনুকে- এভাবে বলতে হয় না বাবা! চাচা তোমারে আরও সুন্দর একটা খেলনা এনে দেবেন। চাচ্চু তোমাকে কত রকম খেলনা দিছেন! 

মনু নাছোড়। জেদের সঙ্গে বলে- আমি ঐডাই নিমু!

তার বাবা রেগে ওঠেন। ধমক দেন মনুকে। কিন্তু কর্নেল থামিয়ে দেন তাকে। বলেন- ছোট বাচ্চা একটু আবদার তো করবেই। তার জন্য রাগ করার কী আছে ভাই! আমার সবচেয়ে ছোট মেয়ে ফৌজিয়ার জেদ তো দেখনি তুমি। একবার যদি কোনো জিনিস চায়, তাহলে সেটা চাঁদে গিয়ে হলেও তাকে এনে দিতে হবে। সেই তুলনায় মনু তো প্রায় জেদ করেই না বলতে গেলে। মনু চাচ্চু আস তুমি এইখানে আস! আমার কোলে আস।

তাকে কোলে নিয়ে কর্নেল জিজ্ঞেস করেন- এইটা কী জিনিস তুমি কি জান?
হ জানি। এইডা পিস্তল।
বাহ তুমি তো ঠিক ঠিক জান জিনিসটার নাম। তা পিস্তল নিয়ে তুমি কী করবে মনু?
মনু ঘাড় গোঁজ করে বেশ ক্রোধের সঙ্গেই বলে- কয়খান পাঞ্জাবি মারুম!

সঙ্গে সঙ্গে কালো হয়ে যায় কর্নেলের মুখ। মনুকে কোল থেকে নামিয়ে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। পিস্তলসহ বেল্ট বাঁধলেন নিজের কোমরে। তারপর বন্ধু আনোয়ারকে পর্যন্ত সালাম না জানিয়ে একটু যেন টলতে টলতে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে।

০৩.
এদিকে ভয়ে ভয়ে দিন কাটে আনোয়ার সাহেবের। সেদিনের পর থেকে আর আসেননি কর্নেল সাহেব। সে-ও প্রায় এক মাস হতে চলল। মনু যে এমন একটা কথা বলে ফেলবে, কে ভাবতে পেরেছিল। অবুঝ বাচ্চাটা না জানি কী বিপদেই ফেলল পরিবারের লোকদের! কর্নেল রেগে গিয়ে কী যে করেন তার ঠিক নেই। আনোয়ার সাহেব ঠিক করে রেখেছেন, মনুর পক্ষ থেকে নিজে ক্ষমা চাইবেন কর্নেল সাহেবের কাছে। অনুরোধ জানাবেন, ছোট বাচ্চার কথায় যেন কিছু মনে না করেন তিনি। 

কিন্তু কর্নেল আর এলেনই না। একবারের জন্যও না। তবে চিঠি এলো একদিন। চিঠি এলো আনোয়ার সাহেবের নামে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাঠানো হয়েছে চিঠি। সেই কর্নেল সাহেব লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, আর্মির চাকরিতে রিজাইন দিয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে এসেছেন। তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতার নামে আর যুদ্ধ করতে রাজি নন। কারণ তিনি অন্তর থেকে জেনে গেছেন যে, এই যুদ্ধে বাঙালিদের বিজয় অবধারিত। খানসেনাদের খতম করার জন্য যখন শিশুরা পর্যন্ত অস্ত্র তুলে নিতে চায় হাতে, তখন সে জাতির স্বাধীনতা হরণ করে রাখতে পারে না কোনো শক্তিই।

এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কী লাভ! 

এমএ/ ০৪:০০/ ১৫ ডিসেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে