Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০ , ২৪ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.0/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-২৩-২০১৩

ক্ষমতা ও রসাতল

ফারুক ওয়াসিফ



	ক্ষমতা ও রসাতল
জো জিতা ওহি সিকান্দার। যুদ্ধক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত যিনি দাঁড়িয়ে থাকেন তিনিই জয়ী। আর যে চরিত্রটিকে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় পিটিয়ে শুইয়ে রাখা যায়, তিনি বাংলাদেশের তরুণ সাংবাদিক। আর এহেন সাংবাদিক প্রহারজনিত কারণে ফৌজদারি মামলার আসামি হয়েও যিনি টক শোতে টক-ঝাল-মিষ্টি কথায় আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ পান, তিনিই বীর সাংসদ গোলাম মাওলা রনি। গ্রামবাংলায় এ ধরনের প্রতাপশালী ব্যক্তিদের ‘বাপের ব্যাটা’ বলা হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের বাপের ব্যাটার সংখ্যা কম হলেও তাদের দাপটে সাধারণ মানুষকে সমঝে চলতে হয়। রনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার এক দুর্দান্ত প্রতীক। অতি অল্প সময়ে তিনি ‘নেতা’ ও সাংসদ হয়েছেন। বাংলাদেশের সংসদে এ ধরনের ৩৩০ জন সাংসদের মধ্যে প্রচারের মাপকাঠিতে তিনি প্রথম ৩০ জনের মধ্যেই পড়বেন। কিসের জোরে—সেটা এক প্রশ্ন বটে!
রনি যে কেবল কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সত্যটা তুলে ধরতে পেরেছেন, সেদিকে আমাদের মনোযোগ দেওয়া দরকার। তিনি প্রমাণ করেছেন ‘মাইরের ওপর বড় ওষুধ নেই’—অন্তত বাংলাদেশে। এখানে যারই শক্তি-সমর্থন বা দাপট আছে, তিনিই যেকোনো বিরোধিতাকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করতে চান। বল প্রয়োগ হলো সেই শক্তিশালী মুদ্রা, যা যেকোনো বাজারেই কার্যকর। ক্ষমতাধরেরাও জেনে গেছেন, মারপিটে কাজ হয়। আন্দোলন দমনে মারপিট, শত্রুকে দমন করায় মারপিট, টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে দলীয় পদ নিয়ে কোন্দলে মারপিট, এমনকি বিয়ের আসরেও মারপিটের প্রচলন বাংলাদেশে আছে। বল প্রয়োগের ভিত্তির ওপরই এই সমাজটা দাঁড়িয়ে আছে। মারের ভয়ে এখানে মানুষকে চুপ করিয়ে রাখা হয়, মারের ভয়ে আইন মানানো হয়, আর মার দেওয়ার ক্ষমতা যার বেশি, অনেক ক্ষেত্রে আইনের ন্যায়দণ্ডও তার সামনে গিয়ে মাধবীলতার মতো কোমল হয়ে যায়। 
সাংসদ হলেন আইনপ্রণেতা। তাঁদের হাত দিয়ে আইন তৈরি হয়। যে হাতে আইন তৈরি হয়, সেই হাত বেআইনিভাবে আরেকজন নাগরিককে প্রহার করার অর্থ, আইনপ্রণেতার হাতের চাইতে মাস্তানির হাতই এখানে বেশি শক্তিশালী। গোলাম মাওলা রনি আলবত সেই সত্য জানেন এবং মানেন। যৌবনে এ রকম ডাকু সাংসদ বা নেতারাই ভবিষ্যতে প্রথিতযশা রাজনীতিক হয়ে ওঠেন। আমাদের রাজনীতিতে এ রকম মারদাঙ্গা রাজনীতিবিদের সংখ্যা কম নয়। অনেকেরই অতীতের রেকর্ড মাস্তানির, বন্দুকবাজির, দাঙ্গাবাজির। হয় তাঁরা নিজেরা করেছেন অথবা তাঁদের নেতৃত্বে এসব কর্ম সাধিত হয়েছে। এসব কারণেই তাঁরা ঊর্ধ্বতন নেতাদের আস্থাভাজন হয়েছে এবং মানুষও তাঁদের চিনতে পেরেছে। উত্থানের কালে যদি এঁদের কৃতকর্মের বিচার হতো, তাহলে দেশ অনেক দাপুটে নেতা থেকে বঞ্চিত হতো। তাঁরাও বঞ্চিত হতেন দেশ ও মানুষের সেবা করার সুযোগ থেকে। গোড়াতেই যদি বিচারের মুখোমুখি করা হতো, তাহলে জয়নাল হাজারী নামক গডফাদারের জন্ম হতো না। প্রথম অভিযোগেই যদি নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হতো, তাহলে সেখানে গডফাদার বলে কিছু তৈরি হতো না—সেই সুযোগ তাঁরা পেতেন না। ঠিক যেমন যদি প্রথম দফাতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হতো, তাহলে আজ তাদের পক্ষে বোমা-বারুদ নিয়ে গৃহযুদ্ধ বাধানোর হুমকি দেওয়ার লোক পাওয়া যেত না। গুণ নয়, দোষই সংক্রামক। বাংলাদেশে বিরোধ-মীমাংসার প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে মারপিটের প্রচলন বাড়ার কারণ, স্বয়ং আইনপ্রণেতারাই এই ওষুধের প্রধান সেবক। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই, এ ধরনের ব্যক্তিদের বাড়াবাড়িতে ত্যক্তবিরক্ত সাধারণ মানুষও একসময় লাঠি হাতে এদের ধাওয়া করে।
গত রোববারের প্রথম আলোতেই দেখা যাচ্ছে, ফরিদপুরে সাজেদা-হালিম নামে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের গোলাগুলির সংবাদ। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, ওই ঘটনায় উভয় পক্ষের নেতারা নিজেরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণ করছেন। বিরোধী দলের আন্দোলন মানেই সহিংসতা। সরকারি দলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযান মানেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ ও রক্তপাত। এমনকি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার আন্দোলনকারীদেরও দেখা যায় কথায় কথায় লাঠি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে। জড় ও জীবজগতের কোনো কিছুই তাদের এই তেজস্ক্রিয় ক্রোধের নিশানা থেকে রেহাই পায় না। গাড়ি থেকে গাছ, ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে দোকানপাট—সবকিছুই রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের বল প্রয়োগের হুমকিতে কম্পমান।
গোলাম মাওলা রনির বলার মতো যুক্তি অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু নিরীহ, নিরস্ত্র সাংবাদিকদের দলবল নিয়ে পেটানো কেমন কথা? যাঁদের আচরণ এমন সহিংস, যাঁদের মনের মধ্যে এমন প্রতিহিংসা তাঁদের পদস্পর্শে তো জাতীয় সংসদের পবিত্রতা ঘুচে যাওয়ার কথা। তার পরও এঁরাই সেখানে দাঁড়িয়ে বড় বড় কথা বলবেন। টক শোর মাধ্যমে এঁদের সামাজিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করে দেবে কোনো কোনো মিডিয়া। রনির যাঁরা সমর্থক তাঁরা নির্দ্বিধায় কোন কোন যুক্তিতে সাংবাদিকদের পেটানো ‘উচিত’ হয়েছে, সেটা বলবেন। এভাবেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বল প্রয়োগ তথা সহিংসতার বাজার চাঙা থাকবে। আবার এই মানুষদের মুখ থেকেই আমাদের শুনতে হবে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ন্যায় ও সহনশীলতার কথা! এক জ্ঞানীর বচন পড়েছিলাম: খারাপ ব্যক্তিদের কাজের জন্য একটি সমাজ রসাতলে যায় না, একটি সমাজ তখনই ধ্বংস হয়, যখন ভালো মানুষেরাও অন্যায়কে সমর্থন করেন বা সে বিষয়ে উদাস হয়ে যান।
কিন্তু সাধারণ মানুষের উদাসীন হয়ে যাওয়ার উপায় নেই। শনির আখড়ার বিখ্যাত দৌড় সালাহউদ্দিন এমপি কিংবা কানসাটের শাহজাহান এমপির পলায়নের ঘটনা অনেকেরই মনে আছে। ক্ষমতার ভারসাম্য বলে একটা সামাজিক নিয়ম আছে। ক্ষমতার দাপট চরমে উঠলে সেই ক্ষমতাকে শায়েস্তা করতে বাধ্য হয় সাধারণ মানুষ। আর দিকদিশাহীন ক্ষমতা হলো মিষ্টির রসের মতো। সেই রস খেতে যতই মজার হোক, মাছির মৃত্যু হয় সেই রসে নিমজ্জিত হয়ে। বাংলাদেশে যাঁরা আজ ‘বাপের ব্যাটা’ হয়েছেন, রসাতল শব্দটি তাঁরা যেন মনে রাখেন।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
farukwasif@yahoo.com

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে