Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ , ১১ ফাল্গুন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (20 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২১-২০১৯

আমলা নয়, গবেষকরা রাজাকারের তালিকা করুক

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক


আমলা নয়, গবেষকরা রাজাকারের তালিকা করুক

রাজাকারের তালিকা তৈরি গুরুত্বপূর্ণ ছিল গণহত্যা ও নির্যাতন, নিপীড়ন, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনের শিকার ব্যক্তিদের বিচার পাওয়ার স্বার্থেই। কারণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটিও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সমান দায়ী। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা হানাদার বাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে হানা দেওয়া। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই করুণ ছিল। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহারের জন্য কোনো ধরনের উন্নয়ন কাজ হয়নি। হানাদার বাহিনীকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে হানা দেওয়ার কাজে সহায়তা করেছে তাদের এ দেশীয় দোসররা। হানাদার বাহিনীর পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না কোন পরিবারের সদস্য মুক্তিযুদ্ধে গেছে বা কোন পরিবারের নারী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে। রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটি এগুলো করেছে। তারাও হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠনে অংশ নিয়েছে। তাদের শনাক্ত ও বিচার করা ছাড়া রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ইতিহাসের দায় শোধ করতে পারে না।

দুর্ভাগ্যবশত, রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা প্রকাশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে লেজেগোবরে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত, অগ্রহণযোগ্য। রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম অন্তর্ভুক্তির মতো চরম অব্যবস্থাপনা বর্তমান সরকারের একটি মন্ত্রণালয় করতে পারে, আমার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। সবচেয়ে বেশি কষ্ট অবশ্য এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের। তারা জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের অনেকের পরিবারের সদস্য মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্যাতিত, নিগৃহীত হয়েছে। তাদের জন্য এই তালিকা ছিল চরম মানসিক নির্যাতন।

বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও উদ্বেগের পর শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় যদিও তালিকাটি প্রত্যাহার করেছে, ক্ষতি যা হওয়ার ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার সপক্ষের ব্যক্তিদের মনে যে আঘাত দেওয়া হয়ে গেছে, তা সহজে নিরাময় হবে না। আওয়ামী লীগের জন্য এর রাজনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো ইতোমধ্যে এই তালিকা নিয়ে নানা রকম প্রপাগান্ডা শুরু করেছে। প্রশ্ন তুলছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও। এসব প্রশ্ন রাজনৈতিকভাবে নিরসনে আরও অনেক পরিশ্রম করতে হবে আওয়ামী লীগকে।

বেদনার বিষয়-

যে দল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, যে দলের শাসনামলে স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার হচ্ছে, যে দল মুক্তিযোদ্ধাদের হূত মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে, যে দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাতির সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে পরিশ্রম করে যাচ্ছে- তাদের সময় এমন একটি 'ভুল' কীভাবে মেনে নেওয়া যায়? সংশ্নিষ্টরা এর দায়দায়িত্ব কেবল তালিকা প্রত্যাহার করে এড়াতে পারে না।

আমরা জানি, মহান মুক্তিযুদ্ধ মাত্র ৯ মাসে সমাপ্ত হলেও এর রেশ বাঙালি জাতির জীবনে অনাগত যুগগুলোতেও শেষ হবে না। উপমহাদেশে তো বটেই, বিশ্বজুড়েই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল বিংশ শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্বাধীনতা সংগ্রাম। স্বাধীনতার জন্য এত প্রাণ, এত রক্ত আর কোনো জাতি দেয়নি। আর কোনো মুক্তিযুদ্ধ এভাবে জনযুদ্ধ হয়ে উঠেছিল কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অন্যান্য জাতি যেভাবে তাদের স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের দলিল ও স্মারক সংরক্ষণ করতে পেরেছে, আমরা সেটা পারিনি। এর একটি প্রধান কারণ, স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মন্তুদ হত্যাকাণ্ড। প্রতিবেশী ভারতেও স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় দেশটির জাতির জনক মহাত্মা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের মতো জাতির পিতাবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসেনি। বস্তুত পঁচাত্তরের পর দুই দশক ধরে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিপরীত পথে হেঁটেছে। এমনকি চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীরাও তখন রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ পদে আসীন হয়েছে। ঘাতকের গাড়িতে উড়েছে আমাদের রক্তে রাঙা পতাকা। ওই দীর্ঘ অন্ধকারেই আসলে হারিয়ে গেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক দলিল ও স্মারক।

সৌভাগ্যের বিষয়-

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেন পুনরুজ্জীবন লাভ করে। মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে পায় মর্যাদা, স্বাধীনতার সপক্ষের মানুষ ফিরে পায় আত্মবিশ্বাস। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও দলিলপত্রও সংরক্ষিত হতে থাকে। আমরা দেখেছি, শেখ হাসিনার চার মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির জমানো অনেক জঞ্জাল ইতোমধ্যে পরিস্কার করা হয়েছে। জাতির পিতা হত্যার বিচার নিয়মিত আদালতে সম্পন্ন হয়েছে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের অনেকে ইতোমধ্যে কৃতকর্মের সাজা পেয়েছে। আরও অনেকের বিচার চলছে। দুঃখের বিষয়- জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার সদিচ্ছা ও সংগ্রাম তারই কোনো কোনো সহকর্মী অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যেখানে শেখ হাসিনার জন্য তারা সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করার কথা ছিল, সেখানে তারা বিপরীত কাজ করছেন।

রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা বর্তমান সরকারের মুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত করতে পারত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অবিমৃশ্যকারিতায় এখন সেই তালিকা প্রকাশ সরকারের জন্যই যেন বুমেরাং হয়েছে। আর কিছু না হোক, এই তালিকা বিরোধী দলের হাতে একটি মোক্ষম হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। আরও বড় কথা, এর মধ্য দিয়ে তারা রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা তৈরির কাজটিও পিছিয়ে দিয়েছে। আমরা অনেকদিন ধরেই স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা তৈরির দাবি জানিয়ে আসছিলাম। সেই দাবিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সাড়াও দিয়েছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজটির যে এমন পরিণতি হবে, কে ভেবেছিল!

আমি মনে করি, এখনও সময় আছে। আমলানির্ভর তালিকার বদলে, রাজাকারসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা প্রণয়নে গবেষক, ইতিহাসবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের যুক্ত করতে হবে। আমলানির্ভর তালিকার কী পরিণতি হতে পারে, তা আমরা তো দেখতেই পেলাম। এই ভুল দ্বিতীয়বার করা যাবে না। একই সঙ্গে যারা এই ত্রুটিপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের সবাইকে শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও পদবি যাই হোক, জাতির সঙ্গে তামাশা করার মার্জনা পেতে পারে না।

স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা তৈরিতে সংবাদমাধ্যম একটি বড় উৎস হতে পারে। ১৯৭২-৭৫ সালের পত্রপত্রিকায় প্রায় প্রতিদিনই স্বাধীনতাবিরোধীদের কর্মকাণ্ড ও পরিচিতি প্রকাশ পেয়েছে। তালিকা প্রণয়নের এসব আমলে নেওয়া যেতে পারে। পঁচাত্তর-পরবর্তী দুই দশকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে সরকার নির্লিপ্ত থাকলেও বেসরকারি পর্যায়ে বা ব্যক্তি উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। নতুন তালিকা প্রণয়নে সেসব গবেষক ও তাদের গবেষণাকর্মের সহায়তা নেওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ দেশের বিভিন্ন জাদুঘরেরও সহায়তা নেওয়া যেতে পারে এ ক্ষেত্রে। আমি জানি, অনেক সাংবাদিক স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে কাজ করেছেন। তাদেরকেও সঙ্গে নিতে হবে।

স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা প্রস্তুতে সর্বোচ্চ সতর্কতার বিকল্প নেই। পঁচাত্তর-পরবর্তী দুই দশকে এসব দলিলে কতটা যোগ-বিয়োগ করা হয়েছে, আমরা জানি না। তালিকা প্রণয়ন ও প্রকাশেও কারসাজি থাকতে পারে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌশলী রাজাকারের তালিকায় থাকা নিছক 'ভুল' হতে পারে না।

আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ ব্যাপারে একটি কার্যকরী কমিটি করা উচিত। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, গবেষক, ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের রাখতে হবে। সবাই আন্তরিক হলে আগামী মার্চের মধ্যেই ত্রুটিহীন একটি তালিকা প্রকাশ সম্ভব। যদি সময় লাগে, প্রয়োজনে পরে প্রকাশ করলেও ক্ষতি নেই। আমরা রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধী তালিকা নিশ্চয়ই চাই। কিন্তু একটি যথার্থ তালিকা প্রকাশে যদি বিলম্ব করতে হয়, সেটাও ভালো।

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এন কে / ২১ ডিসেম্বর

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে