Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০ , ২০ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (60 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২১-২০১৯

‘শেখ হাসিনা এখন রাজাকার দ্বারা পরিবেষ্টিত’

দীপন নন্দী


‘শেখ হাসিনা এখন রাজাকার দ্বারা পরিবেষ্টিত’

সম্প্রতি লন্ডন থেকে বাংলাদেশে এসেছেন একুশের অমর গানের রচিয়তা ও প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী। অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনে। প্রাচীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশের রাজনীতি, তার জীবন-কর্ম এবং অমর একুশের গান নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন এ প্রতিবেদকের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দীপন নন্দী। দেশে বিদেশে'র পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: স্বাধীনতার ৫০ বছরের দ্বারপ্রান্তে আমরা দাঁড়িয়ে। যে আদর্শ নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, বিগত ৪৯ বছরে তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: বাংলাদেশের নামটা বাস্তবায়িত হয়েছে। আদর্শের প্রাণ বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রশ্ন: এর কারণ কী বলে মনে করছেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্র গঠনে বাধা দিয়ে দেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল এবং সে আদর্শগুলোকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। এরপর বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তারাও দেশের এবং দেশের বাইরের চাপে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারেনি। সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা যায়নি। সামাজিক জীবনে ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। বিএনপি ও জামায়াত মিলে দেশটাকে সাম্প্রদায়িকতার যে জালে জড়িয়ে ফেলেছে, সে জাল শেখ হাসিনার পক্ষে একা কাটা সম্ভব হয়নি। তিনি নিজেও চারদিকে এমন সব শক্তি দ্বারা বেষ্ঠিত, তারা তাকে এ পথে যেতে বাধা দিচ্ছে। এসব নানা কারণে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। এর জন্য আরও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে।

প্রশ্ন: ৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি দাবি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। সংসদেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ অবস্থাতেও কেন তারা ৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারছে না?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ৭২-এর সংবিধান প্রবর্তন ও প্রত্যাবর্তন আওয়ামী লীগের ওয়াদা। যা পুরোপুরি পালন হয়নি। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম থেকে বাদ দেওয়া হয়নি, ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়নি। এক কথায় ৭২-এর সংবিধানের মূল ভিত্তিকেই পুনঃস্থাপন করা হয়নি। শেখ হাসিনার সরকার জনমতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ৭২-এ ফিরে যাচ্ছে। তারা শাসনতন্ত্রে বা সংবিধানের যেসব ধারা গণতন্ত্রের বিরোধী ছিল সেসবকে বাদ দিয়েছে। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বৈধতা বাতিল করেছে। এখন ৭২-এর সংবিধানে পুরোপুরি ফিরে যেতে পারবেন, যদি সংবিধান থেকে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বাদ দেওয়া যায়। কিন্তু জনমতের ভয়ে আওয়ামী লীগ সে পথে এগুতে পারছে না। আমাদের জনগণ এখনও ধর্মান্ধ। একটি পরিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত করার পর ৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া সম্ভব। তার আগে সম্ভব বলে মনে করি না।

প্রশ্ন: শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) থেকে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন শুরু হচ্ছে। যাতে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা আবারও দায়িত্ব নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু তিনি বারবার এ দায়িত্ব থেকে দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন। শেখ হাসিনার পর অন্য নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কতটা শক্তিশালী থাকবে বলে আপনি মনে করেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: শেখ হাসিনা সরে গেলে একটা অরাজক অবস্থা দেখা দেবে। আমার ধারণা তিনি যদি সরে যেতে চান, তাহলে একজন একটি নির্বাচিত সভাপতির হাতে দায়িত্ব দিতে হবে। তার মনোনীত সভাপতির হাতে নয়। সে সঙ্গে তিনি অভিবাবক হিসেবে দলের উপরের ছায়া হয়ে থাকবেন। তার নেতৃত্ব আরও কিছুদিন প্রয়োজন হবে, দলের জন্য, দেশের জন্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ যতদিন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক দল না হবে, ততদিন পর্যন্ত শক্তিশালী হবে না। সভাপতি নির্বাচন থেকে শুরু করে সবকিছু তার হাতে, এটা গণতেন্ত্রর পরিচয় নয়। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আওয়ামী লীগের ভেতরে আগে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের কমিটিগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সে সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদের প্রবেশ করানো হচ্ছে এটা বন্ধের উপায় কী?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: আমি মনে করি, ভোটের মাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র বিকল্প নেই। মনোনয়ন দিয়ে দল ও সরকার গঠন হলে গণতন্ত্র কার্যকর হয় না। আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা সিন্ডিকেট তৈরি করে। ছাত্রলীগকে ধ্বংস করেছেন এই মন্ত্রীরা। তারা সিন্ডিকেট তৈরি করেন এবং মন্ত্রীর প্রভাব যাতে বজায় থাকে সেজন্য এলাকায় নানা অত্যাচার করে। তারা ও তাদের সঙ্গীরা দুর্বৃত্তদের প্রশ্রয় দেন। পুলিশও তাদের আটকাতে পারেনা। উপরের ক্ষমতার জোরে প্রভুত্ব বিস্তার করে। যাতে জনগণের সমর্থন থাকে না। আজকে যদি আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন করা না হয়, বর্তমানে যেভাবে আছে তা থাকে, তাহলে শেখ হাসিনার পর অস্তিত্ব থাকবে না। শেরে-এ-বাংলা এ কে ফজুলল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি, মাওলানা ভাসানীর ন্যাপের মতো আওয়ামী লীগের অবস্থা হবে।

প্রশ্ন: আমরা বিগত ১০ বছরে কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল দেখতে পাচ্ছি না। শক্তিশালী বিরোধী দল ফিরিয়ে আনতে কী প্রয়োজন? আমরা কি আরেকটি নির্বাচনে যাবো?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: এ ভুলটার শুরু বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে। বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেছিলেন খুবই ভালো চিন্তা থেকে। তাতে বিরোধীতা করার কোনো রাস্তা খোলা রাখেননি। তার মৃত্যুর পর জিয়াউর রহমান তিনি বিরোধীদল তৈরি করতে দিলেন। কিন্তু তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। সংসদে অনাস্থা দেওয়ার, বাজেট সংশোধন করার কোনো ক্ষমতা নেই। প্রেসিডেন্টকে ইমপিচমেন্ট করার ক্ষমতাও ছিল না। এক রকম পুতুল পার্লামেন্ট তৈরি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাজনীতি দুই ভাগ হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পক্ষে আর বিপেক্ষ। বিএনপি গঠিত হয় স্বাধীনতাবিরোধীদের সমর্থনে। ফলে স্বাধীনতার স্বপক্ষে একটি ভালো সংগঠন তৈরি হয়নি।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধুর সময়ে জাসদ শক্তিশালী ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক দলগুলো কেন শক্তিশালী বিরোধীদল হতে পারেনি?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: আওয়ামী লীগ আমলে জাসদকে সন্ত্রাসের পথে ঠেলে দেওয়া হয়। জাসদ ভুল করার পরে সঠিক পথে আসতে পারতো। কিন্তু তাদের উপরে দমননীতি প্রয়োগ করা হয়। তারা সব চলে যায় সন্ত্রাসের পথে। জিয়া ও তার পরের বাকি সরকারের আমলে বিরোধীদলকে তৈরি করতে দেওয়া হয়নি। বর্তমান শেখ হাসিনা আমলেও বিরোধীদলকে মাথা তুলতে দেওয়া হয়না। বিএনপিকে দেওয়া হচ্ছে না, ঠিক আছে। কারণ তারা স্বাধীনতার বিপক্ষের দল। গণজাগরণ মঞ্চ যখন তৈরি হয়েছিল তখন আমার মনে হয়েছিলো একটি বিরোধীদল গড়ে উঠবে। কিন্তু হতে দেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পক্ষের লোককে এগিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি।

প্রশ্ন: এটা কি শেখ হাসিনার ভুল? নাকি তার আশপাশের মানুষের ভুল পরামর্শ?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: এটা শেখ হাসিনার নিজেরই সিদ্ধান্ত। তিনি ভুল করেননি। তিনি যদি এখনই পবিত্র হতে চান, তাহলে মারা যাবেন। কারণা তার বিরোধীতাকারীরা ধর্মান্ধ ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী। নব্যধনীরা সংসদ, গণমাধ্যম দখল করেছে। শেখ হাসিনা রাতারাতি তাদের বিরুদ্ধে গেলে মারা যাবেন। সেজন্য উনি ধীরে চলার নীতি নিয়েছেন। ইতোমধ্যেই তার প্রধান শত্রু বিএনপি, জামায়াত, স্বাধীনতাবিরোধী, বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের ধ্বংস করেছেন। এখনই পুরো গণতন্ত্র দিলে তা ঠিক হবে না।

প্রশ্ন: গত ১৫ ডিসেম্বর যখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করেছিল, তখনই আপনি জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে ওই তালিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। যা পরবর্তীতে সঠিক হয়। কীভাবে আপনি এই ভবিষ্যতবাণী করলেন? আপনার কাছে কী কোনো তথ্য ছিল?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: এটা বলতে পারেন সাংবাদিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমি ৫০ বছর ধরে সাংবাদিকতা করি। জ্ঞানবৃদ্ধি পায়নি, কিন্তু অভিজ্ঞতা বেড়েছে। সে অভিজ্ঞতার জের ধরেই বলতে পারি, রাজাকারের তালিকা কোনো রাজাকারই করেছে।

প্রশ্ন: আপনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের একই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন- ‘শেখ হাসিনা রাজাকার দ্বারা পরিবেশিষ্ট’। এ মন্তব্যের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: যেহেতু আমি বাংলাদেশে থাকি না, সেহেতু খুব সহজেই বলতে পারি 'শেখ হাসিনা এখন রাজাকার দ্বারা পরিবেষ্টিত'। এটা বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সময়ে আমি লন্ডনে ছিলাম। ফিরে এসে দেখি বঙ্গবন্ধুর যিনি মুখ্যসচিব হয়েছেন, তিনি পাকিস্তান রাজাকার বাহিনীর স্কোয়াড লিডার ছিলেন। আরেকবার দেখি কর্নেল ফারুককে বঙ্গবন্ধু তার পারসোনাল গার্ডদের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। সরদার আলীকে তিনি গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানের দায়িত্ব দেন। যে কিনা পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর পূর্ব পাকিস্তান অংশের প্রধান ছিলেন। জিয়াউর রহমানকেও তিনি পোস্ট দেন। যে কিনা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সেকেন্ড গ্রুপের লিডার ছিলেন।

প্রশ্ন: রাজনীতি তো অনেক আলাপ হলো। এবার একটু ভিন্ন বিষয়ে যাই। সেটি হলো আপনার অমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো... আমি কি ভুলিতে পারি’। যদিও বহুবার বলেছেন, তারপরও আরেকবার যদি গানটার সৃষ্টির গল্প বলতেন।

আবদুল গাফফার চৌধুরী: বাংলা একাডেমি থেকে ‘একটি গানের জন্মকথা’ নামে বই রয়েছে। সেখানে বিস্তারিত লিখেছি। বারবার বলাটা কষ্টকর। ৬০ বছরে ৬০০ বার বলেছি। রিপিট করতে করতে অনেক ভুল তথ্যও ঢুকে যাচ্ছে।

প্রশ্ন: তারপরও যদি একটু বলতেন। যতদূর জানি, প্রথমে সেটি কবিতা ছিল।

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার উপরে পুলিশ গুলি ছোঁড়ার পর ঢাকা মেডিকেলের আউটডোরে একটি লাশ দেখতে পাই। সেটি ছিল শহিদ রফিকের লাশ। সেটা দেখি আমি একটি কবিতা লিখি। সেটা আমাদের বর্তমান জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী আতিকুল ইসলামের চোখে পড়ে। কবিতাটা তিনি নিয়ে যান আবদুল লতিফের কাছে। তিনিই প্রথমে সুর দেন। ১৯৫৩ সালে শহীদ আলতাফ মাহমুদ গানটির আবার সুর দেন। সেই সুরটিই এখন প্রচলিত।

প্রশ্ন: আপনি প্রতিদিনই কলাম লেখেন। কীভাবে লেখেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: এটা সত্য যে আমি প্রতিদিনই লিখি। প্রতিদিন সকালে লিখি। এক সময় বাবার সঙ্গে ফজরের নামাজ পড়তাম। এখন নামাজ পড়ি না। কিন্তু অভ্যাসটা রয়ে গেছে। অভ্যাসে সকালে উঠে কিছু কাজকর্ম করার আগে লেখা শুরু করি। শেষ করে অন্য কাজ করি। সকাল ১০টা-১১টার মধ্যে লেখা শেষ হলে সেটি পাঠিয়ে দিয়ে অন্য কাজ শুরু করি।

প্রশ্ন: আপনি জীবনের শুরুতে গল্প-কবিতা লিখতেন। সেগুলো জনপ্রিয়তাও পায়। কিন্তু পরবর্তীতে সেটি কেন ধরে রাখলেন না?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: সাহিত্যিক আবদুল গাফফার চৌধুরী মারা গেছেন- বলতে পারো।

প্রশ্ন: এর কারণ?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: অর্থনৈতিক কারণ। কলেজ থেকেই নিজের খরচ নিজেই চালাতাম। বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের পারিবারিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। তখন ঢাকায় চলে আসি। ‘ইনসাফ’ নামে একটি পত্রিকায় ৭৫ টাকা বেতনে নাইট শিফটের কাজ নিই। এরপর ‘সংবাদ’, ‘মিল্লাত’-সব কাগজে চাকরি করেছি। এর ফাঁকে ফাঁকে গল্প-কবিতা লিখেছি। কিন্তু বিবাহিত জীবনে গিয়ে দেখলাম, গল্প-কবিতা লিখে কিছু হবে না।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম বইয়ের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ১৯৫৯ সালে আমার প্রথম বই ‘কৃষ্ণপক্ষ’। বইটি ইস্টবেঙ্গল পাবলিকেশন থেকে প্রকাশ পেয়েছিল। সুরেশ বাবু ছিলেন প্রকাশক। ১০০ টাকা নিতে ১০০ বার যেতে হয়েছিল।

প্রশ্ন: সাংবাদিকতা পেশায় থেকেও অনেকে সাহিত্য ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু আপনি সেটা করেননি, এ নিয়ে আপনার কোনো আক্ষেপ আছে কী?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: আক্ষেপ আছে। আমার সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছা ছিল না। হওয়ার কথা ছিল সাহিত্যিক।

প্রশ্ন: ১৯৭৪ সালে কলকাতা হয়ে লন্ডনে চলে যান। এরপর কেন দেশে কেন ফিরে আসলেন না?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: প্রথমত আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। তার সব ওষুধ বাংলাদেশে পাওয়া যেত না। বঙ্গবন্ধুই আমাকে পাঠিয়েছিলেন, টাকাও দিয়েছিলেন। এরপর আর দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। পরে শেখ হাসিনার সময় আমায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এজন্য অনেকেই বলেন, বঙ্গবন্ধু চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলেন আর শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে এনে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

প্রশ্ন: আপনি ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলজেরিয়ায় জোট নিরপেক্ষ (ন্যাম) সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ভয় ছিলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। কারণ, ওটা অনেক বড় সম্মেলন ছিল। মিশরের আনোয়ার সাদাত, সৌদি আরবের কিং ফয়সাল, লিবিয়ার গাদ্দাফি, কিউবার ফিদেল কাস্ট্রোসহ ৭৩ দেশের প্রতিনিধি এসেছিলেন।বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল, কিন্তু দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না। মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কথা বলতে পারবেন কী-না সে বিষয়ে সন্দেহ ছিলো। কিন্তু সেই সন্দেহ তিনি কাটিয়ে এসেছিলেন। এটাই তার বড় বিশেষত্ব।

ওই সম্মেলনে প্রথম বর্ণানুক্রমিকভাবে আফগানিস্তানের প্রতিনিধির কথা বলার কথা ছিল। কিন্তু তিনি বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শুনতে চাই। এরপর বঙ্গবন্ধু বক্তৃত করেন। যা শুনে ফিদেল কাস্ট্রো ছুটে এসে বঙ্গবন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, আপনাকে দেখেছি। আমার আর হিমালয় দেখার দরকার নেই’। সৌদি আরবের কিং ফয়সাল যে কিনা একাত্তরে পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছিল গণহত্যার জন্য। তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে বারবার বলেন, ‘আমি লজ্জ্বিত, আমি লজ্জ্বিত। বঙ্গবন্ধু যে বড় লিডার, সেটা ওই সম্মেলনেই প্রমাণ হয়ে যায়।’

প্রশ্ন: আর কোনো স্মৃতি?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ওই (ন্যাম) সম্মেলনে একবার গণ্ডগোল লেগে যায়। আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলায় তিউনিয়াশার হাবিব বুর্গিবা চটে যান। তিনি বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ ঠিক আছে। কিন্তু আমেরিকাও একটা পক্ষ। এসব নিয়ে কথা কাটাকাটির এখন পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমরা দুই পক্ষ নয়। একটা পক্ষ। সেটা হলো আমরা সব সর্বহারার দল।’ এরপর সবাই হাততালি দিয়ে তাকে সমর্থন দেন।

আরও একটা স্মৃতি আছে। আলজেরিয়ার বিখ্যাত মসজিদ গ্র্যান্ড মসজিদে বঙ্গবন্ধু, আনোয়ার সাদাত, কিং ফয়সল দলবেধে নামাজ পড়তে যেতেন। আর কোনো মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক যেতেন না। তখন একদিন আলজেরিয়ার এক সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি তো সেক্যুলার, তাহলে নামাজ পড়েন কেন?’ এর জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ইন মাই পারসোনাল লাইফ, আই এম এ ট্রু মুসলিম। বাট ইন মাই পলিটিক্যাল লাইফ, আই এম সেক্যুলার।’ এ বক্তব্য যে সময় আলজেরিয়ায় আলোড়ন তোলে।

আর/০৮:১৪/২২ ডিসেম্বর

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে