Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ , ৪ ফাল্গুন ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-১৩-২০২০

খালেদা জিয়ার জেলজীবন

আনিস আলমগীর


খালেদা জিয়ার জেলজীবন

দুই বছর ধরে খালেদা জিয়া জেলে আছেন। তিনি কোনও ‘মিরাট ষড়যন্ত্র’, ‘পিন্ডি ষড়যন্ত্র’ বা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’  মামলায় নয়, তিনি জেলে আছেন দুর্নীতি মামলায় তার সাজা হয়েছে বলে। তার দলের নেতারা, দলীয় বুদ্ধিজীবীরা বলেছেন, টাকা তো যথাস্থানে জমা দেওয়া হয়েছে। তাই তাকে সাজা দেওয়াটা প্রতিহিংসা। তারা মনে করেন, সরকার ইচ্ছা করলে খালেদা জিয়াকে প্রতীকী সাজা দিতে পারতো, যেখানে রাষ্ট্রের কত কোটি কোটি টাকা অনেকে মেরে দিচ্ছে।

কথাগুলোর মধ্যে আংশিক সত্যতা আছে। তবে এর মধ্য দিয়ে বিএনপিপন্থীরা দুটি জিনিস অস্বীকার করতে চান এবং আরেকটি ফালতু আবদার রাখতে চান। অস্বীকারের বিষয়টা হচ্ছে—এক. প্রধানমন্ত্রী অপরাধ করেছেন বলে সেটা অপরাধ হিসেবে দেখা ঠিক না। মানে এ ধরনের অপরাধে সাধারণ মানুষের সাজা হওয়াটা ঠিক আছে, কোনও প্রধানমন্ত্রীর না। দুই. খালেদা জিয়া টাকা ফেরত দিয়েছেন, তাই তিনি অপরাধী হতে পারেন না।

অথচ নৈতিকতা বিবেচনা করলে প্রধানমন্ত্রী বলেই তার সাজা হওয়া উচিত আগে। টাকাটা এতিমের। প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল থেকে যে টাকা বেআইনিভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে, তার পরিমাণ ১.২ মিলিয়ন ডলার। এই টাকা এসেছিল ১৯৯১ সালে, যা দিয়ে তখন ঢাকার গুলশান-বারিধারা বা চট্টগ্রামের খুলশীতে যে পরিমাণ জমি কেনা যেত তার আজকের বাজার মূল্য ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত। এতিমখানার নাম ব্যবহার করে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, অথচ সেই নামে আজ পর্যন্ত সারা দেশে কোনও এতিমখানার  অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

একটি সহজ কথা তারা বুঝতে যাচ্ছেন না, টাকাটা আগে থেকেই যথাস্থানে ছিল না কেন, মামলাটা তো সেই কারণেই হয়েছে। মামলাটা দিয়েছে এক/এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার। মামলা হওয়ার পরে টাকা জমা দেওয়ার কথা বলে অপরাধ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভবত আইনে নেই। না হয় বিচারক দণ্ড দিলেন কেন! টেম্পোরারি মিসঅ্যাপ্রপ্রিয়েশন বলে একটা কথা আছে।

ফালতু আবদারটার কথা পরে বলছি।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপি তাদের নেত্রীর মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করেছে। আবার দেশব্যাপী তাদের আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কিছু কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। এটা তাদের উত্তম রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি কোনও বিপ্লবী সংগঠন নয়। বিএনপি থেকে কোনও বিপ্লবী কর্মসূচির প্রত্যাশা করা কর্মীদের উচিত নয়। মহাসচিবের উপলব্ধি সঠিক এবং তা অকপটে প্রকাশ করে সত্য উপলব্ধি সহজ-সরলভাবে বলেছেন।

‘রাগ ইমন’র কান্নাটা পাওয়ার প্রত্যাশায়। আর ‘রাগ বাগেশ্রী’র কান্নাটা না পাওয়ার হতাশায়। রাজনীতিটা উচ্চাঙ্গসংগীতের রাগের মতো। ইমন রাগের গান ‘রাগ জৌনপুরী’তে চলে না। মির্জা ফখরুল ইসলামের কথায় বুঝলাম, তিনি রাজনীতিতে ‘রাগ’ বুঝেই কথা বলতে অভ্যস্ত হয়েছেন।

খালেদা জিয়া জেলে। সুতরাং তার দলের কর্মীরা তার মুক্তির জন্য আন্দোলন করবেই। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তার জেলের দুই বছর মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ। আমি আশ্চর্য হই তিনি অসুস্থতা নিয়ে দুই দুইবার প্রধানমন্ত্রিত্ব করেছেন, বিরোধী দলের নেত্রী হয়েছেন, আবার বিএনপির প্রধান হিসেবে সংগঠন পরিচালনা করেছেন। তার কষ্ট সহিষ্ণুতা আর ধৈর্যের প্রশংসা করতে হয়। তাকে দেখেছি তিনি নির্বাচনের সময় সারাদেশ সফরে কোনও সুস্থ দলীয় প্রধানের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন না। এখন এই বয়সে দীর্ঘ সময় কারাবাসে থাকা কষ্টকর ব্যাপার। জেলকোডের বাইরে তার পরিচর্যার জন্য তাকে তার মনোনীত একজন নারী কর্মী রাখার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। সেই নারী কর্মীও তার সঙ্গে দুই বছর জেলে রয়েছেন।

যাক, সর্বস্তরে জামিন চাওয়া হয়েছে। কোনও কোর্টে জামিন হয়নি। বিএনপি নেতারা বলেছেন, সরকার ইচ্ছা না করলে জামিন পাওয়া নাকি সম্ভব হবে না। ভারতের বিহার রাজ্যের দীর্ঘসময়ের মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের পশুখাদ্য মামলায় জেল হয়েছিল। তারও কোনও স্তরে জামিন হয়নি। লালু রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সভাপতি। গত লোকসভা নির্বাচনের আগেও চেষ্টা করেছিলেন জামিনের জন্য, কিন্তু কোর্ট দেননি। আমাদের দেশে কোর্ট আর মিলিটারির বিরুদ্ধে কখনও কেউ মুখ খুলে কথা বলত না। এখন আর তা মানে না। কোর্ট প্রভাবিত হয়েছে ইত্যাদি কথাবার্তা বিএনপির বড় বড় আইনজীবীও এখন বলে থাকেন। কনটেম্প্ট অফ কোর্টকে এখন কেউ আর তোয়াক্কা করে না।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় একুশে আগস্ট ২০০৪ আওয়ামী লীগের জনসমাবেশ গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ উপস্থিত সব নেতাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। গ্রেনেড যদি মঞ্চে পড়তো শেখ হাসিনাসহ সব নেতাই মারা যেতেন। কিন্তু গ্রেনেড  নিচে পড়ে আইভি রহমানসহ তাদের ২৪ জন নেতাকর্মী মারা গিয়েছিলেন। আবার এই হামলা মামলার চার্জশিট দেওয়ার সময় বিএনপি সরকার জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছিল। সুতরাং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জীবন নিয়ে যে খেলা একুশে আগস্ট বিএনপি খেলেছে, আবার বিচারকে জজ মিয়া খাতে প্রবাহিত করে যে প্রহসনের আয়োজন করেছিল, তার একটা প্রতিশোধ নিতে চাওয়া তো আওয়ামী লীগের পক্ষে কোনও অস্বাভাবিক কাজ নয়।

বিএনপি যেখানে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনাসহ অনেক বড় বড় নেতাকে জানে মারার ষড়যন্ত্র করেছিল, আওয়ামী লীগ জামিন বিলম্ব করার চেষ্টা করা তো স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ তো বিএনপির কাউকে জানে মারার চেষ্টা করছে না। কিন্তু তারা মুফতি হান্নানকে দিয়ে যে সর্বনাশা খেলা খেলেছিল তা তো সম্পূর্ণভাবে জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধ। বিএনপির প্রতিহিংসা যদি প্রতিপক্ষকে হত্যার উদ্যোগ পর্যন্ত গড়ায়, তবে আওয়ামী লীগের প্রতিহিংসা তো তার চেয়ে কম মাত্রায় রয়েছে।

বিএনপি নেত্রীর জেল হয়েছে। জেল দিয়েছেন কোর্ট এবং গত দুই বছর তিনি জেলে আছেন। জামিন কোর্ট দিচ্ছেন না, এটি অবশ্য বিএনপি বিশ্বাস করছে না। এমন পরিস্থিতির যখন উদ্ভব হয়েছে এবং খালেদা জিয়ার যদি বাইরে আসতে হয়, চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে হয়, বিএনপি তো সরকারের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে পারে। জেল যদি মওকুফ করতে হয় সেটা তো রাজনৈতিক বিষয়। সুতরাং বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর হতে হবে। বিএনপি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আবেদন না জানালে সরকার কী বিবেচনায় জেল মাফ করবে! এটা তো লোক দেখানো  আবদার।

সুতরাং আপোষহীন ভূমিকা রেখে কিছু হবে না। মুক্তি যদি কামনা করে, বিএনপিকে বেগম জিয়ার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। সরকার মনের সুখে কারও জেল মাফ করবে না। এই ব্যাপারে একটা বৈধ প্রক্রিয়া রয়েছে, তা অনুসরণ না করলে সরকার জেল মওকুফ করবে কিভাবে! আন্দোলন করে সরকার হটানো বিএনপির পক্ষে সম্ভব না। বিএনপি গত ১২ বছরও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কোনও পটভূমিকা তৈরি করতে পারেনি। বিএনপিকে পরামর্শ দেব, যদি বেগম জিয়াকে মুক্ত করতে চান তারা যেন সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথে হাঁটেন। অন্যথায় মনে হয় বেগম জিয়ার জেল খেটেই বের হতে হবে।   

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

আর/০৮:১৪/১৩ ফেব্রুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে