Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২৫ মে, ২০২০ , ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-১৫-২০২০

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কি অত্যাবশ্যকীয়?

ডা. জাহেদ উর রহমান


সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কি অত্যাবশ্যকীয়?

‘তীব্র বিরোধিতার মুখে সংসদে বিল পাস, বিএনপির ওয়াকআউট’- বুধবার সংসদে একটি বিল পাস নিয়ে দেশের প্রধান প্রধান প্রায় সব পত্রিকার শিরোনাম মোটামুটি এমনই।

বিলটি হল ‘স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল কর্পোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন-২০২০’। প্রস্তাবটি পাস করতে গিয়ে সরকার বিএনপি, এমনকি জাতীয় পার্টিরও তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। এ বিরোধিতায় আদৌ কি কোনো লাভ আছে জনগণের?

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আলোচ্য আইনটি নিয়ে দুটো কথা বলে নেয়া যাক। আইনটি আমি পড়েছি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। আলোচ্য বিলটি সংসদে আনার যুক্তি হিসেবে দেশে ব্যাপক আর্থসামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়নের কথা জোর গলায় উল্লেখ করে বলা হয়েছে- এসব প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান করতে ওইসব প্রতিষ্ঠানের তহবিল সরকারি কোষাগারে নিতে হবে।

জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় থাকা সরকারের ক্ষমতায় থাকার যৌক্তিকতা তৈরি করতে হয় না। জনগণের ম্যান্ডেটই সেই যুক্তি। কিন্তু কোনো সরকারের সেটি না থাকলে সেই সরকারকে কোনো একটি ন্যারেটিভ তৈরি করতে হয় ক্ষমতায় থাকার যৌক্তিকতা দেয়ার জন্য। বর্তমান সরকারের সেই ন্যারেটিভ হচ্ছে উন্নয়ন; যেটি নানা কালে নানা দেশে এ ধরনের সরকার কর্তৃক ব্যবহৃত হয়েছে। এ কারণে দেশে দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাহীনতা, মৌলিক মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, এমনকি নির্বাচন ব্যবস্থার অগ্রহণযোগ্যতা সব আলোচনাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে উন্নয়নের গগনবিদারী স্লোগান দিয়ে। দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি কত হল, দেশের মাথাপিছু আয় কত- এসব তথ্য এখন কম জানা মানুষের কানেও আসে। সরকারিভাবে দাবি করা হয়, দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৮.১৫। তাহলে প্রশ্ন, দেশের রাজস্ব আয়ের এ অবস্থা কেন? এ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ, অথচ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৫ শতাংশ। এর কারণ দুটো। রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের চরম দুর্নীতি, অদক্ষতা আছে। তার সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকা কিছুদিন আগে রিপোর্ট করে দেখিয়েছে- পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত সিমেন্ট, ইস্পাত, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, নিত্য ব্যবহার্য এবং ভোগ্যপণ্য খাতের ১৭টি নেতৃস্থানীয় কোম্পানির তথ্যে দেখা গেছে, এদের বিক্রির পরিমাণ কমছে।

গত কয়েক বছরের মধ্যে এদের প্রায় সবার এবারই প্রথম ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই প্রথম গত ১০ বছরের মধ্যে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কমে গেছে। ফলে এসব ক্ষেত্র থেকেই রাজস্ব আহরণ কমে যাচ্ছে। সরকার দেশের যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ম দাবি করে, সেটি মিথ্যা।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে ব্যাংক খাত থেকে সরকারকে অনেক বেশি ঋণ করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক থেকে মোট ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার কথা থাকলেও জানুয়ারির মাঝামাঝিতেই এ পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এখন এ প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা টাকার দিকে চোখ পড়েছে সরকারের। এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা জমেছে এদের। কিছু খাতে কিছু টাকা রাখলেও সরকারি কোষাগারে জমা পড়বে বিপুল পরিমাণ টাকা।

যেসব দেশে দুর্নীতি অত্যন্ত সহনীয় পর্যায়ে থাকে সেসব দেশেও সরকারের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো প্রকল্পকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ এ ‘ঋণ করে ঘি খাওয়ার’ মাশুল শেষ পর্যন্ত নাগরিকদেরই দিতে হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে কোনো প্রকল্পে ন্যায্য ব্যয়ের তুলনায় ৪-৫ গুণ বেশি ব্যয় করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় শুধু বিরাট অঙ্কের দুর্নীতির জন্য, সেই দেশে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা দেশের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিটিকেই ভেঙে ফেলবে। এ বিলটি আমাদের নতুন বিপদের মুখোমুখি করেছে।

এবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। গত বছর প্রকাশিত টিআইবির ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশের আইনসভার সদস্যরা বাজেট অধিবেশন ছাড়া আইন প্রণয়নের জন্য সময় ব্যয় করেছেন মাত্র ১২ শতাংশ। একটি বিল পাস করতে গড়ে সময় লেগেছে প্রায় ৩১ মিনিট। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে ষোলোতম লোকসভায় প্রতিটি বিল পাসের আলোচনায় গড়ে ১৪১ মিনিট ব্যয় হয়; যা আমাদের প্রায় পাঁচ গুণ।

সংসদ সদস্যদের হাতে টিআর-কাবিখার মতো প্রকল্প থাকে এবং উপজেলা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করার মাধ্যমে সেখানে সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রায় সব সংসদ সদস্যের মূল আগ্রহই থাকে এ বিষয়গুলোয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের এমপি হিসেবে মূল কাজ অর্থাৎ আইন প্রণয়ন-সংশোধন, রাষ্ট্রীয় নীতি পর্যালোচনা-প্রণয়ন-পরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা, এসব বিষয়ের প্রতি অনাগ্রহী করে তোলে। এসব ‘লোভে’ যেসব মানুষ এমপি নির্বাচিত হন, তাদের বেশিরভাগেরই এসব বিষয়ে কথা বলার বা কাজ করার যোগ্যতাই নেই।

কিন্তু আলোচনার খাতিরে ধরে নিলাম, সংসদ সদস্যদের এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হল এবং সত্যিকার অর্থেই সংসদের ভূমিকা রাখার মতো যোগ্য, রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত মানুষ সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে আসছেন। তাহলেও কি এ সংসদ আসলে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে পারত?

আলোচ্য বিলটি সংসদে আনার পর এটি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ হয়েছে। এমনকি প্রথা ভেঙে জাতীয় পার্টির একাধিক এমপি বেশ কঠোর সমালোচনা করেছেন। বিএনপির এমপিরাও এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিবাদে বিল পাসের সময় বিএনপি ওয়াকআউট করে, আর জাতীয় পার্টি ‘না’ ভোট দেয়। কিন্তু কী লাভ হল তাতে? সংসদের বিরোধী দল যদি আরও অনেক বড়ও হতো, প্রতিবাদ আরও অনেক তীব্র হতো, কিংবা হতো ঝগড়াঝাঁটি বা মারামারিও এবং সবাই যদি প্রতিবাদে ওয়াকআউট করত, তাহলেও কি সেটার কোনো অর্থ হতো? হ্যাঁ, পত্রিকার শিরোনাম আরও বড় হতো এবং তাতে যুক্ত হতো আরও বেশকিছু বিশেষণও। জনগণের কী হতো? দেশের অর্থনীতি কি রক্ষা পেত এ ভয়ংকর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে?

অতি তুচ্ছ কোনো বিলেও সংসদ সদস্যরা তাদের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। অনুচ্ছেদটি একটু দেখে নেয়া যাক-

‘৭০। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনও ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-

(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা

(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,

তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনও নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

টিআইবির রিপোর্টের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য হল- সংসদে আইনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের যেসব পরামর্শ নেয়া হয়েছে, সেগুলো শুধু বাক্যের গঠন এবং বিরাম চিহ্ন পরিবর্তন সংক্রান্ত।

দীর্ঘদিন থেকে এ আলোচনা আছে এবং আমি নিজেও বিশ্বাস করি, বিদ্যমান অবস্থায় ৭০ অনুচ্ছেদ রেখে সংসদকে কোনোভাবেই জনগণের কল্যাণের জন্য কাজে লাগানো যাবে না। সেই সংসদে কেউ যুক্তি-প্রজ্ঞা-জ্ঞান-তথ্য দিয়ে দুর্দান্ত বিশ্লেষণ করলে দুর্দান্ত পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তার খ্যাতি আসতে পারে, এর বেশি কিছু হবে না।

কোনো পরিবর্তন ছাড়া ৭০ অনুচ্ছেদ থাকা এ সংসদকে অকার্যকর করে ফেলেছে। সরকারি দল যা চাইবে তার বাইরে কিছু করার সাধ্য থাকবে না কারও। অনেকেই ৭০ অনুচ্ছেদ পুরোপুরি তুলে দেয়ার কথা বললেও এর পক্ষে নই আমি। অনাস্থা ভোটের ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া গেলে কী হতে পারে, সেটা আমরা এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতেও দেখেছি। তাই ‘হর্স ট্রেডিং’ বন্ধ করার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদ থাকা উচিত। তবে, তাতে বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ হারানোর ক্ষেত্রে শুধু অনাস্থা ভোট এবং সেই সঙ্গে ট্রেজারি বিল থাকতে পারে। এছাড়া, আর সব ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারাতে হবে না, এ বিধান থাকতে হবে। পাকিস্তানের সংবিধানে বিষয়টা এভাবেই আছে-

63.A.(b) votes or abstains from voting in the House contrary to any direction issued by the Parliamentary Party to which he belongs, in relation to-

(i) election of the Prime Minister or the Chief Minister; or

(ii) a vote of confidence or a vote of no-confidence; or

(iii) a Money Bill or a Constitution (Amendment) Bill;

এমনটি মনে করার কারণ নেই যে, একটা সংশোধনী আসা মানেই দলের এমপিরা খুব সহজেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে দেবেন। ধীরে ধীরে সেই চর্চাও শুরু হবে। এ পদক্ষেপ আমাদের রাষ্ট্রটির গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠার পথে একটা বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে। এ দেশে সরকারগুলো তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত রাখার স্বার্থে এমন মাইলফলক স্থাপন করতে চাইবে, সেই আশা নেই প্রায়, তবে জনগণের উচিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এ চাপ জারি রাখা।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট।

এন কে / ১৫ ফেব্রুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে