Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২০ , ২১ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-১৫-২০২০

দখলে-দূষণে ত্রাহি অবস্থা কর্ণফুলীর

দখলে-দূষণে ত্রাহি অবস্থা কর্ণফুলীর

চট্টগ্রাম, ১৬ ফেব্রুয়ারি -  কর্ণফুলী নদীর অন্যতম শাখা চাক্তাই খাল। এ খাল দিয়ে কালো কুচকুচে পানি সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। অভিন্ন দৃশ্য এ নদীর অন্যতম শাখা রাজাখালের। নগরের শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিকের প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার টন বর্জ্য পড়ছে বন্দরের প্রাণখ্যাত কর্ণফুলী নদীতে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নসহ নানা কারণে দূষিত এবং সংকোচন হচ্ছে কর্ণফুলী। ফলে অস্তিত্ব সংকট তৈরি হচ্ছে নদীটির। সঙ্গে জলজ জীব, নাগরিক স্বাস্থ্য, সামাজিক জনজীবন ও দেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। কর্ণফুলী নদী রক্ষায় প্রণীত ১০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায়ও এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়। ২৭৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৬৬৭ মিটার গড় প্রস্থের কর্ণফুলী নদীর এখন মাত্রাতিরিক্ত দখল ও দূষণে ত্রাহি অবস্থা।   

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত চাক্তাই খাল। এ খাল দিয়ে প্রবাহিত হওয়া পানিগুলো কালো রঙের। সঙ্গে আছে নগরের গৃহস্থালি এবং পয়োবর্জ্য মিশ্রিত কালো পানি। একই অবস্থা রাজাখালী খালেরও। নদীতে গিয়ে পড়ছে কালো রঙের তেলের মতো পানি। দুই খালের মুখ দিয়ে সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে পলিথিন, প্লাস্টিক পণ্য এবং নানা অপচনশীল দ্রব্য।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘কর্ণফুলী তীরের অবৈধ স্থাপনা নিয়ে আইনি জটিলতা থাকায় উচ্ছেদ শুরু করা যাচ্ছে না। আইনি প্রক্রিয়া এখন চলমান। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এ ছাড়া উচ্ছেদকৃত স্থান যাতে আবারও কেউ বেদখল করতে না পারে, এ জন্য আমরা সেখানে লাল কালি দিয়ে মার্কিং ও দাগ দিয়েছি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আবারও উচ্ছেদ পরিচালনা করা হবে।’

পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম মহানগরের সহকারী পরিচালক সংযুক্তা দাশগুপ্তা বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীকে দূষণমুক্ত রাখতে আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি। এ ছাড়া তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাড়পত্র নবায়নের  সময় টেস্ট রিপোর্ট দেখা হয়। প্রতিষ্ঠানভেদে বছরে দুই বা চারবার এ টেস্ট করতে হয়। আবার ইটিপির যথাযথ ব্যবহার করছে কি না সেটি নিশ্চিতে নিয়মিত মনিটরিং করি। অনিয়ম পাওয়া গেলেই ক্ষতিপূরণ আদায় করি।’

হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘নগরের ৬০ লাখ মানুষের বর্জ্যরে মধ্যে ৪০ শতাংশ সংগ্রহ করে সিটি করপোরেশন। বাকি ৬০ শতাংশ বর্জ্য কোনো না কোনোভাবে গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। এ ছাড়া ৩৫০টির বেশি শিল্প-কারখানার বর্জ্য পড়ছে এ নদীতে। অধিকাংশ শিল্প-কারখানায় ইটিপির ব্যবস্থা নেই। ফলে ধ্বংস হচ্ছে মাছ, হ্রাস পাচ্ছে জীববৈচিত্র্য।’

দূষণের যত কারণ : কর্ণফুলী নদী নিয়ে প্রণীত মহাপরিকল্পনায় দূষণের কিছু মৌলিক কারণ চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে আছে- চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা না থাকা, অপচনশীল বর্জ্য, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ, নিচু ভূমি ভরাট, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্প, কাপ্তাই লেকের নাব্যতা হ্রাস, কর্ণফুলী পেপার মিল, নৌযানে এসটিপির (স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) অপ্রতুলতা, ফিটনেসবিহীন নৌযান এবং নদী ও খাল-সংলগ্ন অস্থায়ী বাজার। জানা যায়, শহরে ৫০ হাজার স্যানেটারি এবং ২৪ হাজার ল্যাট্রিন আছে, যা সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে উন্মুক্ত। এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরে স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা না থাকায় বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবন, দোকানপাট, বাজার, শপিং মল, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হোটেল ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্যুয়ারেজ বর্জ্যরে শেষ গন্তব্যস্থল হয় কর্ণফুলী। নগরের ছোট-বড় ৩৬টি খাল ও ড্রেন হয়ে এসব বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে। অন্যদিকে নদীতে বিভিন্ন সময়ে ভারী লাইটার জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ে। পানিতে বিপুল পরিমাণে জ্বালানি তেল নির্গত হয়। নদীর উপরিভাগে ছড়িয়ে পড়া তেলের আস্তরণ জমে থাকায় পানিতে অক্সিজেন মিশতে বাধা প্রদান করে। ফলে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদী ব্যবহারকারী নৌযানগুলো প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য নিক্ষেপ করে নদীতে। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে ব্যবহৃত হয় ৪৪৩টি লাইটারেজ জাহাজ। পক্ষান্তরে প্রতিবছর কর্ণফুলী নদী দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে দুই হাজার বিদেশি জাহাজ। প্রতিমাসে গড়ে দেড় হাজার দেশীয় জাহাজ এ নদীতে চলাচল করে। এসব জাহাজও দূষণ করে কর্ণফুলীকে। সঙ্গে আছে দেশি-বিদেশি জাহাজ পরিষ্কার ও মেরামতের সময় পানিতে ফেলা জিঙ্ক, সিসা, ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতব পদার্থ। এ ছাড়া বন্দরে আনা ক্লিঙ্কার, জিপসাম, সোডা, অ্যাশ ইত্যাদি খালাসকালে বাতাসে ছড়িয়ে তা পানিতে পড়ে। আর চট্টগ্রাম ওয়াসা ১৯৬৩ সালে পানি সরবরাহ ও পয়ঃপ্রণালি কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো পয়ঃপ্রণালি কার্যক্রম চালাতে পারেনি। আছে কর্ণফুলীর দুই পাড় ও আশপাশে ছোট-বড় ৭০০ কলকারখানার বর্জ্য। এসব কারখানার প্রায় ৬২ ধরনের মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশছে। পেপার মিল আর রেয়ন মিল থেকে প্রতিবছর ৩ হাজার কেজি পারদ ঢালা হচ্ছে কর্ণফুলীতে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরের ৮৪টি তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও তারা অধিকাংশ সময়ই ইটিপি চালু রাখে না। শহরের ৮টি পয়েন্ট বা খাল দিয়ে কারখানাগুলোর বর্জ্য কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ে।

বিলুপ্ত হচ্ছে মাছ : পরিবেশ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দূষণের কারণে কর্ণফুলী নদীর ৩৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যায়। অতীতে কর্ণফুলীতে ৬৬ প্রজাতির মিঠাপানির, ৫৯ প্রজাতির মিশ্র পানির এবং ১৫ প্রজাতির সামুদ্রিক পরিযায়ী মাছ পাওয়া যেত। এখন মিঠাপানির ২০-২৫ প্রজাতির এবং মিশ্র পানির ১০ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত। বিলুপ্ত হওয়া মাছের মধ্যে আছে ফাইস্যা, কাঁচকি, রূপচাঁদা, কালিচাঁদা, পাঙ্গাশ, বাচা, ভেটকি, পাশা, লইট্টা, রিকশা, মধু, পাবদা, পোয়া, মহাশোল ইত্যাদি। কমতে শুরু করেছে কাতলা, রুই, মৃগেল মাছ। হুমকিতে আছে মাছের আরও ২০ প্রজাতি। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘অপরিশোধিত তরল ও কঠিন বর্জ্য নদীর পানিতে মেশার কারণে ‘ব্যাকটেরিয়া’ কর্তৃক জলজ প্রাণীর ডিকম্পোজিশন/ডাইজেশনে প্রচুর অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। এতে পনির ডিওর (ডিসলভড অক্সিজেন) মাত্রা হ্রাস পায়। ফলে জলজ প্রাণীর অক্সিজেন ঘাটতি দেখা দেয়।’ জানা যায়, কর্ণফুলীতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রাণ ধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রয়োজন প্রতি লিটারে ৪ থেকে ৬ মিলিগ্রাম। কিন্তু দূষণের শিকার এ নদীর পানিতে ডিও পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ১ থেকে ৪ মিলিগ্রাম। জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য এ মাত্রা খুবই বিপজ্জনক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। নদীর পানিতে জীব-রাসায়নিক  অক্সিজেন চাহিদার (বিওডি) আদর্শ মান ২ থেকে ৩ ধরা হলেও বর্তমানে তা রয়েছে প্রতি লিটারে ১০ থেকে ২৫ মিলিগ্রাম। পানির বিদ্যুৎ পরিবাহী (ইলেকট্রিক কন্ডাকটিভিটি) ক্ষমতার সহনীয় মাত্রা প্রতি সেন্টিমিটারে ৭০০ থেকে ২৮০০ মাইক্রো সিমেন্স। কিন্তু এখন রয়েছে প্রতি সেন্টিমিটারে গড়ে ৩৪০০ মাইক্রো সিমেন্স। নদীর রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদার (সিওডি) আদর্শ মান প্রতি লিটারে ২০০ মিলিগ্রাম। কিন্তু এখানে আছে এরও ওপরে।

ঠায় দাঁড়িয়ে অবৈধ স্থাপনা : আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর কর্ণফুলীর দুই তীরে সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করে। নগরের নেভাল একাডেমি-সংলগ্ন নদীর মোহনা থেকে মোহরা এলাকা পর্যন্ত অংশে ২০১৫ সালে জরিপের কাজ শেষ করা হয়। জরিপে নদীর দুই তীরে ২ হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে তারা। গত বছর ৪ ফেব্রুয়ারি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে ২৩০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, প্রায় ১০ একর ভূমি উদ্ধার ও আলোর মুখ দেখে পাঁচটি খাল। প্রথম ধাপে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয় নগরের সদরঘাট থেকে বারিক বিল্ডিং মোড় পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার অংশে। কিন্তু বছর পার হলেও দ্বিতীয় দফায় আর উচ্ছেদ অভিযান শুরুই হয়নি। উচ্ছেদের পর এখনো ১৯৫১টি অবৈধ স্থাপনা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। উচ্ছেদকৃত স্থানে ফের বেদখল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

এন এইচ, ১৬ ফেব্রুয়ারি

পরিবেশ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে