Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২০ , ২৭ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৫-২০২০

কেন লিখি, কী লিখি

ড. এ কে আব্দুল মোমেন


কেন লিখি, কী লিখি

লেখালেখি মানুষের সহজাত ধর্ম। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে এমনভাবেই তৈরি করে দিয়েছেন যে, তাদের প্রকাশের একটা ভঙ্গি থাকে। কেউ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভালো প্রকাশ করতে পারে। কেউ কেউ নাচ, সাজগোজ, আর্ট, চিত্রাঙ্কন- একেকজনের প্রকাশভঙ্গি। কেউ লিখে প্রকাশ করে। লেখালেখি মানুষের প্রকাশের সবচেয়ে বড় ধর্ম। সবাই লিখতে পারে না। এটি একটি অনন্য গুণ, যা চর্চা করতে হয়।

কারও কারও ক্ষেত্রে লেখালেখি এমনিতে আসে। কারও কারও ক্ষেত্রে প্রচুর পড়তে হয়। আমাদের শিক্ষকরা বলেছিলেন, এক লাইন লেখার আগে অন্তত ২০ লাইন পড়ে নাও। বিখ্যাত সাংবাদিক লেরি কিংকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, আপনার লেখালেখি, প্রকাশনী ও টিভি টক শোর প্রশ্ন এত শক্তিশালী কীভাবে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'লেখা বা বলার আগে পড়তে হবে। তাহলে আপনার লেখনী শক্তিশালী হবে।' এই যে প্রতিদিন আমরা নানা কাজে হাজারো মানুষের সঙ্গে মিশি, তা লেখার জন্য বড় সহায়ক উপাদান। তবে নিরন্তর সাধনা হলো ভালো লেখার পূর্বশর্ত। লেখক হয়ে ওঠার জন্যও প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। লেগে থাকতে হয় নিরন্তর। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, 'আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে,/ আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো'

লিখতে হলে অনেক তথ্য-উপাত্ত দরকার। এগুলো খুঁজে খুঁজে, পড়াশোনা করে লেখায় তুলে ধরা হয়। এর ফলে জ্ঞানের ধারা বাড়ে। ভালো লেখার জন্য জ্ঞানের অন্বেষণ তৈরি করে মানুষ। এর ফলে জানার সমৃদ্ধি ও পরিধি বাড়ে। তথ্য না জানলে ভালো লেখা তৈরি হয় না।

অনেক সময় মনে হয়, মানুষ যা জানে, তা অন্যদের জানানো উচিত। উদাহরণ, এই বাংলার ইতিহাসে শত শত জমিদার ছিল। এসব জমিদারের তালিকা নেই, আমরা তাদের মনে রাখি না। কিন্তু তিনজন জমিদার ব্যতিক্রম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হাছন রাজা ও মীর মশাররফ হোসেন। কারণ, অন্য জমিদাররা কেবল রুটিনমাফিক দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু এই জমিদাররা তাদের দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যেও লেখালেখি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিজীবনে বৈচিত্র্যের অভাব নেই। বাংলা সাহিত্যকে দুই হাত ভরে দিয়ে গেছেন তিনি। কবিতা-গান, গদ্য-নাটক সবকিছুতেই ছিল তার সমান পারদর্শিতা। সাহিত্যে নোবেলজয়ী প্রথম বাঙালিও রবীন্দ্রনাথ। স্বল্পকালের জন্য হলেও ইংরেজ সরকারের 'নাইট' উপাধিধারী। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান নেই। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, চিঠি সাহিত্য, নাটক, সংগীত, চিত্রকলা- কোন শাখায় রবীন্দ্রনাথ দাপট দেখাননি! সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া একজন কবি সংগীতেও সমান দক্ষ ও জনপ্রিয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই বিশ্বসাহিত্যের একমাত্র ব্যক্তি, যার রচিত সংগীত পাশাপাশি দুটি দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতে সম্মানের সঙ্গে গাওয়া হয়। এই বিরল সম্মান সারা পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর কারও নেই।

মরমি কবি জমিদার হাছন রাজা কত গান রচনা করেছেন, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। হাছন উদাস গ্রন্থে তার ২০৬টি গান সংকলিত হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু গান 'হাসন রাজার তিনপুরুষ', 'আল ইসলাহ্‌'সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ১৯২২ সালে মারা যাওয়ার পর হাছন রাজার গান আজও স্মরণ করা হয়। লোকমুখে আজও রটে যায়- 'লোকে বলে বলে রে, ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার, কী ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝার, ভালা করি ঘর বানাইয়া, কয় দিন থাকমু আর, আয়না দিয়া চাইয়া দেখি, পাকনা চুল আমার।' জমিদারি ছাড়ার পর বৈরাগী ভাব নিয়ে হাছন রাজা রচনা করেছেন মরমি অজস্র গান ও কবিতা। মানুষের মনে দুঃখ থাকলে লেখার মধ্যে তেজ তৈরি হয়। দুঃখের কাহিনি থাকলে তার প্রকাশটা শক্তিশালী হয়। হাছন রাজার রচনাবলি তারই প্রমাণ।

ঊনবিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম সাহিত্যিকরূপে খ্যাত 'বিষাদ সিন্ধু'র অমর লেখক মীর মশাররফ হোসেন ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর কুষ্টিয়া শহর থেকে তিন মাইল পূর্বে গড়াই ব্রিজের নিকটস্থ লাহিনীপাড়া গ্রামে ভূসম্পত্তির অধিকারী এক ধনাঢ্য জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক সূত্রেই তিনি জমিদারি লাভ করেন। মীর মশাররফ হোসেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তার প্রথম জীবনীকার ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে বাংলা সাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মীর মশাররফ হোসেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলিত হলেও অসঙ্গত হয় না। গদ্য, পদ্য, নাটক, উপন্যাসে মীর মশাররফ হোসেন প্রায় ৩৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। তার গদ্যরীতি ছিল বিশুদ্ধ বাংলা, যা তদানীন্তনকালে অনেক বিখ্যাত হিন্দু লেখকও লিখতে পারেননি। তিনি 'জমীদার দর্পণ' নাটক লিখে তদানীন্তনকালে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের মর্যাদা লাভ করেন।

দুনিয়াতে কত লোকের জন্ম হয়েছে; কত শাসক, রাজা চলে গেছেন! দুনিয়া কাঁপিয়েছেন অনেক বিশ্বনেতা; কিন্তু তারা দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। সৃষ্টিশীল কর্ম দ্বারা আজও অনেকে বেঁচে রয়েছেন মানুষের মনমন্দিরে। বেঁচে থাকবেন আরও সহস্র বছর ধরে। ভাবনা অনেকের মধ্যেই থাকে। তার প্রকাশ না ঘটলে তা অনর্থক। লেখালেখির মাধ্যমে মানুষের মনে বেঁচে থাকার চিরঞ্জীব বাসনা তৈরি করে লেখকের মনে। যাদের কাজ, চিন্তা ও মূল্যবোধ মানুষের জীবনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে যায়, তারা শারীরিকভাবে গত হলেও মানুষের জীবন ও চেতনায় থেকে যান।

সিলেট নগরীর ধোপাদীঘির পাড়ে 'হাফিজ কমপ্লেক্স' আমাদের বাড়িতে বই-পুস্তক ছিল প্রচুর। বাড়ির নামকরণ 'হাফিজ কমপ্লেক্স' অবশ্য করা হয় অনেক পরে। সেই বাড়ির তাকে ছিল থরে থরে সাজানো রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ধর্মীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক; বিশেষ করে আইনের নানা পর্যায়ের বই-পুস্তক। প্রত্যেক রুমই ভর্তি ছিল বই-পুস্তকের সম্ভারে। আমার বাবা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ছিলেন আইনজীবী। স্বাভাবিক কারণেই তাকে অনেক পড়তে হতো। তবে পেশাগত দরকারের বাইরেও তিনি প্রচুর পড়াশোনা করতেন আর লিখতেন। বাবার পাশাপাশি মা সৈয়দ সাহার বানু চৌধুরীও ছিলেন সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ও নিবেদিত। এর ফলে তারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতা করতেন। তা ছাড়া তারা ছিলেন স্থানীয় লাইব্রেরির সাধক। তার ফলে বই পড়ার প্রতি সহজাত আগ্রহ জেগে ওঠে।

সে সময় দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। সেগুলো বাসায় নিয়মিত আসত। বাবা কলকাতা, ঢাকা ও পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বহু বছর। পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ও আকর্ষণ ছিল ব্যাপক। মা-ও পড়াশোনা করতেন নিয়মিত। ফলে বাসায় পড়াশোনার একটা পরিবেশ গড়ে ওঠে। আর বাবা ঢাকা, কলকাতা বা চট্টগ্রাম, যেখানেই যেতেন, সেখান থেকে বহু বই-পুস্তক, ম্যাগাজিন আর পত্রিকা কিনে নিয়ে আসতেন। আমাদের বাড়িতে নিয়মিত 'রিডারস ডাইজেস্ট' পত্রিকটি রাখা হতো। বাবা খুঁটে খুঁটে পত্রিকা পড়তেন। যে নিবন্ধ পছন্দ হতো, আমাদেরও পড়তে দিতেন। পছন্দ হওয়া আর্টিকেল বা ফিচারটা বাংলায় অনুবাদ করতে বলতেন, যেন অন্যরাও পড়তে পারে। কলেজে পড়ার সময় কয়েক বন্ধু মিলে 'উষশী' পত্রিকা সম্পাদনা করলাম। সেই কিশোরকালে পড়া আর লেখার প্রতি যে ঝোঁক তৈরি হয়, তা আজও আছে সমানতালে।

পড়ালেখা বা কর্মজীবনে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে; যেমন বাংলাদেশের ৬৪ জেলার অলিগলি, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানা দেশের জানা-অজানা, চেনা-অচেনা অজস্র জায়গায়। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে পুলকিত করেছে, আরও ঘুরে বেড়ানোয় উৎসাহ দিয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নিজেকে বারবার ছাড়িয়ে যাওয়ার অনিঃশেষ একটা তাগাদা কাজ করেছে মনের ভেতর সবসময়। নানা সময়ে আরোহিত জ্ঞান, সেই আলোকে বর্তমান বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আর অলীক কল্পনার ছোটাছুটিতে মস্তিস্ক ছিল নিরন্তর ব্যস্ত। মাঝেমধ্যে কানে বাজত বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলার সেই প্রশ্ন- 'পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?' তবু লেখালেখির অদ্ভুত নেশা আমার মধ্যে সময় সময় তীব্রভাবে উঁকিঝুঁকি দেয়। যখনই সুযোগ পেয়েছি, হাতে থাকা ছোট্ট নোটবুক, কাগজের ছোট পাতা, কখনও-বা টিস্যুর শুভ্র আস্তরণেও টুকে রেখেছি গুরুত্বপূর্ণ, মনে দাগ কেটে যাওয়া অংশটুকু। প্রবাসে থাকাকালীন সেসব দেশের ম্যাগাজিন, অনলাইন পোর্টাল, দৈনিক পত্রিকা বা গবেষণা জার্নালে ছাপা হয়েছে আমার নানা সময়ের বিক্ষিপ্ত ভাবনা। এ পর্যন্ত তিনশ'র কাছাকাছি গবেষণা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে। হয় না হয় না করেও সমসাময়িক প্রবন্ধ নিয়ে বইও বেরোল কয়েকটা। আর হাতে লেখা কাগজের স্তূপও জমা হয়ে আছে। সেগুলো একটু ঝালাই করলে নতুন আরও অনেক প্রবন্ধ, সংকলন বা বইয়ের প্রকাশ সম্ভব। প্রতিদিনের যে ব্যস্ততা, ভাবি- হায়, সেগুলো আর কবে সম্পাদনা করব!

আগে প্রতিদিনের কোনো একটা সময় বের করে ফেলতাম কাজের ফাঁকে। বর্তমান ব্যস্ততা আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, চাইলেও মনমতো পর্যাপ্ত সময় নিয়ে পড়তে পারি না। লিখতে পারি না অনেক কিছু। ব্যক্তিগত লাইব্রেরির দিকে তাকালে শুধু আক্ষেপ হয়, হায়, কত পড়া বাকি এখনও! 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

এন কে / ২৫ ফেব্রুয়ারি

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে