Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২০ , ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৭-২০২০

বিশ্বমন্দা এবং করোনাভাইরাস সংকট আমাদের অর্থনীতিতে তার প্রভাব

আতিউর রহমান


বিশ্বমন্দা এবং করোনাভাইরাস সংকট আমাদের অর্থনীতিতে তার প্রভাব

বিশ্বজুড়েই চলছে বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা। এর মধ্যেই যোগ হয়েছে চীনের হুবেই প্রদেশে শুরু হওয়া করোনাভাইরাস সংকট। অনেক দিন ধরেই প্রধান প্রধান অর্থনীতির গতি মন্থর। হালে এই মন্থরতা তীব্রতর হয়েছে। এ বছরের শুরুতেই আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা ওয়াশিংটনে পিটার্সন ইনস্টিটিউটে এক বক্তৃতায় বলেছেন যে বৈষম্য ও আর্থিক খাতের অস্থিতিশীলতার হাত ধরে আরেকটি বিশ্বমন্দার ঝুঁকি আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা করেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাণিজ্য সংরক্ষণের কারণে আগামী ১০ বছর সামাজিক অস্থিরতা এবং আর্থিক বাজারে অস্থিতিশীলতার ব্যাপক ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক অর্থনীতির টানাপড়েনের বাইরে নয়। বিশেষ করে চীন আমাদের বহির্বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় অংশীদার। বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিময়তাও তাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটেই গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ নৌরিয়েল রৌবিনিও ‘প্রোজেক্ট সিন্ডিকেট’-এ প্রকাশিত নিবন্ধে আরেকটি বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা আসন্ন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর পেছনে চীনের করোনাভাইরাস ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী কৌশলগত ও বাণিজ্যিক উগ্রবাদী নীতিমালাকেই তিনি বেশি করে দায়ী করেছেন। ‘দ্য হোয়াইট সোয়াইনস অব ২০২০’ শিরোনামের ওই নিবন্ধে তিনি আরো লিখেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর্থ-সামাজিক এবং ভূ-রাজনৈতিক অনেক সংকটে নিমজ্জিত। যুক্তরাষ্ট্রে এটি নির্বাচনী বছর। সে কারণেও তার বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। চীন, রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে প্রতিপক্ষ করে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে নানামুখী কৌশলগত হস্তক্ষেপ শুরু করেছে। যদি সাইবার-যুদ্ধও এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে সারা বিশ্বের অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে যাবে। তাই এবারের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ২০০৮-এর বিশ্বমন্দার চেয়ে ঢের বেশি বিস্তৃত ও বেদনাদায়ক হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ চার দেশেই সরকার বদলাতে চান। তা না পারলে তাদের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দিতে আগ্রহী। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোও বিশ্বব্যাপী মার্কিন ক্ষমতা বলয়ের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিতে আগ্রহী।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের গতি খানিকটা কমেছে। কিন্তু রৌবিনির মতে, এটা খুবই সাময়িক। প্রযুক্তি, তথ্য, বিনিয়োগ এবং আর্থিক খাতে ‘শীতল যুদ্ধ’ এখনো চলমান। কোরোনাভাইরাস সংকটের কারণে চীনের সঙ্গে মার্কিন ও বিশ্বের অন্যান্য উদ্যোক্তার সরবরাহ চেইনে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, তাকে যুক্তি হিসেবে দেখিয়ে রক্ষণবাদী মার্কিনরা চীনের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য চাপ আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। করোনাভাইরাস সংকটের ফলে চীনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় অবধারিত। সেই বিপর্যয় সারা বিশ্বের সাপ্লাই চেইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কম দামে মেশিনপত্র ও কাঁচামালের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশের এই বিপর্যয় বিশ্বের ওষুধ, বস্ত্র ও ইলেকট্রনিক শিল্পের প্রবৃদ্ধিকে আসলেই থমকে দিতে পারে।

অথচ সারা বিশ্বের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আসন্ন এ বিপর্যয়কে সেভাবে গণনায় নিচ্ছে বলে মনে হয় না। এই বিপর্যয় মোকাবেলার জন্য আপৎকালীন প্রস্তুতির খবরও তেমনটা পাচ্ছি না। চীনের সংকট যদি আরো প্রলম্বিত হয়, তাহলে অধ্যাপক রৌবিনির আশঙ্কা—চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আর্থিক ‘পারমাণবিক হস্তক্ষেপ’ তথা সাইবার আক্রমণে নেমে পড়তে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে রাখা চীনের এবং রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তারা তুলে নিতে চেষ্টা করতে পারে। শুরুতে অন্য কোনো মুদ্রায় রূপান্তরিত করে শেষ পর্যন্ত চীনের নিজস্ব মুদ্রা রেনমিনবিতে বদলে দেবে। তা ছাড়া চীন আরো বেশি করে সোনা কিনে তার রিজার্ভ বহুমুখী করার উদ্যোগকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারে। গেল বছর চীন ও রাশিয়া প্রচুর সোনা কিনেছে। ফলে ২০১৯ সালে সোনার দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এভাবে বেশি বেশি সোনা কিনে রিজার্ভকে নিজেদের আওতায় আনার এই প্রচেষ্টা চীন নিজের স্বার্থে করতেই পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে সে দেশে রাখা চীনের কেনা ট্রেজারি বন্ড বিক্রির ওপর বিধি-নিষেধ জারি করতে পারে। এর ফলে ওই বন্ডের দাম পড়তে শুরু করবে। তখন মার্কিন আর্থিক বাজারে মন্দা আরো ঘনীভূত হবে। যুক্তরাষ্ট্রে তখন আয়-রোজগার দ্রুত কমে যাবে। পুরো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করবে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, বেকায়দায় পড়লে চীন ও অন্যান্য বৈরী রাষ্ট্র তাদের ‘পোষা’ হ্যাকারদের মাধ্যমে আর্থিক খাতে সাইবার আক্রমণ করবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও অনুরূপ সাইবার আর্থিক যুদ্ধে নেমে পড়তে পারে। এভাবেই বিশ্বজুড়ে আর্থিক মন্দাকে আরো ত্বরান্বিত করার সব আয়োজন যুক্তরাষ্ট্র ও তার বৈরী রাষ্ট্রগুলো সম্পন্ন করে রেখেছে। মাঝখানে মার খাবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো।

এর ওপর যোগ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। সমুদ্রের তলদেশে ভূকম্পন বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকায় বরফ দ্রুত গলছে। জলবায়ুর মতিগতি আসলেই বোঝা ভার! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অচিরেই সমুদ্রের পানিতে এসিডের মাত্রা দ্রুত বাড়বে। ফলে মাছের উত্পাদন ব্যাহত হবে। কোটি কোটি মানুষের মাছ ধরার কর্মকাণ্ড থেকে আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

এমন আশঙ্কাজনক প্রেক্ষাপটেই শুরু হয়েছে করোনাভাইরাস সংকট। রেটিং এজেন্সি ‘ডান অ্যান্ড ব্র্যাডস্ট্রিট’ সম্প্রতি এ সংকটের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে শুরু হলেও এর মধ্যে আরো ১৮টি প্রদেশে এ সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে চীন সরকার। এর ফলে চীন এবং সারা বিশ্বের শিল্প-বাণিজ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। ৫১ হাজার কম্পানির অবস্থান এই বিপর্যস্ত অঞ্চলে। এরা সরাসরি অথবা প্রথম পর্যায়ের সরবরাহকারী কম্পানি, যাদের সঙ্গে বিশ্ববাণিজ্যের প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। সার্ভিস, ম্যানুফ্যাকচারিং, রিটেল ও আর্থিক খাতের মতো পাঁচটি খাতের ৮০ শতাংশ ব্যবসা এ অঞ্চলেই হয়ে থাকে। যদিও এখনই বলা মুশকিল, এ সংকট কতটা প্রলম্বিত হবে, তবে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে স্থানীয় ও বিশ্ব-অর্থনীতিতে যে বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সে কথা আঁচ-অনুমান করা যায়। এ মুহূর্তে দুই ধরনের পূর্বাভাস দেওয়া যায়। এক. অচিরেই হয়তো এ রোগের টিকা তৈরি হবে। তখন চীনে ও সারা বিশ্বে এ রোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো সম্ভব। তবে সে জন্য কমপক্ষে প্রায় ছয় মাস লেগে যেতে পারে। দুই. ছয় মাসে কোনো টিকা হয়তো আবিষ্কৃত হবে না। তখন এটা বিশ্ববিপর্যয়ে রূপ নেবে।

এরই মধ্যে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের ইউএই, লেবানন ও ইসরায়েলে এ রোগ ধরা পড়েছে। ফ্রান্স ও ইতালিতে এ রোগের খোঁজ পাওয়ায় ইউরোপও দুশ্চিন্তায় পড়েছে। এরই মধ্যে অনেক কম্পানি চোখে সরষে ফুল দেখতে শুরু করেছে। ১৪০ কোটি মানুষের দেশ চীন শুধু ‘বিশ্বের কারখানা’ই নয়, দ্রুত বেড়ে উঠা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ আয়ের ভোক্তারও দেশ। মার্কিন কম্পানি ইনটেল ২০১৯ সালে একমাত্র চীনেই বিক্রি করেছে দুই হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্য। এ থেকে তার মোট আয়ের ২৮ শতাংশ এসেছিল। সেলফোন চিপ বিক্রেতা কম্পানি কোয়ালকম গত বছর চীনে বিক্রি করেছিল ১২০০ কোটি ডলারের পণ্য, যা ছিল তার মোট আয়ের ৪৭ শতাংশ। বিশ্ব-অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির এক-তৃতীয়াংশই আসে চীন থেকে। সেই চীন যদি আরো অনেক দিন স্থবির থাকে, তাহলে বিশ্বমন্দার আশঙ্কা তীব্র হতেই পারে। ব্রাজিলের সঙ্গে চীনের ব্যবসা-বাণিজ্যের সংযোগ খুবই গভীর। দেশটিতে এরই মধ্যে মন্দার বাতাস বইতে শুরু করেছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের ব্যবসা-বাণিজ্য এরই মধ্যে ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ, তুরস্ক, মেক্সিকোর তৈরি পোশাকশিল্প চীনের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। তাই এ অনিশ্চয়তা সহসা না কাটলে এসব দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দার মুখে পড়তে বাধ্য। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা যে সাময়িক সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ নিয়ে চীন থেকে আনা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে ব্যবসায়ীরা। এর প্রভাব দেশগুলোর মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নিঃসন্দেহে সাময়িকভাবে হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশিল্প ছাড়াও ইলেকট্রনিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি নানা উদ্যোগের ওপর পড়ছে। আর পড়ছে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের ওপর। চীনের কারখানাগুলো খুলতে শুরু করলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। আমরা প্রচুর সুতা, কাপড়, মেশিনপত্র, রাসায়নিক পণ্য আমদানি করি চীন থেকে। আমাদের মোট আমদানির ২৬ শতাংশই হয় চীন থেকে। সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়লে আমাদের প্রধান শিল্প ছাড়াও অন্যান্য শিল্প উত্পাদনও ব্যাহত হবে। পোশাকশিল্পের অন্তত ৪০ ধরনের কাঁচামাল আসে চীন থেকে। এসবের দাম কম বলে বিকল্প কোনো উৎসর কথা ভাবেননি আমাদের উদ্যোক্তারা। আর এত দ্রুত নতুন সরবরাহ চেইন স্থাপন করাও সহজ নয়। আমাদের কারখানাগুলোতে কিছু কাঁচামাল জরুরি ভাণ্ডারে রাখা হয়। কিন্তু বড়জোর এক মাস চলতে পারে তা দিয়ে। দেশের ভেতর থেকেও হয়তো বেশি দামে কিছু কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু প্রায় ১০ শতাংশের মতো কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতেই হবে। অ্যাকসেসরিজ শিল্পের কাঁচামাল চীন থেকেই আনতে হয়। তা ছাড়া কোনো পণ্যের পুরোটাই আসে চীন থেকে। যেমন চশমা বাণিজ্য। এর ৯৫ শতাংশ সরবরাহ আসে চীন থেকে। ব্যাটারিশিল্প আর বড়জোর এক মাসের মতো চলতে পারবে। দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ান থেকে এত সস্তায় এসব শিল্পের কাঁচামাল আনা সম্ভব হবে না। সে জন্য অপেক্ষা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই। ভয় নিত্যপণ্য নিয়ে। আদা, রসুন, পেঁয়াজের মতো পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে আসন্ন রোজার সময় ভোক্তাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখাই মুশকিল হবে। তাই আগের ভাগেই এ ধরনের পণ্য সরবরাহের বিকল্প উপায় খুঁজে নেওয়ার সময় কিন্তু বয়ে যাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাণিজ্য মন্ত্রণায়কে ভোগ্যপণ্য সরবরাহের ধারা সচল ও পর্যাপ্ত রাখার জন্য আগাম বার্তা পাঠিয়েছে। এফবিসিসিআই যথার্থই সংশ্লিষ্ট মহলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে বন্দরে যেন চীন থেকে আসা পণ্যের খালাসে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা সরবরাহ সংকটকে বরং আরো জটিল করবে। ব্যাংকগুলোকেও সতর্ক করা হয়েছে যে চীনের সঙ্গে খোলা এলসির বিপরীতে নেওয়া ঋণ যেন কাগজপত্র যথার্থ থাকলে বিচক্ষণতার সঙ্গে আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনিচ্ছাকৃত কারণে পণ্য এসে পৌঁছুতে বিলম্ব হলে এর জন্য বাড়তি মাসুল, সুদের ওপর জরিমানা না করার জন্য এফবিসিসিআই অনুরোধ করেছে। দুর্যোগ অবস্থায় নিরন্তর সরবরাহ চেইন চালু রাখার স্বার্থেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নমনীয় নীতি গ্রহণ করতে পারে। অতীতে মানুষের তৈরি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এমন বহু নমনীয়তার নীতি দেখিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে বাংলাদেশ এই সংকটকালেও আন্তর্জাতিক তেলের দাম কমে যাওয়ার সুফল খানিকটা পাচ্ছে। বিপিসির লাভ বাড়ছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম কমায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়তে পারে। ওই সব দেশে আবার প্রচুর বাঙালি কাজ করে। তাদের আয়-রোজগারে টান পড়লে রেমিট্যান্সের বিদ্যমান চাঙ্গা প্রবাহেও টান পড়বে।

এসব দুর্ভাবনা মাথায় রেখেই আমাদের নীতিনির্ধারকদের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি সংকট মোকাবেলায় পরিকল্পনার ছক কষতে হবে। আমি জানি না এমন পরিস্থিতিতে কোনো টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে কি না। আমার মনে আছে, ২০০৯ সালে বিশ্বমন্দার সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় অংশীজনদের সঙ্গে বসে সাবেক অর্থমন্ত্রী জনাব সাইদুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি একক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল। জনাব সাইদুজ্জামান বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি বেশ কিছু নীতিগত পরামর্শ দিয়েছিলেন। রপ্তানির নতুন গন্তব্য ও পণ্যের জন্য বাড়তি নগদ প্রণোদনার বিষয়টি তাঁর পরামর্শেই অর্থ মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সেসব বাস্তবায়ন করেছে। পাশাপাশি বিশ্বের আর্থিক মন্দা মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কৌশল গ্রহণ করে। ইডিএফের পরিমাণ ও পরিসর বৃদ্ধি করে। বিদেশ থেকে কম সুদে বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যক্তি খাতের ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। সামাজিক দায়বদ্ধ কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, অর্থ লেনদেন পদ্ধতির আধুনিকায়ন করে ডিজিটাল অর্থায়নের নয়া সুযোগ, কৃষি ও এসএমই ঋণের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের পুনরর্থায়ন কর্মসূচি চালু করে। সেই যাত্রায় আমরা বিশ্ব আর্থিক মন্দার চাপ ও তাপ ভালোভাবেই মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও করোনাভাইরাস সংকট মোকাবেলার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক এবারও উদ্ভাবনীমূলক ও নমনীয় নীতির উদ্যোগ নিতে পারে। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম হিসেবে কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে—১. একটি কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআই ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে বসে আমদানি করা পণ্য ও কাঁচামাল সরবরাহ চেইনে কোথায় কতটা ঝুঁকি দেখা দিতে পারে, তা নিরন্তর মনিটর করতে পারে। প্রয়োজনে এ কমিটি এখনই উপযুক্ত গবেষক ও বিশ্লেষকদের তাদের সঙ্গে নিতে পারে। ২. কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুদ, পাইপলাইন এবং সক্ষমতা বিচার-বিশ্লেষণ করে একটি ‘অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদন এ কমিটি তৈরি করতে পারে। ৩. প্রতিটি কম্পানিকে নিজের সরবরাহ চেইন মনিটর করতে উৎসাহী করতে হবে। সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ পেতে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তার ‘অ্যাসেসমেন্ট’ তাকেই করতে দেওয়া ভালো। ৪. চীনের বিপর্যস্ত অঞ্চলের বাইরে থেকে সরবরাহ পেতে হলে যা করতে হয় তাই করতে প্রত্যেক কম্পানিকে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে তাদের ভিন্ন কোনো দেশে সরবরাহ চেইনের খোঁজ করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ৫. সীমিত সময়ের জন্য হলেও সাপ্লাই চেইনের সচলতা অক্ষুণ্ন রাখতে এফবিসিসিআই কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, এনবিআর, বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে যে নীতি-নমনীয়তা ও সহযোগিতা চেয়েছে, সেগুলো নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। ৬. মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে এমন দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সরবরাহ চেইনগুলোর ব্যাপারে আলাদা আপৎকালীন নীতি ও পরিকল্পনা করতে হবে। ভৌগোলিকভাবে বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত সরবরাহ উৎসগুলো চিহ্নিত করে দুর্যোগকালে ভিন্ন ভিন্ন সরবরাহ চেইন সচল করার পরিকল্পনা থাকতে হবে। ৭. সরবরাহ চেইনগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং আশপাশের পরিবেশ বাস্তবতার পরিবর্তন মাঝেমধ্যেই মূল্যায়ন করে সর্বশেষ ঝুঁকির মাত্রা ও সেসব ঝুঁকি উপশমের উপায়গুলো চিহ্নিত করতে হবে।

সব শেষে বলব, কাগজে-কলমে এসব নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা প্রয়োগ হচ্ছে তা সরকার, রেগুলেটর, অংশীজনদের সংগঠন এবং গণমাধ্যম যেন নিয়মিত ‘ট্র্যাক’ করতে পারে তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ধরনের মনিটরিং খুবই সম্ভব। বাংলাদেশ যেমন প্রতিটি সংকট থেকে সাফল্যের সঙ্গে বিজয়ীর বেশে বের হয়ে আসে, এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না বলে আশা আমরা করতেই পারি।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

dratiur@gmail.com

এন কে / ২৮ ফেব্রুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে