Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ৩১ মে, ২০২০ , ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-০৮-২০২০

কৃষিকাজ করে এক মেয়েকে শিক্ষক আরেক মেয়েকে ব্যাংকার বানালেন মা

সফিকুল আলম


কৃষিকাজ করে এক মেয়েকে শিক্ষক আরেক মেয়েকে ব্যাংকার বানালেন মা

পঞ্চগড়, ০৮ মার্চ - জীবন মানেই যুদ্ধ। জন্মের পর অনেকের ভাগ্যে সুখ থাকলেও আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষ জীবনযুদ্ধ চলিয়ে যান সুখের আশায়। এদের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য নারী। যারা মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে সংগ্রাম করছেন অবিরাম। মহীয়সী এসব নারী নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, ধরেছেন সংসারের হাল। সমাজে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ দূর করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা। এসব নারীর জীবনযুদ্ধ অনুকরণীয়। এদের একজন পঞ্চগড়ের রশিদা খাতুন।

৪৬ বছরের সংগ্রামী নারী রশিদা খাতুনের বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ঝলই শালশিরি ইউনিয়নের কামাত মানিকচাঁদ গ্রামে। বিয়ের ১৫ বছরের মাথায় হঠাৎ স্বামীর মৃত্যুতে এলোমেলো হয়ে যায় তার সংসার। এলোমেলো সংসারে চার মেয়েকে আঁকড়ে ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন রশিদা। কৃষক হয়ে সংসারের হাল ধরেন তিনি। কৃষিকাজ করে চার মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করেছেন। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে লেখাপড়া শেষ করে দুই মেয়ের চাকরি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অন্য দুই মেয়ের জন্য এখনও জীবন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন রশিদা খাতুন।

নিজের সংগ্রামী জীবনের গল্প বলতে গিয়ে বারবার চোখ ভিজে উঠছিল তার। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, স্থানীয় জোতদেবীকান্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে মাধ্যমিকে ভর্তি হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় বাবা আছির উদ্দিনের ইচ্ছায় ১৩ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়।পঞ্চগড় চিনিকলের ইক্ষু উন্নয়ন সহকারী নুরুল ইসলামের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। ১৫ বছরের সংসারে চার কন্যার মা হই। শুরু থেকে একটা ছেলের আশায় থাকলেও পরে মেয়েদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি আমরা।

তিনি বলেন, চার মেয়ের কোনটাকে কোথায় লেখাপড়া করাব, তাদের ভবিষ্যত কি হবে এসব নিয়ে শুরু হয় আমাদের চিন্তা-ভাবনা। কিন্তু আমাদের সেই স্বপ্নে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নিয়তি। ২০০১ সালের ২৪ এপ্রিল স্বামী নুরুল ইসলাম হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বপ্নের শুরুতে নেমে আসে অন্ধকার। আকাশ ভেঙে পড়ে আমাদের মাথায়। এলোমেলো হয়ে যায় আমাদের সবকিছু। বড় মেয়ে নাসরিন জাহান সুমি তখন স্থানীয় মাগুড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় মেয়ে নুরুন নাহার প্রাথমিক শেষ করে সবেমাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে, তৃতীয় মেয়ে নুসরাত জাহান মৌসুমির বয়স চার বছর এবং চতুর্থ মেয়ে নাজনীন নাহার আমার কোলে ছিল। তার বয়স ছিল আড়াই বছর। চার জনের দুজনই বাবা হারানোর ব্যথা বুঝে ওঠেনি। স্বামী নুরুল ইসলাম চার মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন।

রশিদা খাতুন বলেন, স্বামীর মৃত্যু আমাকে বিধবায় পরিণত করলেও মেয়েদের ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে। সেই সঙ্গে জুগিয়েছে জীবনযুদ্ধে নামার প্রেরণা। স্বামীর অবসরভাতা পেতে সময় লাগবে। যৌথ পরিবারের সম্পত্তিতে হিস্যা নিতে অনেক নিয়মনীতি। এসব বাদ দিয়ে ভাবি নতুন কিছু করার। তখন পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিতে কৃষিকাজ করার চিন্তা করি। চিন্তা অনুযায়ী নেমে যাই মাঠে। হাতে তুলে নিই লাঙল। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জমিতে ফসল ফলাই। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আমাদের। কৃষিকাজের আয় দিয়ে সংসারের খরচ চালানোসহ মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে নিই। তবে দুঃসময়ে পাশে থেকে আর্থিক ও মানসিকভাবে আমাদের সহায়তা করেছেন ছোট ভাই খলিলুর রহমান।

এরই মধ্যে বড় মেয়ে সুমি দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। এরপরই আটোয়ারী উপজেলার মির্জা গোলাম হাফিজ ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন সুমি। বর্তমানে সেখানে শিক্ষকতা করছেন তিনি। পাশাপাশি দ্বিতীয় মেয়ে নুরুন নাহার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতক এবং একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল করছেন তিনি। তৃৃতীয় মেয়ে নুসরাত জাহান মৌসুমি দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অধ্যয়নরত। চতুর্থ মেয়ে নাজনীন নাহার কেয়া গত বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন।

রশিদা খাতুন বলেন, মেয়েদের লেখাপড়া করাতে, সংসার চালাতে আমাকে কারও কাছে হাত পাততে হয়নি। কৃষিকাজ করেই আমি মেয়েদের মানুষ করেছি। তবে দুই মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে এক বিঘা জমি বিক্রি করেছি। তবে আমরা এখন সুখে আছি।

জীবনযুদ্ধে জয়ী রশিদা খাতুন বলেন, হঠাৎ স্বামীর মৃত্যুর পর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। এরপর স্বামীর স্বপ্ন আর মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁচার চেষ্টা করি। মূলত মেয়েরাই আমার বেঁচে থাকার প্রেরণা। মেয়েদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাদের বাবার স্বপ্ন আমাকে ক্লান্ত হতে দেয়নি। দুই মেয়ের চাকরি হলেও ছোট দুই মেয়ে এখনও লেখাপড়া করছে। এজনই আমার সংগ্রাম এখনও চলছে।

বড় মেয়ে নাসরিন জাহান সুমি বলেন, আমার মা সবার সেরা। একজন সংগ্রামী নারী। ২০ বছর ধরে মায়ের জীবনযুদ্ধ খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাকে কখনও একটা ভালো শাড়ি কিনতে দেখিনি। তবে আমাদের অভাব বুঝতে দেননি। আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ছোট দুই বোন এখন বিশ্ববিদ্যাালয়ে পড়ছে। আমরা ভালো কিছু করলে মায়ের জীবনযুদ্ধ সফল হবে।

রশিদার ছোট ভাই খলিলুর রহমান বলেন, আমার দুলাভাই মারা যাওয়ার সময় আমিও ছোট ছিলাম। তবে বেশ মনে আছে দুলাভাই আমাকে অনেক আদর করতেন। তাদের কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। এমন দুঃসময়ে কে আর পাশে থাকবে বলেন। আমি মামা হয়ে তাদের দেখাশোনা করেছি। ভাগনিরা বেশ মেধাবী। আমার একটু সহায়তা ছিল মাত্র। বর্তমানে চার ভাগনির দুজনের চাকরি হয়েছে এবং অন্য দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। এসবের পেছনে তাদের মায়ের অবদানই বেশি। একজন দক্ষ মা হওয়ার পাশাপাশি দক্ষ কৃষক হয়ে শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছেন বোন।

বোদা উপজেলার ঝলই শালশিরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল হোসেন বলেন, ছোট চার মেয়ে রেখেই নুরুল ইসলাম হঠাৎ মারা যান। ওই সময় তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তবে নুরুল ইসলামের স্ত্রী রশিদা বেগম আসলেই একজন সংগ্রামী নারী। স্বামীর মৃত্যুর পর শক্ত হাতেই সংসারের হাল ধরেন তিনি। স্বমীর রেখে যাওয়া জমি চাষ করেই চার মেয়েকে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এমন নারী আমাদের জন্য অনুকরণীয়।

সূত্র : জাগো নিউজ
এন এইচ, ০৮ মার্চ

পঞ্চগড়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে