Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৩০ মে, ২০২০ , ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-২৫-২০২০

জন্মনিরোধক পিলের নামে বিষ খাইয়ে ২০ প্রেমিকাকে খুন

জন্মনিরোধক পিলের নামে বিষ খাইয়ে ২০ প্রেমিকাকে খুন

বেঙ্গালুরু, ২৬ মার্চ - বহুবার পাত্রপক্ষের সামনে বসেও ‘অপছন্দ’ হয়ে থেকে যাওয়া তরুণীদের নিশানা করতেন মোহন কুমার। প্রেমের ফাঁদে ভুলিয়ে মুগ্ধ করতেন তাদের। তারপর একদিন ‘হবু স্ত্রী’-র হাতে তুলে দিত গর্ভনিরোধক ওষুধের রূপে পটাসিয়াম সায়ানাইড। এভাবে ২০ জন তরুণীকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত মোহন কুমারের আরেক নাম ‘সায়ানাইড মোহন’।

২০০৩ থেকে ২০০৯, এই ছয় বছরে ভারতের দক্ষিণ কর্নাটকের পাঁচ জেলার ছয় শহরে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় ২০ জন তরুণীর। সবার বয়স ২০ থেকে তিরিশের মধ্যে। প্রত্যেকের দেহ পাওয়া গিয়েছিল বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া শৌচাগারে। দেহগুলো উদ্ধার করতে হত দরজা ভেঙে। কারণ, শৌচাগারের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকত।

আরও একটি বিষয়ে মিল খুঁজে পায় পুলিশ। তা হলো- নিহতদের সবার গায়ে ছিল বিয়ের সাজ। কিন্তু কারও গায়ে ছিল না কোনও গয়না। আটটি দেহ পাওয়া গিয়েছিল মহীশূরের লস্কর মোহাল্লা বাসস্ট্যান্ডে। পাঁচটি দেহ উদ্ধার হয়েছিল বেঙ্গালুরুর ব্যস্ত কেম্পেগৌড়া বাসস্ট্যান্ডের শৌচাগার থেকে।

এত সূত্র থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে এই মৃত্যুগুলোকে একসঙ্গে গাঁথার চেষ্টা করেনি দশটি থানার পুলিশ। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তাদের চোখে এগুলো ছিল ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ এবং ‘আত্মহত্যা’।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফরেনসিক টেস্ট বলে, মৃত্যু হয়েছে সায়ানাইডের বিষক্রিয়ায়। তারপরেও মাত্র দু’জনের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। একবারও তদন্তকারীদের মনে প্রশ্ন জাগেনি, এই রাসায়নিক সহসা ব্যবহৃত হয় না আত্মহত্যার ক্ষেত্রে।

টনক নড়ল সম্পূর্ণ অন্য কারণে। উনিশতম রহস্যমৃত্যুর সময় দেখা দিল গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। বছর বাইশের তরুণী জনৈক অনিতার পরিবার থেকে পুলিশে অভিযোগ করা হয়, ভিন্ন সম্প্রদায়ের এক যুবকের সঙ্গে তিনি পালিয়ে গেছেন। তাকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে স্থানীয় থানার সামনে বিক্ষোভে সামিল হয় অন্তত দেড়শো জন। হুমকি দেয়া হয়, তরুণীর সন্ধান পাওয়া না গেলে জ্বালিয়ে দেয়া হবে থানা!

এবার চাপের মুখে নড়েচড়ে বসল বন্তওয়াল থানা। বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিল এক মাস। প্রথমে অনিতার বাড়ির ল্যান্ডলাইনের কললিস্ট পরীক্ষা করা হলো। দেখা গেল, গভীর রাতে তিনি একটি বিশেষ নম্বরে ফোন করে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতেন। সেই নম্বর ছিল এক তরুণীর। দেখা গেল তিনিও নিখোঁজ।

এভাবে নিখোঁজ তরুণীদের ফোনের সূত্র ধরে সন্ধান পাওয়া গেল কিছু নম্বরের। যেগুলো প্রতিটা কোনও না কোনও তরুণীর নামে। কিন্তু তারা সবাই দীর্ঘদিন ধরে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ।

আরও একটি যোগসূত্র প্রকাশিত হলো। তা হলো, প্রতিটা নম্বর কোনও না কোনও সময় সক্রিয় ছিল মেঙ্গালুরুর ডেরালাকাট্টে গ্রামে। সেই নম্বরগুলো ধরে আরও অনুসন্ধান চালিয়ে খোঁজ পাওয়া গেল ধনুষ নামে এক কিশোরের। তার কাছে একটি ফোন পাওয়া গেল, যা কোনও এক সময়ে ছিল কাবেরী নামে এক তরুণীর। কিন্তু এখন তিনি নিখোঁজ।

ধনুষ পুলিশকে জানাল তাকে ফোনটা দিয়েছে তার কাকা মোহন কুমার। এবার তদন্তকারীরা নিশ্চিত হলেন খুনি হয় নারীপাচারকারী, নয়তো সিরিয়াল কিলার। প্রতিবার খুনের পরে নিহত তরুণীর ফোন ব্যবহার করে কথা বলেছে পরের ‘শিকার’-এর সঙ্গে। তদন্ত শুরু হতে অবশেষে পুলিশের পাতা ফাঁদে পা দিল মোহনকুমার। তাকে জেরা করে পুলিশ যা জানল, তা শিউরে ওঠার মতোই।

পুলিশের দাবি, জেরায় মোহন কুমার জানিয়েছে, তার শিকারের সংখ্যা ৩২! যদিও বারোটি মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুলিশকে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রথমে প্রেমের অভিনয় আর বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে তিনি তরুণীদের মন জয় করতেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে নতুন সংসার করার আশায় বাড়ি থেকে পালাতেন তরুণীরা। তাদের সঙ্গে থাকত গয়না।

তারপর তরুণীদের সঙ্গে কোনও হোটেলে রাত্রিবাস করতেন মোহনকুমার। সুযোগ বুঝে নিয়ে যেতেন বাসস্ট্যান্ডে। পরনে বিয়ের সাজ থাকলেও কৌশলে গয়নাগুলো হোটেলেই রেখে দিতে বাধ্য করতেন মোহন কুমার। তারপর বলতেন, বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া শৌচাগারে গিয়ে তার দেয়া গর্ভনিরোধক ওষুধ খেতে। কারণ, ওটা খাওয়ার পর অসুস্থ বোধ করতে পারেন তরুণী। নিজের অজান্তেই পটাসিয়াম সায়ানাইড মেশানো ওষুধ খেতেন তরুণীরা। তারপর তাদের মৃত্যু নিশ্চিত জেনে হোটেল থেকে গয়না ও অন্য মূল্যবান জিনিস নিয়ে পালিয়ে যেতেন মোহন কুমার।

অথচ তাকে সামনে থেকে দেখে বোঝার কোনও উপায় নেই তিনি আসলে ঠান্ডা মাথার খুনি। বন্দিদশায় কোনও অনুতাপ দেখা যায়নি তার মধ্যে। কলপ করা চুল সযত্নে আঁচড়িয়ে, বুকপকেটে কলম আর নোটবুক নিয়ে সে এজলাসে হাজির হয়। গম্ভীর মুখে বিচারকের সামনে নোটও লিখে রাখে নোটবুকে! তদন্ত যত এগিয়েছে তিনি অস্বীকার করেছেন অপরাধ। বলেছেন, তিনি তরুণীদের বিয়ে করতে চাননি বলেই তারা আত্মঘাতী হয়েছেন।

মেঙ্গালুরুর এক গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ছিলেন মোহন। পড়াতেন ইংরেজি, বিজ্ঞান এবং গণিত। আব্দুল সালাম নামে এক বিক্রেতার কাছ থেকে তিনি পটাসিয়াম সায়ানাইড কিনতেন। ২০০৩ সালে এর দাম পড়ত কেজি প্রতি ২৫০ টাকা। আব্দুল জানতেন, তার পুরনো ক্রেতা পেশায় স্যাঁকরা। সোনার গয়না পালিশ করার জন্য এই রাসায়নিক নেন।

পুলিশ জানিয়েছে, খুব হিসেব করে তরুণীদের নিশানা করতেন মোহন। অসচ্ছল পরিবার অথচ বিয়ে করতে মরিয়া এমন তরুণীদের বেছে নিতেন তিনি। এমনকি, জেনে নিতেন তাদের ঋতুচক্রের দিনও। সেই বুঝে হোটেলে রাত্রিবাস করতেন তিনি। যাতে অবাঞ্ছিত সন্তানপ্রসব আটকাতে তার দেয়া গর্ভনিরোধক ওষুধ খেতে বাধ্য হন তারা।

তরুণীর বাড়ি থেকে বহু দূরে বাসস্ট্যান্ড লাগোয় হোটেল বেছে নিতেন মোহন। প্রতিবার শিকার ধরার সময়েই তিনি নিজের পরিচয় দিতেন সরকারি কর্মী হিসেবে। তার কাছে একটা ডায়েরিতে লেখা থাকত নিহত তরুণীদের নাম ও ঠিকানা। পরে এই ডায়েরি হয়ে ওঠে পুলিশের অন্যতম সাক্ষ্যপ্রমাণ।

গ্রামের স্কুলের ছাত্রী মেরি ছিলেন মোহনের প্রথম স্ত্রী। মেরি যখন সপ্তম শ্রেণিতে, প্রেমের সূত্রপাত। তার আঠেরো বছর বয়স হওয়া অবধি অপেক্ষা করেন মোহন। তারপর বিয়ে। কয়েক বছর পরে ডিভোর্সের পরে মেরি চলে গেলে মোহন বিয়ে করেন মঞ্জুলাকে। দুই ছেলেকে নিয়ে মঞ্জুলা থাকেন মেঙ্গালুরুর গ্রামে। মোহনের তৃতীয় স্ত্রীর নাম শ্রী দেবী। এক ছেলে, এক মেয়েকে নিয়ে তিনি থাকেন ডেরালাকাট্টে গ্রামে।

মোহনের কদর্য পরিচয় জানার পরে শ্রী দেবীও তাকে ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে চলে গিয়েছেন। বিয়ে করেছেন যাকে, তিনিও একসময় মোহনের সঙ্গে জেলবন্দি ছিলেন। বন্দি মোহনের সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে গিয়েই তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল শ্রী দেবীর।

পাঁচটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড এবং তিনটি ঘটনায় যাবজ্জীবন কারাবাসে দণ্ডিত মোহন কুমার। মেঙ্গালুরুতে জেলবন্দি এই সিরিয়াল কিলার এখনও স্মিত হেসে তার বয়ানে জানান, তিনি নির্দোষ। তার প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়েই আত্মঘাতী হন তরুণীরা। তাদের সবার জন্য মনখারাপ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু দিন পনেরো পরে নতুন ‘প্রেমিকা’ পাওয়ার পর সব ঠিক হয়ে গিয়েছে!

কিন্তু তিনি তবে বিয়েই বা করলেন না কেন একজনকেও? সংবাদমাধ্যমে এর উত্তরে সিরিয়াল কিলার জানিয়েছেন, দ্বিতীয় আর তৃতীয় স্ত্রীকে সামলাতে গিয়ে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই আর বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না!

সূত্র : জাগো নিউজ
এন এইচ, ২৬ মার্চ

দক্ষিণ এশিয়া

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে