Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০ , ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (29 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-১৪-২০২০

বাঙালিত্বের শপথের দিন

সনজীদা খাতুন


বাঙালিত্বের শপথের দিন

পহেলা বৈশাখ আমাদের বাঙালিত্বের শপথ নেওয়ার দিন। পোশাক-আশাকে, আচার-আচরণে বাঙালিত্বের বলিষ্ঠ ঘোষণা হয় সেদিন। বাঙালির কবিতা, বাঙালির সাহিত্য, বাঙালির নৃত্যগীতে আমাদের চিরন্তন অধিকারের কথা বলতে, বুঝে নিতে, বুঝিয়ে দিতে রমনার বটমূলে প্রভাতি সমাবেশ। সাতষট্টির সেই পাকিস্তান আমলে বছরের প্রথম দিনের এ উপলব্ধি যে কত জরুরি ছিল তা তাঁরাই মনে করতে পারবেন, যাঁরা বাঙালিত্ব ভোলানোর জন্য পাকিস্তানি নিগ্রহকে প্রত্যক্ষ করেছেন।

যখন 'উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা' ইত্যাদি ঘোষণা আমাদের আপন সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র স্পষ্ট করে দিল- প্রিয় বাংলা ভাষা আর বাঙালি ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্যের দিকে আমাদের চোখ পড়ল তখন আরও ভালো করে। মুসলমান হওয়া যেমন অসত্য নয়, বাঙালি হওয়াও নয় তেমনই অসত্য! কিন্তু শুধু মুসলমানই হতে হবে আর বাঙালি সত্তাকে সম্পূর্ণ নিধন করে, আপন ভাষা ভুলে, তবেই হওয়া যাবে খাঁটি পাকিস্তানি- এ বিষয়গুলো শৈশব থেকেই একধরনের পীড়া দিয়ে আসছিল। অন্যদিকে মুসলমান বাঙালিতে বা পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বিরোধের কিছুমাত্র কারণ না থাকলেও কর্তাদের ইচ্ছায় কর্ম হলো, পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বেঁধে গেল দ্বন্দ্ব। এমন পরিস্থিতিতেই বাঙালির বৈশিষ্ট্যগুলোকে চিনে নিতে হলো বাঙালিকে। কয়েকটি বিষয় ঘিরে বাঙালি মানস পরস্পর সন্নিহিত হলো। প্রথমটি তার ভাষা। ভাষার জন্য ভালোবাসা। একুশে ফেব্রুয়ারির স্মারক শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে একত্র হলো বাঙালি। দ্বিতীয় বিষয় এই পহেলা বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ বাংলা নতুন বছরের উৎসব আয়োজনটি বাঙালিকে আর এক বিন্দুতে ঘনিষ্ঠ করল।

তবে গ্রামের মানুষের নববর্ষ কিংবা হালখাতার নববর্ষ আর শহরের এই নববর্ষের একটা পার্থক্য আছে। আমরা যে পহেলা বৈশাখ করছি, এটা বাঙালি জাতির জাগরণের ব্যাপার। আমরা সেটাকে বড় করে তুলে ধরেছি। আমাদের স্বাধিকার চেতনাকে আমরা মানুষের কাছে জানিয়েছি। এগুলো কিন্তু ছোট বিষয় নয়; এগুলোর সঙ্গে হালখাতা এবং নববর্ষ উপলক্ষে গ্রামের যে মেলা হয় তার মিল নেই। এটা একেবারেই নতুন একটা বিষয়।

রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ শুরু হয়েছিল ১৯৬৭ সাল থেকে। এর চার বছর আগে, মানে ১৯৬৩ সালে ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন চালু হয়েছিল। প্রথম প্রথম পহেলা বৈশাখের মঞ্চে বিদ্যায়তনের উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের প্রায় সবাইকেই জায়গা দেওয়া চলত। আর একক গানের জন্য শিল্পীদের সংগ্রহ করতে হতো বাইরে থেকে। কলিম শরাফী, বিলকিস নাসিরুদ্দিন, মালেকা আজিম খান, ফাহমিদা খাতুন, জাহানারা ইসলাম, মাহমুদা খাতুন, চৌধুরী আবদুর রহিম, আফসারি খানমসহ আরও কতজন! তবে প্রথম যখন রমনার বটমূলে অনুষ্ঠান শুরু করি তখন বটমূলের গোড়ায় বাঁধানো সামান্য বেদিই ছিল সম্বল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বহুবার এই বর্ষবরণে বাধা এসেছে। পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একবার আমাদের মঞ্চের পাশে উঠল জগদ্দল চেহারার মঞ্চ। লোকজন জায়গাই পায় না। দুটো মঞ্চের পর আর কতটুকু জায়গা থাকে! তামাশা দেখার ভাব নিয়ে গাছের ওপর উঠল অনেক লোক। আমাদের মঞ্চের ওপর ছুড়ে ফেলল মরা কাক। তার কিছুক্ষণ পর মোড়ের বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো। মাইক্রোফোন বেকার হলো।

আরেকবার বিকেল থেকে টেলিফোন আসতে শুরু হলো, 'যাবেন না, মঞ্চে যাবেন না, নিচে টাইম বোমা রাখা আছে। সাবধান!' তারপর মনে হলো পুলিশে খবর দেওয়া প্রয়োজন। টাইম বোমা আছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব তো পুলিশের। ফোন করে হয়রান হয়ে জানা গেল, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে স্টেডিয়ামে শিশুদের সমাবেশে প্রেসিডেন্ট উপস্থিত থাকবেন বলে পুলিশ ফোর্স সব সেখানে নিয়োজিত হয়েছে। আমাদের জন্য পুলিশের ব্যবস্থা করা যাবে না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় তাদের ওপর বর্তাবে- এই বলে ফোন রেখে দিলাম।

এরপরও বর্ষবরণকে বন্ধ করার চক্রান্ত থেমে থাকেনি। নানাভাবে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে পহেলা বৈশাখের আয়োজনকে থামাতে না পেরে এই মৌলবাদী অপশক্তি ২০০১ সালে রমনার বটমূলে বর্ষবরণের আয়োজনে গ্রেনেড হামলা চালায়। বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয় রমনার বটমূল। ৯ জন প্রাণ হারায়, আহত হয় উৎসবে অংশ নেওয়া আরও অগণিত মানুষ। ওরা ভেবেছিল বোমা মেরেই বর্ষবরণকে বুঝি স্তব্ধ করে দিতে পারল। কিন্তু না, পরের বছর আরও বিপুল উৎসাহে, বিপুল সমারোহে লাখো মানুষের ঢল প্রমাণ করে দিয়েছিল বাঙালি তার প্রাণের উৎসবকে জীবন দিয়ে হলেও নস্যাৎ হতে দেবে না। কারণ পহেলা বৈশাখ বাঙালি আত্মার হাজার বছরের প্রতীক, পহেলা বৈশাখ বাঙালিত্বের শপথ নেওয়ার দিন।

তবে বাঙালিত্ব কাকে বলে সেটা অনেক মানুষই এখনও জানে না এবং বাঙালিত্ব বুঝবার চেষ্টাও আমাদের অনেকের মাঝে নেই। খুব দুঃখের সঙ্গে বলব, রাষ্ট্রীয়ভাবেও নেই। তবে আমি মনে করি, আমরা হতাশ হবো না। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে হবে। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে গঠনমূলক কাজ করে যাওয়া। সংস্কৃতিচর্চায় মানুষের মনের উৎকর্ষ সাধন আমাদের উদ্দেশ্য এবং মনের উৎকর্ষ সাধন হলে মানুষ কাউকে বধ করতে আসবে না। মনটা যদি তৈরি থাকে এবং মনের সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ হয় তাহলে মানুষ তার ভেতরগতভাবে বদলে যায়।

এবারের বর্ষবরণ বাঙালি জীবনে এসেছে নতুন উপলব্ধি নিয়ে। বিশ্বময় এক ভয়ানক মহামারি আঘাত হেনেছে। করোনা নামক ভাইরাসের আক্রমণকে প্রতিরোধ করতে সবাই একসঙ্গে সবার থেকে দূরে থেকে মানবিক ঐক্যের এক নতুন অবস্থান সৃষ্টি করে চলেছি আমরা। রমনার বটমূলে, মঙ্গল শোভাযাত্রায় সমবেত না হয়ে নতুন বছরকে আমরা বরণ করছি নিজ নিজ আঙিনা থেকে। বৈশাখের অগ্নিস্নানে ব্যাধি ও জরা দূর হবে, নতুন বছরটি নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসবে- এই প্রত্যাশা আজ বাঙালির ঘরে ঘরে।

শত চক্রান্ত ষড়যন্ত্র আক্রমণেও বাঙালি মাথানত করবে না; সেই প্রমাণ বাঙালি বারবার দিয়েছে। হাজার বছরের বহুবিধ শত্রুকে প্রতিহত করেই বাঙালি তার নিজের ভাষাকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে, তার নিজের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। আমি জানি, বাঙালিকে যেমন পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না, তেমনি পহেলা বৈশাখে বাংলা বর্ষবরণের উৎসবকেও বন্ধ করা যাবে না। যুগের পর যুগ পহেলা বৈশাখ হয়ে থাকবে বাঙালির ঐতিহ্যের চর্চা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।

আর/০৮:১৪/১৪ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে