Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০ , ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-০৩-২০২০

চীনকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান ট্রাম্প

আবদুল গাফফার চৌধুরী


চীনকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান ট্রাম্প

কী নিয়ে লিখব তাই ভাবছিলাম। আমার ঘরের বাইরে সোনালি রোদ ঝলকাচ্ছে। লন্ডনে সেই শীতার্ত দিনগুলো আর নেই। আমার আপেল গাছে নতুন সবুজ পাতা গজিয়েছে। ভোরে ঘুম ভেঙেছে পাখির কিচিরমিচিরে। আকাশে কালো মেঘ নেই। বরং রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে গাইতে পারি, 'নীল আকাশে কে ভাসালে শাদা মেঘের ভেলা।' আর কোনো বছর এ রকম ঘটলে বলতে পারতাম, পৃথিবীতে জীবন আবার তার রঙ ছড়িয়েছে।

কিন্তু এ বছর তা বলতে পারছি না। চারদিকে মৃত্যুর এত কলরোল, জীবনের সব সুসংবাদ মুছে ফেলেছে। করোনায় শ'য়ে শ'য়ে মৃত্যুর খবরের সঙ্গে স্বাভাবিক মৃত্যুর খবরও পাচ্ছি। কিছুদিন আগে আমার বন্ধু এবং সহপাঠী ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর চলে গেলেন। তারপর গেলেন জামিলুর রেজা চৌধুরী, তরুণ সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকন, অভিনেতা ইরফান খান। একই সঙ্গে শুনেছি ড. মুনতাসীর মামুনের মা করোনা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রার্থনা করি তিনি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠুন। এত মৃত্যুর মধ্যে যদি একটি জীবনও মৃত্যুকে পরাজিত করে বেঁচে উঠতে পারে, সেটাই জীবনের পরম আশ্বাস।

সব ধর্মগ্রন্থই বলে- মানুষ একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আবার পুনর্জাগরিত হবে বিচারের জন্য। সেদিন তাদের মধ্যে শ্রেণিভেদ থাকবে না। আমরা মুসলমনরা এ দিনটিকে বলি রোজ কেয়ামত। ক্রিশ্চিয়ানরা বলে ডে অব রেজারেকশন। দিনটিকে যে নামেই ডাকি, এ দিনের বৈশিষ্ট্য, মানুষের মধ্যে কোনো শ্রেণিভেদ থাকবে না। কথাটা বিশ্বাস হয়। কারণ বর্তমান কভিড-১৯-কে যদি কেয়ামতের অগ্রদূত বলা যায়, তাহলে এই ভাইরাসও মানুষের মধ্যে শ্রেণিভেদ ঘুচিয়েছে। করোনা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর ওপর হমলা চালিয়েছে। আবার নোয়াখালীর নসিমন বিবির ওপরও একই হামলা চালিয়েছে। পার্থক্য এইটুকু, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেঁচে উঠেছেন, নোয়াখালীর নসিমন বিবি বাঁচতে পারেননি।

এখানেই সমাজবিদ, রাজনীতিবিদদের মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে, তাহলে কভিড-উত্তর বিশ্ব সমাজে শ্রেণিভেদ কি ঘুচে যাবে? ব্রিটিশ বাম রাজনীতিক জেরেমি করবিন এবং নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এ ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদ ব্যক্ত করেননি। তবে করোনার হামলায় আগামী মানব সমাজে যে বড় রকমের একটা পরিবর্তন ঘটবে, তার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সমাজবিদরা বলছেন, করোনা নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যতের মানব সমাজের চরিত্রে ও আচরণে কিছু পরিবর্তন আনবে। এক সুইডিশ সমাজবিজ্ঞানী বলেছেন, করোনা-পরবর্তী বিশ্বে ক্যাপিটালিজম ধ্বংস হয়ে যাবে এবং সমাজতন্ত্র তাদের পুরোনো চেহারায় আসবে অথবা সমাজতন্ত্র একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম তামাম দুনিয়ায় জাঁকিয়ে বসবে- এই আশা যেন কেউ না করেন।

ক্যাপিটালিজম তার চেহারা পাল্টাবে এবং সমাজতন্ত্রও। এই দুইয়ের মিশ্রণে ক্রমশ যে নতুন বৈশ্বিক মানবসমাজ গড়ে উঠবে, তাতে মানুষের ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতা এবং যন্ত্রনির্ভরতা বাড়বে। কিন্তু রাষ্ট্রকে বর্তমানে আদেশ পালনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম সারা পৃথিবীতে বাজার অর্থনীতির নামে যে লোভ ও মুনাফার একটি প্রথা প্রতিষ্ঠা করেছে, তা থাকবে না। রাষ্ট্র তার আগের কর্তৃত্ব ফিরে পাবে না। কিন্তু তার ক্ষমতা বাড়বে। জাতীয়তাবাদও একেবারে লুপ্ত হবে না। সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ লুপ্ত হবে। ধর্মের শাসন ও আধিপত্য কমবে।

আমার হাতের কাছে মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাসি, সুইডিশ বহু সমাজবিজ্ঞানীর করোনা-পরবর্তী বিশ্ব সমাজের চেহারা ও আচার-আচরণ নিয়ে বহু অনুমাননির্ভর প্রেডিকশন জমা হয়ে আছে, তা নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। কারণ, বর্তমানের বাস্তব সত্য হচ্ছে, কয়েকটি দেশে ভাইরাসের হামলা কমেছে বটে, কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই তার দাপট সমানে চলছে। তাই মৃত্যু পরিবৃত মানুষকে ভবিষ্যতের কথা শুনিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া যাবে না। তারা জানতে চাইবে বর্তমানের কথা। কী করে এবং কবে তারা এই মহামৃত্যুর কবল থেকে উদ্ধার পাবেন সেই কথা। কিন্তু সে কথা বলার মতো কোনো ভবিষ্যৎ বক্তাই এখন পাওয়া যাবে না। সমাজ তাত্ত্বিকরাও বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা কথা বলছেন। কিন্তু কবে এবং কেমনভাবে এই কালো রাত্রির অবসান হবে, তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছেন না।

বিশ্বের এই পরিস্থিতিতে করোনাকে প্রতিহত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত এবং তা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আমেরিকার ট্রাম্প সাহেব এই বৈশ্বিক উদ্যোগে যোগ দিতে রাজি নন। তিনি করোনার হামলাকেও চীনের বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধে ব্যবহার করতে চান এবং ইতোমধ্যেই এই যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। তিনি বলতে শুরু করেছেন, চীনই সারাবিশ্বে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। এ জন্য তিনি তদন্ত চালাবেন। তদন্তে চীন দোষী সাব্যস্ত হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


ট্রাম্পের এই অভিযোগকে সত্য করে তুলতে চাইছে স্বয়ং চীনই। করোনাভাইরাস কোথা থেকে কেমন করে এলো, সে সম্পর্কে কোনো তদন্ত হোক চীন তা চায় না। চীন যদি বলত, এ ব্যাপারে আমেরিকার একার তদন্তে তার বিশ্বাস নেই। জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্ববিজ্ঞানীর দ্বারা এই তদন্ত চালানো হোক এবং অনুসন্ধানে চীনেরও অংশীদারিত্ব থাকবে, তা হলে কথা ছিল না। কিন্তু তা না করে চীন যদি করোনা সম্পর্কে কোনো তদন্তেই রাজি না হয়, তাহলে বিশ্ববাসীর মনে ট্রাম্পের অভিযোগটিই সত্য বলে মনে হবে যে, চীনই এ কাজটি করেছে।

ইতোমধ্যে একজন মার্কিন এবং একজন চীনা ভায়োরলজিস্ট তাদের অনুসন্ধানের ফল জানিয়েছেন, চীনের উহান প্রদেশের গবেষণাগার এই ভাইরাস ছড়ানোর উৎস নয়। তাহলে উৎসটি কোথায় সে প্রশ্নের জবাব তারা দেননি। তবে এই ভাইরাস যে চীনে প্রথম ছড়িয়েছে এবং চীনের মানুষই প্রথম মারা গেছে, এটি বিশ্ববাসীর জানা। সুতরাং এই ভাইরাসের উৎস হিসেবে চীনকেই ধরে নেওয়া হবে- এটা স্বাভাবিক। তার পর এটাও জানা গেছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসেই বেইজিং থেকে এই ভাইরাস সম্পর্কে আমেরিকাকে সতর্ক করা হয়েছিল। আমেরিকা সেই সতর্কবার্তাকে কোনো পাত্তা দেয়নি।

এটা এখন স্পষ্ট, করোনা থেকে বিশ্ব মানবতাকে বাঁচানোর বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় যোগ না দিয়ে ট্রাম্প সাহেব চান, চীনের বিরুদ্ধে এই ভাইরাস ছড়ানোর তদন্ত নিজে চালাতে এবং প্রমাণ করতে, চীন ইচ্ছাকৃতভাবে বিশ্বধ্বংসী এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। আরও অভিযোগ ইতোমধ্যেই আমেরিকা থেকে তোলা হয়েছে, বিশ্বের অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ারের স্থানটি আমেরিকার কাছ থেকে চীন ছিনিয়ে নিতে চায়। সে জন্যেই এই ভাইরাস ছড়িয়েছে।

চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্প সাহেবের এই অভিযোগের কোনো প্রমাণ যদি থাকে তাহলে তা জাতিসংঘকে জানিয়ে জাতিসংঘকে এ ব্যাপারে তদন্ত চালানোর দায়িত্ব দেওয়া উচিত। জাতিসংঘের তদন্তে এ অভিযোগ সঠিক প্রমাণিত হলে জাতিসংঘই চীনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। তার বদলে ট্রাম্প সাহেব একাই অভিযোগকারী এবং বিচারক হয়ে যদি চীনকে দোষী সাব্যস্ত করতে চান, তাহলে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ তা বিশ্বাস করবে কি? কারণ, সত্য বলার কোনো রেকর্ড আমেরিকান অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের নেই। গালফ যুদ্ধের সময় ইরানের সাদ্দাম হোসেনের হাতে বিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে প্রচার চালিয়ে অবৈধ যুদ্ধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে দেখা গিয়েছিল, সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা।

চীনের উহান প্রদেশ থেকে প্রাকৃতিক কারণেই করোনাভাইরাসটি জন্ম নিয়ে বিশ্বময় ছড়িয়েছে, বিশ্বের সাধারণ মানুষের এ ধারণা হয়তো সঠিক। কিন্তু উহান প্রদেশের ল্যাব থেকে এই ভাইরাসের জন্ম এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন-প্রভাব ধ্বংস করার জন্য চীন ইচ্ছা করে বিশ্বে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে- এ অভিযোগ বিশ্বাস করা কঠিন। এমনিতেই মার্কেট ইকোনমির ব্যর্থতায় গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের জন্য বিপজ্জনক এক মহামন্দা ঘনিয়ে আসছে। চীনের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে ট্রাম্প সাহেব সেই মন্দা সামলাতে পারবেন কি?

পারবেন না জেনেই সম্ভবত চীনকে এই স্কেপগোট বানানোর চেষ্টা। ট্রাম্প সাহেব যদি নিজের তদন্তে চীনকে কভিড-১৯-এর জন্য দায়ী করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চান, তাহলে কী ব্যবস্থা তিনি গ্রহণ করবেন? চীনের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের মুরোদ তার নেই। বড় জোর চীনের সমুদ্রে কিছু সামরিক মহড়া এবং চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা ছাড়া তার হাতে অন্য কোনো অস্ত্র নেই। ট্রাম্প সাহেবের এই নিষেধাজ্ঞা যে গোদা পায়ের লাথি, তা ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সময়েই প্রমাণিত হয়ে গেছে। ট্রাম্প সাহেবের এই চীনবিরোধী হম্বিতম্বি বরং চীন যদি করোনাভাইরাসের ব্যাপারে সত্যই দোষী হয়ে থাকে, তা থেকে তার দায়মুক্তি ঘটাবে। ট্রাম্প সাহেব এই দুঃসময়েও বিশ্ববাসীকে হাসাবেন মাত্র।

করোনার কথায় ফিরে আসি। সিঙ্গাপুরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় জানা গেছে, মে মাসে বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ কমবে। বাংলাদেশ সরকারের এ ধরনের প্রেডিকশনে বিশ্বাস স্থাপন করা উচিত নয়। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে লকডাউন কার্যত উঠে গেছে। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি খুলে গেছে। ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের রাস্তায় প্রায় স্বাভাবিক যানবাহন ও লোক চলাচলও চলছে। সরকার হয়তো সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার কথা ভেবেই এটা করতে বাধ্য হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে অন্তত আরেকটা মাস অপেক্ষা করলে ভালো করত। এটা বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আমার নয়।

আর/০৮:১৪/০৩ মে

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে