Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১০ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-১৬-২০২০

বঙ্গবন্ধু শুধু বড় মাপের নেতা নন, মানুষও

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু


বঙ্গবন্ধু শুধু বড় মাপের নেতা নন, মানুষও

প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

উত্তর :প্রথমেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বাঙালির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে চিনি-জানি বহু আগ থেকেই। আজ যখন তাকে নিয়ে বলতে বসেছি, তখন অতীতকে ফিরে দেখতে গিয়ে কিছু স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠছে। তিনি আমাদের জাতির জনক। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন-সার্বভৌম যে দেশটির আমরা নাগরিক, সেই দেশটি তাঁরই নেতৃত্বে জন্ম নেওয়া। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, বিপুল আত্মত্যাগ ও রক্তমূল্যে অর্জিত এই দেশটির অভ্যুদয়ের জন্যই হয়তো তাঁর মতো প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী, দুঃসাহসী মানুষটির জন্ম হয়েছিল। ইতিহাসের অক্ষয় অধ্যায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা।

প্রশ্ন : তাঁকে নিয়ে আপনার কী কী স্মৃতি আছে?

উত্তর :আমি জন্মেছি ওপার বাংলায়। কৈশোর পেরিয়ে এসেছি এপার বাংলায়। তখনও শেখ মুজিবুর রহমানকে তেমন একটা জানি না। ক্রমান্বয়ে তাঁকে জানতে শুরু করি, চিনে নিতে থাকি। খুলনা, রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জনপদে তো বটেই, ঢাকায়ও তাঁর ভাষণ-বক্তৃতা সরাসরি বহুবার শুনে আকৃষ্ট হতে থাকি। তখন থেকেই রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাকে গভীরভাবে জানার প্রয়াস পাই। এ মুহূর্তে ঠিক করে সাল কিংবা দিন-তারিখটার কথা মনে নেই। তবে ঘটনাটি মনে আছে আজও। শুধু তা-ই নয়, যখনই ওই ঘটনা মানসপটে ভেসে ওঠে অন্যরকম শিহরণও বোধ করি। তিনি যখন বঙ্গবন্ধু উপাধি ধারণ করলেন কিংবা এই উপাধিতে তাঁকে জনসমক্ষে অন্যরকমভাবে বরণ করে নেওয়া হলো, তখনকার কিছু স্মৃতিও মানসপটে ভেসে উঠছে। তাও দূর থেকে জানা। তবুও যেন তা অনেক জানা। তা-ই তো মনে হয়েছিল। মনে পড়ছে, তাকে প্রথম কাছ থেকে দেখার ঘটনা। খুলনার দৌলতপুর কলেজে সবেমাত্র শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছি। একদিন শুনলাম ওই অঞ্চলে তিনি আসছেন। রূপসা ও ভৈরব নদীর তীরে তখন অনেক চটকল ছিল। ছিল খুব সুন্দর সুন্দর রেস্ট হাউসও। এসব রেস্ট হাউসের তখন বেশিরভাগ সময়ই বিদেশিদের (ব্যবসায়ী শ্রেণির মানুষই এর মধ্যে বেশি) উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত। তিনিও সেখানেই একটা রেস্ট হাউসে উঠলেন। তখন আমি ও কলেজের ইংরেজির শিক্ষক জিল্লুর রহমান গেলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি বিশ্রামে ছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর তাঁর অবস্থানরত কক্ষে আমাদের ডাক পড়ল। সুঠামদেহীর অনলবর্ষী বক্তা শেখ মুজিবকে এর আগে দেখেছি দূর থেকে। সেবার একেবারে কাছে। মাত্র কয়েক গজের দূরত্ব। অপলক তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। আমাদের দু'জনের সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি নিজেই অনেক বিষয়ে খোঁজখবর নিতে লাগলেন। সাহিত্য বিষয়ে তাঁর আগ্রহ দেখে বিস্মিত হলাম। বাংলা সাহিত্য থেকে বিশ্ব সাহিত্যের অনেক বিষয় আলোচনায় উঠে এলো। আমরা যত না বলছিলাম এর চেয়ে অনেক বেশি শুনছিলাম। রাজনীতির কবি হিসেবে খ্যাত এই মানুষটির বিশালত্ব সেদিন যেটুকু আঁচ করতে পেরেছিলাম, তা আজও আমার কাছে অক্ষয় অধ্যায়। তিনি তাঁর ব্যাপ্তি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে। গায়ের রং ফর্সা না হলেও সুঠামদেহীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবকিছুই ছিল দাগহীন-পরিচ্ছন্ন ফর্সা। সেদিন এই অনুভূতিটাই আমাকে খুব তাড়া করছিল।

প্রশ্ন : তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ প্রত্যক্ষ আলাপচারিতায় আপনাদের আর অনুভূতি কী ছিল?

উত্তর :যখন আমাদের উঠে যাওয়ার সময় হলো, তখন আরও মুগ্ধ হলাম। এত বড় মাপের একজন মানুষ সবিনয়ে বিদায় জানাতে উঠে এলেন কক্ষের বারান্দা পর্যন্ত। তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসার পর আমরা দু'জনেই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। এই মানুষটি সম্পর্কে যতটুকু জেনেছিলাম তার চেয়েও যে তিনি অনেক বড়, তা সাক্ষাতে গভীরভাবে অনুভব করলাম। আমি ও জিল্লুর সাহেব নতুন করে বিশ্নেষণ-আবিস্কার করলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবকে। দ্বিতীয়বার আমরা কয়েকজন শিক্ষক মিলে (সম্ভবত '৭৩-এর শেষ দিকে) তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, তাঁর ৩২ নম্বরের বাসভবনে। খুব সাদা-মাটা পোশাক পরিহিত অবস্থায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। সেদিন তিনি আমাদের বেশ কিছু দিকনির্দেশনাও দিয়েছিলেন। সেদিন একপর্যায়ে বললেন, 'যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটা গড়তে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর। বেতন-ভাতা কম নিতে হবে কিছু দিন। দেশ বাঁচলে আমরা সবাই বাঁচব। আমাদের শোষণ করে পাকিস্তানিরা সব নিয়ে নিয়েছে। তবুও আমরা গর্বিত দেশ স্বাধীন করতে পেরেছি। এখন সবার দায়িত্ব দেশ গড়ার।' আরও অনেক দিকনির্দেশনামূলক কথা বলেছিলেন। স্মৃতির আয়নায় ধুলো জমেছে। অনেক কিছুই মনে নেই। কিন্তু তাঁর দৃঢ়-দীপ্ত কণ্ঠ আজও কানে যেন বাজে। তাঁর প্রত্যয়ী ও দৃঢ়চেতা মনোবল এবং দূরদর্শী প্রখর দৃষ্টির দ্যুতি আজও সেভাবেই যেন জ্বলজ্বল করছে আমার চোখের সামনে। বহু শক্তিতে বলীয়ান ছিলেন তিনি।

প্রশ্ন : শোকাবহ এই দিনে অতীতকে কীভাবে দেখছেন?

উত্তর :আজ শোকের দিন। কত দুর্ভাগা জাতি আমরা! একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা ও রাজনীতির কূটকৌশলধারীরা জাতির জনককে '৭৫-এর এই দিনে সপরিবারে শেষ করে দিল। আজকের প্রধানমন্ত্রী তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তখন দেশের বাইরে থাকায়। ইতিহাসের চাকা থেমে থাকে না। তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ইতিহাসের কালো অধ্যায় মুছেছেন। তাঁর হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল আইন করে। যেদিন সভ্যতা-মানবতাবিরুদ্ধ এই অপকাণ্ড করা হয় সেদিন চোখের কোণে পানি জমেছিল অনেক। মনে হয়েছিল আবারও কি ফিরে গেলাম পাকিস্তানে! সামনে আর কী ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে কে জানে! কিন্তু না, বিলম্বে হলেও আমরা জনক হত্যার বিচার পেয়েছি।

প্রশ্ন : রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ব্যাপ্তি কতটুকু?

উত্তর :যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুর অক্লান্ত প্রয়াসের অধ্যায়গুলোও আমার স্মৃতির উজ্জ্বল অধ্যায়। অনেক বড় মাপের নেতা ছিলেন তিনি। সমগ্র বিশ্বে তিনি সমাদৃত ছিলেন তার নেতৃত্ব গুণেই। বঙ্গবন্ধুকে আমি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে যে কিছু অংশ দেখেছি তাও মনে পড়ে। দাবি করি যে, আমরা অনেকেই এর অংশীদারও। দেখেছিলাম, বিরাট ঝড় দেখা দিলে সবকিছু যেমন সামনে থেকে হেলে পড়ে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কথায় জনগণও কীভাবে হেলে পড়ছিল। তাও আমার স্মৃতিরই অংশ। জনগণ তাকে নায়ক হিসেবে নির্বাচন করে এগিয়ে যেতে থাকল। '৬৯-এর গণআন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাবেরও অংশীদার বলে আমরা দাবি করব। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ তাকে আরও সুউচ্চতায় নিয়ে গেল। সেদিন আমরা বুঝেছিলাম জনগণের মনের কথা রয়েছে তাঁর মনে। স্বাধীনতার পর দেশি-বিদেশি নানা শক্তি বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করা শুরু করল। নানা রকম এলোমেলো ঘটনা ঘটতে থাকল এবং এসবের সিঁড়ি বেয়েই এলো '৭৫-এর ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশই শুধু নয়, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা ও শক্তি এক রকম বিলুপ্ত হলো। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রজ্ঞা-দূরদর্শিতা-সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার এসব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন। রূপ দিলেন আজকের বাংলাদেশের। এ জন্য তাকেও কম ঘাত-প্রতিঘাত প্রতিহত করতে হয়নি। যার নেতৃত্বে একটি দেশের অভ্যুদয়, সেই দেশের বিপথগামী নাগরিকরাই হলো তাঁর হন্তারক।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম থেকে এর পূর্বাপর বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

উত্তর :তাঁকে মূল্যায়ন করার কাজটি খুব দুরূহ। তিনি অনেক বড় মাপের নেতাই শুধু নন; মানুষও বটে। তাঁর কাছে তাঁর জন্যই আমরা চিরঋণী। তাঁর মুখোমুখি যে ক'বার হয়েছি তখনই মনে হয়েছে, এই মানুষটির উপস্থিতিতেই কিছু একটা তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। আর এর মধ্য দিয়েই তিনি সরাসরি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতেন। এক কথায় বলা যায়, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মের অঙ্কুরোদ্‌গমও হয়েছিল তাঁর জন্মক্ষণ থেকেই। একাত্তরের নারকীয় তাণ্ডবের আমিও একজন প্রত্যক্ষদর্শী। বঙ্গবন্ধু একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। আর এ জন্যই আমাদের জনক তিনি। একজন পূর্ণাঙ্গ নেতার যত রকম গুণ থাকা দরকার, সেসবই তো ছিল তাঁর মধ্যে। আমার দেখা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো এরই সাক্ষ্যবহ একটি বিশাল স্তম্ভ। তাঁর নেতৃত্ব গুণ, মানবিকতা, রাষ্ট্র পরিচালনায় দূরদর্শিতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ইত্যাদি সবকিছুই গবেষণার বিষয় হতে পারে।

হাসান আজিজুল হক: কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ

এমএ/ ১৬ আগস্ট

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে