Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১০ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.9/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-১৮-২০২০

গল্প: নির্বাক মায়া

আবদুর রহমান


গল্প: নির্বাক মায়া

নিরব দোকানে বসে চা খাচ্ছিল। হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি। অনেক্ষণ হলো বৃষ্টি থামছে না। একটা সিগারেট ধরাতে খেয়াল করলো (ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর) তার কানে একটা আওয়াজ আসছে। কি মিষ্টি আওয়াজ! কেউ একজন মিষ্টি করে হাসছে। দোকান থেকে বেরিয়ে দেখে একটা মেয়ে হাতে কদম ফুল নিয়ে পথশিশুদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজছে আর হাসছে। কি সুন্দর সে হাসি! কি সুন্দর হাসির ভঙ্গিমা!

বৃষ্টি শেষ। মেয়েটিও চলে যেতে লাগলো। বাচ্চাদের মধ্যে একজন বলে উঠলো দিয়া আপু আবার আসবেন। দিয়া বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আদর করে হাসি দিয়ে বলল আসবো।

পথের বাচ্চাদের প্রতি দিয়ার ভালোবাসা দেখে নিরবের খুব ভালো লাগছিলো। বৃষ্টি হলেই দিয়া এই বাচ্চাদের মাঝে আসে বাচ্চাদের আনন্দ দিতে। আর নিরব আসে এইসব আনন্দ দেখতে। নিরব দেখে সুন্দর মনের মেয়েটিকে, দেখে তার হাসিও। প্রথম দিনের দেখা থেকেই নিরব দিয়ার পিছু নিতে  থাকে। দিয়া অবশ্য বিষয়টা টের পায়।

ক্যাম্পাসে আসলেই দিয়া তার প্রিয় আড্ডার জায়গাতে চলে যায় বান্ধবীদের নিয়ে। আজও গেল। গিয়ে দেখে সেই ছেলেটা, যে তাকে কয়েকদিন থেকে ফলো করে।

ক্যাম্পাসে আসার সময়, ক্যাম্পাস থেকে যাওয়ার সময়। ক্যান্টিনে খাওয়ার সময়। বাস-স্ট্যান্ডে। এমনকি মাঝে মাঝে বাড়ির পাশেও চলে আসে। তবে কোনো দিন কাছে এসে মুখ খুলে কথা বলেনি। কোনো দিন হলুদ টি-শার্ট, কোনো দিন  লাল পাঞ্জাবী পরে দিয়ার আসেপাশে ঘুরে বেড়ায় সে। দিয়া ছেলেটার দিকে তাকালেই ছেলেটা গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। নয়তো আকাশের দিকে তাকায়। কিংবা মোবাইল বের করে কানের কাছে ধরে। এমন একটা ভাব যেন কিছুই জানে না।

কয়েক মাস পার হয়ে গেল। দিয়া এখন বাসা থেকে বের হলেই এদিক ওদিক তাকায়। ছেলেটাকে খোঁজে।  মন যেন কেমন টানে। ক্যাম্পাসে আসলেও আশে পাশে যেন ওই ছেলেটাকেই খুঁজে বেড়ায়। একটু দেখতে পেলেই যেন মুখে প্রশান্তির হাসি।

ইদানিং দিয়া বেশ সাজগোজ ও করছে। হয়তো ছেলেটাকে ভেবেই সাজগোজ করে। আজ সকালে কপালে ছোট্ট একটা নীল টিপ দিল। গায়ে জড়িয়েছে নীল শাড়ি। নীল শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে হাতে পড়েছে নীল চুড়ি। দিয়াকে নীল শাড়িতে খুব সুন্দর লাগে। যেন নীল পরী। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে ছিল। নিজেরই চোখ ফিরাতে সময় লেগেছে। আর অন্য কেউ তাকালে তো চোখই ফেরানো দায়। দিয়া বের হতেই মা’র কণ্ঠ।
‘তোদের কলেজে আজ কোনো অনুষ্ঠান নাকি?’
-কই না তো!
মা জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে শাড়ি পরে কোথায় যাচ্ছিস?
-অনুষ্ঠান ছাড়া কি শাড়ি পরা যায় না?
‘যায় তো। কিন্তু তুই তো কখনো শাড়ি পরিসনি ।’
দিয়া হেসে বলে আজ পরেছি। আমাকে কেমন লাগছে মা? মায়ের উত্তর , তোকে সব সময় সুন্দর লাগে। উঁহু মা! সব সময়ের কথা জানতে চাচ্ছি না। এখন কেমন লাগছে সেটা বলো। মা বুকে টেনে নিয়ে বলে, আমার লক্ষ্মী সোনাকে এখনো খুব সুন্দর লাগছে। দিয়া লাজুক মুখে বলে, ‘যে কেউ দেখলে পছন্দ করবে না?’
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, তুই কাকে পছন্দ করাতে যাচ্ছিস? কাউকে না, বলে দিয়া হাসতে হাসতে চলে গেল ক্যাম্পাসের দিকে।

কিরে দিয়া, তুই এখানে বসে আছিস কেন? ক্লাসে চল? আসমা এসে জিজ্ঞেস করল। নারে তুই যা। আমি আজ ক্লাস করবো না। দিয়ার আজ অনেকটা মন খারাপ। আজ বাড়ি থেকে আসার পথে ছেলেটাকে দেখলো না। বাস-স্ট্যান্ডেও না। ক্যাম্পাসে এসেও দেখা মিলল না ছেলেটার। কি হইছে? হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেল? দিয়ার মনে হাজারো প্রশ্ন আসছে।

মন খারাপ করে দিয়া তার প্রিয় আড্ডার জায়গাতে বসে আছে। সবাই ক্লাসে ঢুকছে কিন্তু দিয়া যাচ্ছে না। বসে থাকবে ছেলেটার জন্য। যার জন্য আজ এতো সাজগোজ, দিয়া তার জন্য অপেক্ষা করছে। বার বার শূন্য পথের দিকে তাকায়। ভাবছে, এই আসছে বোধ হয় ছেলেটা। কিন্তু না, ছেলেটা আসেনা। দিয়া জানে সে নিজে পাগলামি করছে। একটা ছেলেকে চিনে না জানে না, তবুও তার জন্য সেজেগুজে বসে আছে! হয়তো মনের টান এটা।

বেল বাজতে লাগলো। ক্লাস শেষ। বন্ধু-বান্ধব সবাই এসে দিয়ার সঙ্গে আড্ডায় বসলো। দিয়ার আড্ডায় মন বসে না। তার চোখ দুটো ওই পথের দিকে। যদি দেখা যায় ছেলেটাকে।

বন্ধুরা বলতে লাগলো আজ দিয়াকে হেব্বি লাগছে। সুন্দর লাগছে। বৌ বৌ লাগছে। এসব কথা দিয়ার মনে ছোঁয় না। দিয়া শুধু এদিক ওদিক তাকিয়ে ওই ছেলেটাকে খোঁজে। কিন্তু দেখা মিলছে না।

দিয়া বাড়ির দিকে রওনা হলো। ফেরার পথে বাস-স্ট্যান্ডে অনেক্ষণ দাঁড়ালো। আসে পাশে খুঁজছে। দিয়া ভাবে হয়তো শেষ মুহূর্তে দেখা মিলবে। কিন্তু না ছেলেটা আসেনি। দিয়া ভাবতে লাগলো, হয়তো কোনো সমস্যা হয়েছে, না হয় আজ কোনো ব্যস্ততায় আছে। নিজের মনকে কোনো রকম বুঝিয়ে বাসায় চলে এলো দিয়া।

গতকালের মতো আজকেও সেজেগুজে এসেছে দিয়া। হয়তো আজকে দেখা হবে। ছেলেটা তাকিয়ে থাকবে দিয়ার দিকে। বড় আশা নিয়ে আছে দিয়া। কিন্তু আজো দেখা হলো না। পথে-ঘাটে আজকেও খুঁজেছে। ছেলেটাকে দেখলো না। ক্যাম্পাসে এসেও খোঁজে। ক্লাস করেনি, সারাদিন এদিক ওদিক খোঁজে ছেলেটাকে। দেখা পেলো না। গত কয়েকমাস যে ছেলে দিয়াকে দেখার জন্য ক্যাম্পাস, রাস্তাঘাট এমনকি বাড়ির সামনে পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতো। সে ছেলের হঠাৎ কি হলো! গভীর ভাবনায় থাকে দিয়া। দিয়ার আর কিছুই ভালো লাগছে না। বিষাদ মন নিয়ে দিয়া বাড়ির দিকে রওনা হলো।

বাসের সিটে জানালার পাশে বসে বাহিরের  দিকে তাকিয়ে থাকতে অকারণেই যেন টিপটিপ জল পড়ছে চোখ থেকে। অজানা অচেনা এক ছেলের ওপর খুব অভিমান হয়। নামটাও জানে না দিয়া।

কপাল থেকে টিপ খুলে বাহিরে ফেলে দেয়। দিয়ার পাশের সিটে বসেছে মধ্য বয়সি এক পুরুষ। তিনি হাঁ করে তাকিয়ে রইলো দিয়ার দিকে। রাগ লাগছে দিয়ার। ভদ্রলোককে ধমক দিয়ে বলে এইযে এখানে বসেছেন কেন? মহিলা সিটে বসা অভ্যাস গেল না আপনাদের? উঠুন, যান এখান থেকে। এমন ঝাড়ি দিল, ভয়ে লোকটি উঠে যায় সে সিট থেকে।

ফের আবার বাহিরের দিকে তাকিয়ে দিয়া ছেলেটাকে নিয়ে ভাবছে। নিজের অজান্তেই চোখ থেকে জল পড়ছে। দিয়ার জীবনে এই প্রথম কোনো ছেলেকে ভেবে কাঁদছে। তাও অজানা অচেনা এক ছেলেকে ভেবে। কখনো কারো প্রতি এমন দুর্বল হয়নি সে। নাহ আর দুর্বল হবে না। কোনো এক জায়গায় তার বিয়ের কথা চলছে বাসায়। দিয়া ভেবে নিয়েছে বাবা যার সঙ্গেই বিয়ে ঠিক করবে। তাকেই বিয়ে করবে। পিছু নেওয়া অচেনা ছেলেটাকে আর খুঁজবে না। কিন্তু ছেলেটার প্রতি ভালোলাগা ভালোবাসা না থাকলেও মনের ভেতর কিছু একটি কাজ করছে। বুঝতে পারছে না দিয়া। আজ অকারণে কাঁদছে আকাশ, অকারণে যেন কাঁদছে দিয়াও।

বাসায় এসে নিজের রুমের আলো নিভিয়ে অনেকটা সময় শুয়ে থাকে দিয়া। হঠাৎ মা এসে আলো জ্বালিয়ে দিয়ার মাথার কাছে এসে বলে- কিরে এই সন্ধ্যার সময় ঘরে লাইট বন্ধ রেখেছিস কেন? মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, মনে খারাপ? নাকি শরীর খারাপ?
দিয়া বলে, ‘এমনি শুয়ে পড়েছিলাম মা। কিছুই হয়নি।’
‘একটু ফ্রেশ হয়ে নে। একটা  ভালো শাড়ি পরে নে।’
কেন? দিয়ার কৌতুহল।
ওইযে তোকে বলেছিলাম না তোর মামা একটা ছেলের কথা বলেছে।  আবির চৌধুরী। অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার। ওরা এসেছে।
কেন? দিয়া আবার জিজ্ঞেস করলো।
কেন আবার? তোকে দেখতে এসেছে। সেদিনও এসেছিল, তুই কলেজে ছিলি তাই তোর সঙ্গে দেখা হয়নি।
তোমাদের পছন্দ হয়েছে মা?
হ্যাঁ। আমার আর তোর বাবার পছন্দ হয়েছে। ছেলেটি খুব নম্র ভদ্র।
মায়ের কথা শেষ না হতেই দিয়া বলে
আচ্ছা, তুমি যাও। আমি রেডি হচ্ছি।

আয়নার সামনে গিয়ে চোখে কাজল দিতেই ভেজা চোখটা দেখে ওই ছেলেটাকে মনে পড়লো আবার। দিয়া বুঝতে পারছেনা কেন বার বার মনে পড়ে ছেলেটাকে। কোনো রকমে তৈরি হয়ে মেহমানদের সামনে আসলো দিয়া। সোফায় মাথা নিচু করে বসে আছে দিয়া। তার বিপরীতেই বসা আবির চৌধুরী। দিয়া মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। শুধু কানে কথা আসছে। দিয়ার বাবা মা এবং আবিরের বাবা মা কথা বলেই যাচ্ছেন অবিরাম। ছেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আবির চৌধুরীও চুপ করে বসে রইলেন। আবিরের মা বলে উঠলেন দিয়া মা অনেক লক্ষ্মী মেয়ে। মামা বলেন, দিয়া তোমরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলো।

দিয়া মুখ তুলে তাকাতেই যেন বিদ্যুতের শক খেল। একি! ওই ছেলেটা এখানে বসে আছে! বুকের ভেতর কেমন ধুপ ধুপ করে উঠলো। দিয়া বার বার চোখ ফিরিয়ে বার বার তাকাতে লাগলো। একটু পরেই নিজেকে সামলে নিল।

আবির চৌধুরীর চেহারা অনেকটা সেই ছেলেটার মত। যে ছেলে দিয়ার পিছু নিয়েছিল। দিয়া যার জন্য নীল শাড়ি পরে গিয়েছিল কলেজে। যার জন্য দিয়ার চোখের জল পড়েছে। কিন্তু আবির সাহেবকে দেখে বোঝা যাচ্ছে উনি খুব লম্বা, আর ওই ছেলেটা অনেক খাটো। আবির সাহেব স্বাস্থ্যবান আর ওই ছেলেটা শুকনো। আবির সাহেব একটু শ্যামলা আর ওই ছেলেটা ফর্সা। তবে চেহারায় অনেক মিল। অনেকটা মিল। দিয়ার চোখে ওই অচেনা চেহারাটা গেঁথে গেছে। তাই এতো মিল পাচ্ছে। দিয়া আবির চৌধুরীকে প্রথম দেখে ধরেই নিয়েছিল যে ওই ছেলেটাই বসে আছে। পরে আস্তে আস্তে বুঝতে পারলো। তাছাড়া কাছাকাছি চেহারার অনেকেই আছে পৃথিবীতে।

আবির আর দিয়াকে আলাদাভাবে কথা বলতে দেওয়া হলো। দিয়া অন্যদিকে মুখ করে রইলো। আবির সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছেন? বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিয়া উওর দিল, ‘ভালো’। তবে দিয়ার উদাসীন মন দেখে আবির বলে আমাকে অপছন্দ হলে সরাসরি বলে দিন। এই যুগে জোর করে বিয়ে করার পক্ষে আমি না। দিয়া ভেবে পাচ্ছিল না কি বলবে। আবির কোনোমতেই অপছন্দ হওয়ার মতো ছেলে না। কোনো দিক দিয়েই না। তাছাড়া দিয়ার বাড়ির লোকেদের আবিরকে খুব পছন্দ হয়েছে। দিয়ার এরপর আর কি-ই বা বলার থাকে!

আজ অনেকদিন পর দিয়া কলেজে এসেছে। নিজের অজান্তেই চোখ দুটো কি যেনো খুঁজছে। ক্লাস শেষে চোখ দুটো ঠিকই খুঁজে নিল ওই ছেলেটাকে। দেখেই দিয়া কিছুটা স্থির হলো, যেন কত আপন সে। আবার খুব রাগও হচ্ছে। দিয়া খেয়াল করলো ছেলেটা আজ বিষন্নতায় ভুগছে। কিন্তু কেন! কলেজের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে বসে আছে দিয়া। ছেলেটা আজ একটু বেশিই ঘোরাঘুরি করছে। কেমন অস্থির লাগছে ছেলেটাকে। আজ দিয়া তাকালেও ছেলেটা চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে না। হয়তো আজ কিছু বলতে চায়। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না।

দিয়া কিছু না ভেবেই নিজ থেকেই ছেলেটার সামনে গেল। আজ হলুদ টি-শার্ট পরে আসেনি। কালো পাঞ্জাবি পরে এসেছে আজ। কালো শোকের প্রতীক। আজ ছেলেটার মন পাড়ায় যেন শোক চলছে। তবুও কালো পাঞ্জাবিতে ছেলেটাকে ভালো লাগছে। ওইদিন ছেলেটাকে দেখতে না পেয়ে দিয়ার খুব রাগ হয়েছিল, এখনো আছে সে রাগ। দিয়া ছেলেটার সামনে বরাবর দাঁড়িয়ে বললো-
কি, সমস্যা কি আপনার? অনেকদিন থেকে ঘুরঘুর করছেন। আমি যেখানে যাই সেখানে আপনি যান। কেনো! কেনো এমন করেন? আজ অনেক্ষণ থেকে খেয়াল করলাম আপনি তাকিয়ে আছেন। মেয়ে মানুষ কি দেখেন নি কখনো? এসব বাদ দিয়ে দিন। এক নিঃশ্বাসে দিয়া ঝাড়ি দিতেই থাকে। ছেলেটা কোনো উওর দিচ্ছে না। নীরবে দাঁড়িয়ে শুধু দিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

ছেলেটার চোখ ভিজে আসছে। দিয়ার মায়া হচ্ছে, খুব মায়া হচ্ছে। তবে এখন আর মায়া বাড়াতে চায় না দিয়া।
দিয়া এবার জোরে বলতে লাগলো, কি হলো? উওর দেন না কেন? আপনি বোবা নাকি? ছেলেটা বুক পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দিয়ার দিকে বাড়ালো। দিয়া জিজ্ঞেস করলো কি এটা? কোনো জবাব না দিয়ে দিয়ার হাতে কাগজটা দিয়ে হাঁটতে লাগলো ছেলেটা। পেছন ফিরে তাকালো না। দিয়া উদাস মনে চেয়ে আছে ছেলেটার চলে যাওয়ার দিকে।

দিয়া বাড়ি চলে এলো। আসার সময় স্টেশনে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো। ছেলেটাকে দেখতে পেল না।  ব্যাগ থেকে কাগজটা বের করে হাতে নিল, ভাবলো ফেলে দেবে। কিন্তু কেন যেন মনে হলো কাগজ টা খুলে দেখবে। কি লেখা আছে এতে? দিয়া কাগজ টা খুললো, দেখলো চিঠি  লেখা। আজব তো! এই যুগে কেউ চিঠি দেয়! বিরক্তিবোধ করেও খুব আগ্রহ নিয়ে পড়তে লাগলো চিঠি টা।

প্রিয় দিয়া,
আসসালামুয়ালাইকুম। আশাকরি ভালো আছো। আমি নিরব। হয়তো ভাবছো কে এই ছেলে! সারাদিন বখাটের মত ঘুরঘুর করে কেন? হয়তো ভাবার সময়ও পাওনি। কিন্তু আমি তোমাকে নিয়ে ভাবি সেই প্রথমদিন থেকে,  যেদিন তোমাকে দেখেছিলাম। সেদিন বৃষ্টিতে তোমাকে দেখেছি। তুমি বৃষ্টিতে ভিজেছিলে পথ শিশুদের সঙ্গে। তোমার মধ্যে পথশিশুদের জন্য ভালোবাসা দেখে আমি মুগ্ধ। তোমাকে যত দেখি তত ভালো লাগে। ভাবনার জগতে হারিয়ে যাই। সেদিনের পর থেকে তোমাকে একদিন না দেখলে দিনটা কেন যেন বিষাদময় লাগে। তাই ছুটে আসি তোমার পানে। ক্যাম্পাসে, নয়তো বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকি। তোমাকে কিছু বলবো বলেও বলতে পারিনি। কোনো দিন সাহস পাইনি তোমার সামনে আসার। আসবোই বা কি করে! আমি যে কথা বলতে পারিনা। স্বরহীন আমি।

গত কয়েকদিন তোমাকে দেখতে আসিনি। মায়া বাড়াতে চাই না। কারণ তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আর যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছে তিনি আমার আপন বড় ভাই! আমার অন্ধকার জীবনে তোমাকে দেখার পর একটু আলো আসলো। মনে হলো তুমিই আমার সুখ। কিন্তু তোমার বিয়ের কথা শুনেই বজ্রপাত সৃষ্টি হলো। সেই আবার অন্ধকার নেমে এলো। খুব একাকিত্ব লাগছিল। ভেবে দেখলাম, আমার সঙ্গে তোমার মেলে না। একজন স্বরহীন মানুষকে জেনে শুনে নিশ্চয় কেউ তার জীবনে জড়াবে না। আমার ভাই কিন্তু ভালো ছেলে, দিয়া তুমি আমার ভাইকে বিয়ে করে নাও। তোমাকে দেখতে খুব ভালো লাগে। ভেবে ভালো লাগছে যে আমার ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হলে তোমাকে খুব কাছ থেকে এক জীবন দেখতে পাবো।

ইতি

নিরব।

দিয়ার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। চিঠিটা উল্টিয়ে দেখছে আর কিছু লেখা আছে কিনা। দিয়ার কেমন যেন অনুভূতি হচ্ছে। এই অনুভূতির নাম জানা নেই। একরাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাহিরের ঐ দূরের আকাশ পানে তাকিয়ে আছে। দিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কিছু যেন হারিয়ে ফেলেছে দিয়া। সেই কিছুটা কখনো পাবার ছিল না। আর কখনো পাবেও না। নিরবের জন্য মনের ভেতর টান পাচ্ছে। দিয়া বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব করছে। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে নিরবকে।

বাবা মাকে দিয়া জানিয়ে দিল সে আবির কে বিয়ে করবে না। আবিরকে তার পছন্দ হয়নি। হয়তো বিয়ে হলে নিরবকে দেখতে পাবে। নিরবও সবসময় তাকিয়ে থাকবে। তবুও কিছু শুন্যতা দুজনকে পোড়াবে। এমনটা দেখতে চায় না দিয়া। প্রথম ভালোবাসা না, প্রথম ভালোলাগা না, প্রথম কাঁদিয়ে দেয়া মানুষটা হারিয়ে যাক। দিয়ার বিশ্বাস এই হারিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে নিবর ভালো থাকবে। তবে হারিয়ে যাক। কোথাও হারাক।

হয়তো কখনো আবার যেখানে সেখানে নিরব দাঁড়িয়ে থাকবে দিয়াকে দেখার জন্য। নিঃশব্দে চোখে চোখে অনেক কথা বলবে। মনটাকে মানাতে পারে না দিয়া। মানুষটার জন্য আবারো খুব করে কাঁদতে মন চায়। চিৎকার করে খুব কাঁদতে চায়। এসব কান্নার মানে কি! জানা নেই। হিসেব কষে কোনো মিল পাওয়া যায় না। তবুও ভালো থাকা হোক।

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, দত্তপাড়া কলেজ লক্ষ্মীপুর।

এমএ/ ১৮ আগস্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে