Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১০ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-২৯-২০২০

করোনাকালে ভয়াবহ সংকটের মুখে দেশের শিক্ষা

আবদুল মান্নান


করোনাকালে ভয়াবহ সংকটের মুখে দেশের শিক্ষা

কিছুদিন আগে, করোনাকালে পদ্মার ভাঙনে একটি বড় বহুতল স্কুল ভবন পুরোটাই পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে বুকের ভেতর হু হু করে উঠেছিল। এটি যেন করোনাকালে বাংলাদেশের শিক্ষার ভয়াবহ বিপর্যয়ের একটি প্রতীকী আগাম বার্তা। পূর্ব প্রাইমারি হতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক পৌনে ছয় কোটি, বিশ্বের একশটি দেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এর মধ্যে বাইশ হাজার কওমি মাদ্রাসার পঁচিশ লাখের বেশি শিক্ষার্থী বাদ। গত ১৭ মার্চ হতে দেশ করোনা আক্রান্ত হওয়ার শুরুর সময় সরকার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। এই পৌনে ছয় কোটি শিক্ষার্থী তখন হতে ঘরবন্দি, সঙ্গে ছিল কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও। এপ্রিলের এক তারিখ হতে উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমনা পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তাও সরকারি হুকুমে বন্ধ। সরকার  অনুমতি দিয়েছে কওমি মাদ্রাসা খোলার আর তাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষা নেওয়ার। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। তারা আছে শফি হুজুরের ছায়াতলে। তাদের কাজ কারবার সব সময় আলাদা। প্রশ্ন করতে নেই। 

দেশের অর্থনীতি, কৃষি বা অন্যান্য সেবা খাত নিয়ে করোনাকালের বিপর্যয় আর এগুলোর সম্ভাব্য উদ্ধার পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হলেও দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত শিক্ষা নিয়ে তেমন একটা কার্যকর পরিকল্পনা বা ব্যবস্থার কথা শোনা যায় না। মন্ত্রণালয় শুধু ছুটি বৃদ্ধি করার ঘোষণা দিয়ে তাদের দায়িত্ব সারেন। মন্ত্রিপরিষদে সিনেমা হল বাঁচানোর জন্য প্রস্তাব উঠলেও শিক্ষা খাতে কোনও ধরনের সহায়তা বা সমস্যার কথা তেমন কেউ একটা বলেন না। এই করোনাকালে শিক্ষা খাত যে সকল সমস্যার কারণে বিপর্যস্ত সেই কারণগুলো নিয়ে কোনও মহলে তেমন একটা আলোচনা হতে দেখি না, অথচ এই খাতে যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে তা কখনও পূরণ হবে না। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, কৃষি, ভয়াবহ বন্যা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়িয়েছে, বিদেশ হতে ভালো রেমিট্যান্স এসেছে, তৈরি পোশাক শিল্প আবার তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে, দেশের অর্থ যারা বাইরে পাচার করে তাদের তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে, কিন্তু যে তালেব মাস্টার তার স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে পাড়ার দোকানে শিঙাড়া ভাজেন তার তো শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যাওয়ার তেমন একটা সম্ভাবনা দেখা যায় না, কারণ ওই স্কুল যিনি গড়ে তুলেছিলেন সেই রশিদ মুন্সি এখন দূরের একটি হাটে গরুর ব্যাপারি। কাসেম মাঝির মেয়ে কুলসুম এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বেশ প্রস্তুতি নিয়েছিল। পরীক্ষার কোনও খোঁজ খবর নেই। এর মধ্যে কুলসুমের বিয়ের জন্য একটা ঘর আসে। ছেলে ভালো। ইতালিতে একটি রেস্টুরেন্টে চাকরি করে। করোনাকালে সেখানের চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছে। পরিস্থিতি ভালো হলে আবার চলে যাবে। এমন ছেলে হাত ছাড়া করা যায় না। কুলসুমের বাবা মেয়েকে ইতালি প্রবাসী করিমুদ্দিনের হাতে তুলে দিয়েছে। সঙ্গে বহু কষ্টে মেয়ের পড়ালেখার জন্য জমানো এক লাখ টাকাও তুলে দিয়েছে। করোনাকালে জমায়েত নিষিদ্ধ। অতিথি খাওয়ানোর টাকাটা বেঁচে গিয়েছে। পাড়ার মুদি দোকানদার জামাল মিয়ার খুব শখ ছেলে আবদুর রহমানকে ডাক্তার বানানোর। ছেলে লেখাপড়ায় সব সময় ভালো। এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালোই ছিল। পরীক্ষা তো হচ্ছে না। কখন হবে তাও জানা যাচ্ছে না। একজন দালালকে ধরে আবদুর রহমানের দুবাই যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। এক সময়ের কলেজের তুখোড় ক্রিকেট খেলোয়াড় আজিজ এখন ইয়াবা কারবারি। আয় রোজগার খুব ভালো। ঠিক করেছে কলেজ খুললেও সে আর কলেজে ফিরছে না। কাজের বুয়া রহিমা। খুব কর্মঠ একজন মহিলা। একমাত্র মেয়ে খাদিজাকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছিল। স্কুল বন্ধ। খাদিজা এখন অন্যের বাড়িতে বাসন মাজে। জানতে চাইলাম বিটিভিতে ক্লাস হয় সেখানে রহিমা অংশ নেয় না? রহিমা সোজা উত্তর ‘স্যার আমাদের তো কোনও টিভি নেই’।

প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর অভাবে বন্ধ। তারা সরকার হতে কোনও আর্থিক সহায়তা পায় না। বাকি অর্ধেকের নব্বই ভাগ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পুরো মাসের বেতন দিতে পারে না। যেগুলো বন্ধ সেগুলোর বেশিরভাগই আর না খোলার সম্ভাবনা। একই অবস্থা দেশের অন্যান্য বেসরকারি স্কুল কলেজের। বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি খাতে প্রায় পঁয়ত্রিশ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে। কিছু সরকারি এমপিওভুক্ত হলেও বেশিরভাগ নিজেদের অর্থ নিজেদেরই জোগাড় করতে হয়। ছাত্র বেতন একমাত্র ভরসা। তাদের অনেকেই বাইরে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে ‘এই স্কুল ছাত্র/ছাত্রী/আসবাবপত্র ও শিক্ষক কর্মচারীসহ বিক্রি হবে’। একটি দেশের জন্য এর চেয়ে লজ্জাজনক কিছু হতে পারে না। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই সমস্যা নেই। বেতনভাতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান খোলা বন্ধের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। স্বাভাবিক সময়ে মাস্টার মশায় স্কুলে না এলেও আয় রোজগার বন্ধ হয় না। সরকারি চাকরির মজাই আলাদা।

শিক্ষার মান নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। কিন্তু গত দুই দশকে বাংলাদেশে এর বিস্তার যেকোনও উন্নয়নশীল দেশের জন্যই ঈর্ষার কারণ এবং এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি রোল মডেল, বিশেষত নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে। প্রাইমারিতে ভর্তি প্রায় একশত ভাগ। তবে প্রাইমারি লেভেলে ঝরে পড়ার সংখ্যা ছিল ১৯ হতে ২০ শতাংশ। এই করোনাকালের শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্যোগের কারণে সেই হার চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, একাধিক গবেষণা সংস্থা এমনটাই বলছে। এটি একটি ভয়াবহ চিত্র। করোনাকালের এই ক্ষতিটা পুষিয়ে ওঠা সহজ বা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভবও নয়।

আরও পড়ুন- কোভিড-১৯: আমরা কি হাল ছেড়ে দিয়েছি?

কওমি মাদ্রাসার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে সরকার, কারণ দেশে অনেক মোল্লা মৌলভি দরকার। এখান হতে বের হয়ে ‘হেলিকপ্টার হুজুর’, ‘পিস্তল হুজুর’ আর ‘বদনা হুজুর’। ভালো কথা, সমাজে এদের বেশ কদর। তবে কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে জড়িতরা বলেন তারা আলেম তৈরি করেন। সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আলিয়া মাদ্রাসাগুলো এই সুবিধা হতে বঞ্চিত, কারণ এই ব্যবস্থা হতে উঠে আসতে পারে একজন ভালোমানের চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বা প্রকৃত ইসলামি চিন্তাবিদ বা আলেম। তবে বাস্তবে এসব পেশার মানুষের সমাজে তেমন একটা কদর নেই, যেমনটি আছে হেলিকপ্টার বা বদনা হুজুরের। সচিবালয়ে গেলে দেখা যায় অনেকে পড়ালেখা করেছিলেন ডাক্তার বা আর্কিটেক্ট হতে। তাদের পেছনে পরিবার ও রাষ্ট্র অনেক অর্থ ব্যয় করেছে। তারা সেই সব বাদ দিয়ে এখন কেউ প্রশাসনের ক্যাডার, কেউ আছেন পুলিশ সার্ভিসে, কারণ ওখানে সুযোগ সুবিধা অফুরন্ত। বছর দশেক যুৎসই চাকরি করলে বিদেশে কেনা যায় সেকেন্ড হোম অথবা পরিবারকে পাঠিয়ে দেওয়া যায় কানাডার বেগম পাড়ায়। টেকনাফের একজন ওসি প্রদীপ দাশের কথা দেশের মানুষ মিডিয়ার কল্যাণে নিয়মিত জানতে পারে। বড়ই কীর্তিমান পুরুষ। তবে দেশে এমন প্রদীপ দাশ হাজার হাজার। তাদের কী হবে? কিছুই হবে না। ওসি প্রদীপের ভাগ্য খারাপ। বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি হুঁশিয়ার। যদিও আমি কোনও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নেই, তথাপি অনেকে আমার কাছে জানতে চায় করোনাকালে শিক্ষার এই যে দুরবস্থা সেখান হতে বের হওয়ার পথ।

সেদিন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য সকাল বেলা ফোন করে আমাকে ঘুম হতে উঠিয়ে জানতে চায় তাদের বিশ্ববিদ্যালয় এই করোনাকালে বহু কষ্টে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এক চতুর্থাংশ ছাত্র নিয়ে, শিক্ষকদের এক তৃতীয়াংশ বেতন দিয়ে চলছে। তাদের কাছে নাকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে চিঠি এসেছে উপ-উপাচার্য আর কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়ার জন্য। এখন তারা কী করবেন? আমার কাছে এর কোনও উত্তর নেই। বলি নির্দেশ ঠিক, তবে দেওয়ার সময়টা হয়তো বেঠিক। অনেক অভিভাবকের প্রশ্ন তাহলে কি এইচএসসি পরীক্ষাও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে সকলকে পাস ঘোষণা করা হবে? তাও আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয় বলছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পনেরো দিন সময় দিয়ে তারা পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করবে। সেদিন একটি টিভিতে আলোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলাম এই পরীক্ষা নেওয়ার একটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারে একই বিষয়ের দু’সেট প্রশ্ন করে দুই শিফটে পরীক্ষা নেওয়া। একটি হতে পারে সকাল নয়টা হতে বারটা আর একটা হতে পারে বেলা দু’টা হতে বেলা পাঁচটা। সরকারি কলেজের এক অধক্ষ্য মত দিলেন এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে বিভিন্ন স্কুলের সুবিধা ব্যবহার করে। তবে মন্ত্রণালয়কে আমার বা আমাদের প্রস্তাব শুনতে হবে তার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। মন্ত্রণালয়ে অনেক বিজ্ঞজন এই বিষয়ে চিন্তা করার জন্য আছেন।

বাংলাদেশ ২০২১ সালে একটি নতুন গন্তব্যে যাওয়া কথা। মধ্যম আয়ের দেশে তালিকাভুক্ত হওয়ার পথে ছিল। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে হয়তো আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয় কেটে উঠতে অপেক্ষা করতে হবে কয়েক বছর। এর মধ্যে হারিয়ে যাবে বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ। সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে আমি নিশ্চিত রশিদ মুন্সি আর তার স্কুল খুলবেন না।

(লেখার সব চরিত্র কাল্পনিক তবে ঘটনাগুলো সত্য )

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক
এমএ/ ২৯ আগস্ট

মুক্তমঞ্চ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে