Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২০ , ২১ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (23 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-১০-২০১৪

বিপদের নাম রাজনৈতিক দস্যুতন্ত্র

ফারুক ওয়াসিফ


বিপদের নাম রাজনৈতিক দস্যুতন্ত্র

বাংলাদেশে এখন দুই ধরনের শাসন দেখা যাচ্ছে৷ একটা রাষ্ট্রের শাসন, অন্যটা ভয়ের শাসন৷ রাষ্ট্রীয় শাসনের কেন্দ্র ঢাকায়, আর ভয়ের শাসনের চলতি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ৷ রাজধানী নড়ে না, কিন্তু ভয়ের রাজধানী আজ নারায়ণগঞ্জ, তো কাল নরসিংদী তো পরশু লক্ষ্মীপুরে সরে যাবে৷ যা সবখানেই ঘটতে পারে, তার দেশজোড়া ভিত্তি না থেকে পারে না৷ তাই শুধু নারায়ণগঞ্জকে ভয়ের জনপদ ভাবলে সংকটের বিস্তার ও গভীরতা নজরের বাইরে থেকে যাবে৷

প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারযন্ত্রের শাসন কি ভয়ের শাসনকে দমন বা শক্তিহীন করতে পারবে? পারা সম্ভব ছিল, যদি দুইকে আলাদা করতে পারতাম৷ অপহরণ ও গুম-খুনের ঘটনায় যেসব বাহিনীর নাম আসছে, তারা সবাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রীয় বাহিনী৷ শামীম ওসমান থেকে নূর হোসেনসহ অভিযুক্ত নেতারা সবাই আওয়ামী লীগের লোক৷ অভিযোগের পাহাড় থাকা সত্ত্বেও তঁাদের দায়মুক্তি পাওয়া সরকারের ইচ্ছার বাইরে ঘটছে বলে ভাবা বোকামি৷ এই অবস্থাতেই নারায়ণগঞ্জের নিহত সাতজনের অন্যতম নজরুল ইসলামের স্ত্রী সকাতরে জানতে চান, ‘আমি এখন কী করব, কোথায় যাব?’

আলোচিত সাত খুনের পেছনে বালুমহাল ও ব্যবসা দখলের কোন্দল ছিল৷ গুমের থাবা থেকে ফিরে আসা আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণের পেছনেও ভূমিগ্রাসীরা জড়িত বলে অভিযোগ৷ নরসিংদীর পৌর চেয়ারম্যান লোকমান বা নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ নূর হত্যার পেছনেও ছিল ক্ষমতার রেষারেষি৷ প্রকাশ্য খুন আর গুম-খুন মিলিয়ে তাহলে পাচ্ছি দুটি কারণ: ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তথা বিত্তের বাসনা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা তথা অবৈধ ক্ষমতার অভিলাষ৷

দৃশ্যত এই দুটি শক্তি আলাদা হলেও গত দুই দশকে ভেতরে ভেতরে একই আকার ধারণ করেছে৷ কিছু বিরল ব্যক্তিকে বাদ দিলে প্রায় সব বড় নেতাই বড় ব্যবসায়ী৷ রাজনীতি এখন দ্রুত বড়লোক হওয়ার মাধ্যম৷ অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে অস্বাভাবিক বিত্ত অর্জনে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার থেকে লোভনীয় আর কিছু নেই৷ রাজনীতির মগডাল ধরতে পারলে নামে-বেনামে ব্যাংক লুটও সহজ৷ আর আছে ভূমি গ্রাস, নদী গ্রাস, বালুমহাল গ্রাস, পরিবহন রুট দখল, মাঝারি ও খুদে ব্যবসায়ীদের থেকে লভ্যাংশ আদায়ের ব্যবস্থা৷ এভাবে অর্জিত শত-হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের ব্যবস্থাও এরা গড়ে তুলেছে৷ এরাই আবার পথের কঁাটা সরাতে সরকারি-বেসরকারি ভাড়াটে লোকজন দিয়ে হত্যা, দখল ও লুটপাট চালাচ্ছেন৷ এসব কাজের একটিও আইনের মধ্যে থেকে করা সম্ভব নয়৷

বিপজ্জনক ব্যবসা চালাতে হলে রাজনৈতিক ক্ষমতার ছাতা লাগবেই৷ এই ছাতার তলে বেআইিন উপায়ে সম্পদশালী হওয়া আর জোর-জুলুমের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতাধর হওয়াই হয়ে উঠেছে অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রধান ধারা৷ এই দুর্বৃত্ত নেতা ও লুটেরা ব্যবসায়ীরা হলো বাইবেলে কথিত দানব ইয়াজুজ ও মাজুজের মতো৷ লোকবিশ্বাস, একদিন এই দুই দানব একজোট হয়ে মানুষকে ধ্বংস করবে৷ উপকথাকে বাস্তবে অনুবাদ করলে দেখব, এসব দুর্বৃত্ত নেতা ও লুটেরা ব্যবসায়ীদের মিলনে জন্ম হয়েছে নতুন বিপদের৷ এরই নাম রাজনৈতিক দস্যুতন্ত্র৷ এই দস্যুতন্ত্রই বাংলাদেশকে খাবলে খাচ্ছে, জীবন ও সম্পদের বিরুদ্ধে খাড়া করছে হুমকি৷

একসময় অনেকেই একমত ছিলেন, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিই আমাদের এক নম্বর জাতীয় সমস্যা৷ কিন্তু এখনকার অপহরণ ও গুম-খুনকে চিরাচরিত সন্ত্রাস ও দুর্নীতির ব্যাকরণে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না৷ সন্ত্রাস ও দুর্নীতি গুরুতর সমস্যা হলেও জীবন ও অর্থনীতিবিধ্বংসী হতে পারেনি৷ সন্ত্রাস করা হয় প্রকাশ্যে, কারা করছে তা জানা যায়৷ দুর্নীতি অর্থনীতির রক্ত শুষে খায়, কিন্তু ঘাড় মটকে দেয় না৷ সন্ত্রাস ছিল হাতিয়ার, কিন্তু এখন দস্যুতন্ত্র নিজের হাতেই তুলে নিচ্ছে ক্ষমতা৷ দুর্নীতি সম্পদের একাংশ হাপিস করত, কিন্তু দস্যুতন্ত্র পুরোটাই গ্রাস কের৷

শত শত গুম-খুনের বাস্তবতা বলছে, সন্ত্রাসের চরিত্র কাঠামোগতভাবেই বদলে গেছে৷ কারণ, এগুলোর ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা চিরাচরিত সন্ত্রাস ও দুর্নীতির চেয়ে বহুগুণ বেশি৷ আগে কালা জাহাঙ্গীরদের মতো সন্ত্রাসীরা ছিল অসামাজিক৷ এখন যঁাদের দাপটে জনপদ ত্রাসিত থাকে, তঁারা সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত গণ্যমান্যজন৷ আগে দলগুলোর পুরোটাই সন্ত্রাসীদের কবজায় ছিল না৷ বলা যেত না যে দখল-লুণ্ঠনই রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য৷ এখন বলা যায়৷ কারণ, সন্ত্রাসী ক্ষমতাবিবর্তিত হয়ে ফুলে-ফেঁপে দস্যুতন্ত্র হয়ে উঠেছে৷ একে টেকাতে গেলে দরকার একচেটিয়া ক্ষমতার রাজনীতি৷ এ অবস্থায় সব প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে একচেটিয়া শাসন কায়েম করার দিকেই যাবে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি৷ রাষ্ট্রের সব অঙ্গ যখন তাদের হাতিয়ার, তখন রাজনৈতিক দস্যুতন্ত্র রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র হয়ে ওঠে৷ তখনই জন্ম হয় ভয়ের শাসনের৷ জাতীয় জীবন আজ এরই অধীন৷

এর বিরুদ্ধে দঁাড়ানো কঠিন৷ গত রোববারের প্রথম আলোর সংবাদে এক পুলিশ কর্মকর্তা পর্যন্ত বলেছেন, ‘এ নিয়ে কাজ করতে গেলে আমরাও গুম হয়ে যেতে পারি৷’ যোগাযোগমন্ত্রীও বলে ফেলেছেন, ‘এ অবস্থার দায় সরকারও এড়াতে পারে না৷’ গত কয়েক বছরে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, পুলিশসহ এমন কোনো শ্রেণী ও পেশার মানুষ নেই, যঁারা এর শিকার হননি৷ এই দস্যুতন্ত্র দেশজোড়া নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে৷ মধ্যযুগে বঙ্গদেশে কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে বারো ভূঁইয়া নামের বারোটি ক্ষমতাবান পরিবারের উদয় হয়েছিল৷ এখন এলাকায় এলাকায় এ রকম দাপুটে পরিবারের তাপজ্বালা শিশুও টের পায়৷

এই নব্য জমিদারদের পেছনে আছে অন্ধ দলবাজদের সমর্থন৷ বিনিময়ে তারা কোনো না কোনোভাবে খাতির-সুবিধা পান৷ অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটা অংশ ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিসে’র মজা পেয়ে গেছে৷ তাদের অনেকেও হয়ে উঠেছে খুন-অপহরণের ঠিকাদার৷ প্রথম আলোর সংবাদে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এএসএম শাহজাহান তাই বলেন, ‘কাউকে দিয়ে একটি অপরাধ করালে সে নিজের লাভের জন্য আরও ১০টি অপরাধ করবে৷’ বিরোধীদের দমনের জন্য যাদের লাগাম ছাড়া হয়েছে, লাগাম টেনে ধরে তাদের দিয়ে দস্যুতন্ত্রকে মোকাবিলা করা তাই সরকারের জন্য কঠিন৷

এ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সঙ্গে নির্বাচন না হওয়াও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত৷ নির্বাচনের মতো নির্বাচন হলে রাজনীতিকদের জনগণের সামনে যেতে হতো৷ সন্ত্রাস ও লুটপাটের আয়োজন কমাতে হতো৷ রাজনীতিবিদেরা যখন জবাবদিহির মুখে থাকেন, তখন প্রশাসনও রয়েসয়ে চলে৷ নির্বাচন হচ্ছে বানের পানির মতো, তা সাময়িকভাবে ময়লা-আবর্জনা ভাসিয়ে নেয়, ক্ষমতার দৌরাত্ম্য কমায়৷ কিন্তু কেউ যখন ভোটারবিহীন তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকে, তখন তাকে সব কায়েমি শক্তির সঙ্গে আপস করে বা তাদের দিয়ে-থুয়ে চলতে হয়৷ সামরিক ও রাজনৈতিক—দুই শাসনামলেই আমরা তেমনটা দেখেছি৷

ওই উপকথা অনুসারে, ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ জুলকারনাইন ইয়াজুজ ও মাজুজকে দেয়ালবন্দী করে রেখেছিলেন৷ সত্যিকার গণতান্ত্রিক শাসন হলো সেই নিরাপত্তা দেয়াল৷ যদি গণতান্ত্রিক রাজনীতি না থাকে, গণমাধ্যম ও সমাজ সাহস ও স্বাধীনতা হারিয়ে ফেললে মানবতা রক্ষার বঁাধও ভেঙে পড়ে৷ স্বৈরতান্ত্রিক ইয়াজুজ আর লুটেরা মাজুজ তখন দেশকে ধ্বংসলীলার অভয়ারণ্য বানাতে পারে৷ এভাবেই কায়েম হয় কাঠামোগত দস্যুতন্ত্র৷ বাংলাদেশে কি তাই ঘটছে না?

আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়া অথবা রাজনৈতিক অস্থিরতা দিয়ে এর ভয়াবহতা পরিমাপ করা যাবে না৷ শত শত মানুষ খুন হলেও, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বাড়াবাড়ি হলেও দেশ ধ্বংস হয় না৷ দেশ ধ্বংস হয় যখন নীতি ও নেতৃত্ব ধ্বংস হয়৷ সেটা হয় তখনই, যখন অশুভ ক্ষমতা ও মাফিয়া অর্থনীতি মাৎস্যন্যায় কায়েম করে৷ এ রকম দশায় বড় ক্ষমতা ছোট ক্ষমতাকে গিলে ফেলে৷ আমরা এখন সেই অবস্থাই পার করছি৷ বিভিন্ন স্থানে জনতা দস্যুতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধ্যমতো প্রতিবাদ করছেন; এইটুকুই আশা৷

শৈশবে শেখানো হয়, ভয় না পাওয়া হলো বড় হওয়ার লক্ষণ৷ দেশের ছোট-বড় সবাই এখন ভীত; সামষ্টিক বিপদের ব্যক্তিগত সমাধান হয় না৷ স্বাভাবিক মাত্রার অপরাধ পুলিশের বিষয়, আদালতে বিচারের বিষয়৷ কিন্তু অপরাধ মহামারি হয়ে উঠলে সমাজবিজ্ঞানী-রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের খুঁজতে হয় বিপর্যয়ের কারণ৷ যখন রাজনীতিবিদেরাও ভরসা হারান, তখন জনগণের আরও ঘন হয়ে বসে আলোচনা করা উচিত, এই ভয় মোকািবলার উপায় কী? আমাদের বিপদের সুরাহা নিজেরাই করতে পারছি না কেন?

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে