Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২৭ মে, ২০২০ , ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.7/5 (70 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১৭-২০১৪

একালের শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ

শাহেদীন মালিক


একালের শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ

এটা সর্বজনবিদিত যে যারা ‘রাজনীতি করে’, তাদের চরম প্রাপ্তি হলো ‘ক্ষমতায় যাওয়া’। এবং ‘যাওয়া’র পর ক্ষমতায় ‘থাকা’। ক্ষমতা যাওয়া-থাকাই হলো রাজনীতির মূল কথা। অবশ্য তর্কের খাতিরে ধরে নিতে পারি যে শুধু ক্ষমতার জন্যই রাজনীতি না, ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের কল্যাণের জন্য দেশ-জাতির ভালোর চেষ্টা করাও রাজনীতি। অতীতে আদর্শবাদী সময়ে এমন ধারণাই প্রচলিত ছিল যে জনগণের কল্যাণের জন্যই ক্ষমতায় যাওয়া। অবশ্য ওসব পুরোনো দিনের কথা। এখন দিনকাল পাল্টেছে।
এ দেশে রাজনীতিবিদেরা রাজনীতি করে জনগণের সমর্থনে ক্ষমতায় যাবেন—এটাই একমাত্র ফর্মুলা না। এ দেশে ক্ষমতায় আসা এবং ক্ষমতা ব্যবহারের ফর্মুলা অনেক। যেমন: রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, জীবনে কখনো চোঙ্গা ফুঁকে রাজনীতির স্লোগান দেননি, দেয়ালে চিকা মারেননি, আগের রাতে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বা চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা, সকালে বঙ্গবন্ধুকে মেরে বিকেলে বঙ্গভবনে বসে হুংকার দিলেন আমরা এখন রাষ্ট্রের ক্ষমতায়, হয়েও গেলেন রাষ্ট্রের ক্ষমতার মালিক। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডে যে সেনা কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের সবাই সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন না। তাই বলছিলাম, এ দেশে ক্ষমতায় যেতে হলে সেনাবাহিনীতে যে কর্মরত থাকতে হবে, এমন না। এরপর ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে আরেক দল সেনাকর্মকর্তা এসে আগের দলকে বলেন, আপনারা বিদেয় হন, এখন আমরা। তিন-চার দিনে অনেক খুনখারাবি হলো। জাতীয় রাজনৈতিক নেতা, সেনাপতি, সেনা কর্মকর্তাসহ নিহত হলেন অনেকেই।
খুনখারাবি শেষে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ আরেক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। প্রধান সম্বল সবার একটাই—বন্দুক-কামান-ট্যাংক ইত্যাদি এবং এসব 
সমরাস্ত্র, বলা বাহুল্য, নিজ দেশেরই নেতা, সেনা কর্মকর্তা, সেনাসদস্য, সাধারণ নাগরিক সবার বিরুদ্ধে নির্বিচারে ব্যবহারে বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করা। অর্থাৎ, রাজনীতি করা বা রাজনীতিবিদ হওয়ার দরকার নেই। বন্দুক থাকলে আর স্বগোত্রীয়কে নির্দ্বিধায় গুলি করতে পারলে ক্ষমতায় আসা যায়।
অবশ্য বন্দুক যে সব সময় ব্যবহার করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। যেমন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ গোলাগুলি না করেই ক্ষমতায় আরোহণ করলেন। অবশ্য গোলাগুলি, হত্যা, তারপর লোক-দেখানো বিচার ফাঁসি, বিচারবহির্ভূত হত্যা (যেমন মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে) ইত্যাদি পূর্ববর্তী আট-নয় মাসে ঘটানো হলো।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তিন মাস কম নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন। অবশ্য মাঝে, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮-তে দু-দুটো ৫ জানুয়ারি মার্কা নির্বাচন দিয়েছিলেন। আর তাই বুঝি এরশাদ জননেত্রী অতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এত প্রিয়—এখন অতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। বন্দুক ও ভোটাভুটি ছাড়াই যাঁরা এ দেশে বহুবার ক্ষমতায় গেছেন, তাঁরা হলেন জাঁদরেল আমলা। সামরিক শাসনামলে তাঁদের প্রচণ্ড ডিমান্ড থাকে। আবার সামরিক শাসন শেষ হয়ে গেলেও ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় থাকার যে অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়ে থাকে, তা পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে জেতা রাজনৈতিক সরকারের মধ্যমণি হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার বা থাকার জন্য কাজে লাগানো যায়। আবুল মাল আবদুল মুহিত আমলা থেকে এরশাদের মন্ত্রী হলেন এবং এখন গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রী।
রাজনীতির সঙ্গে বিশেষ কোনো সম্পর্ক ছাড়াই ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকা তৃতীয় গ্রুপটা হলো আইনজীবী-চিকিৎসক এবং তাঁদের সঙ্গে ছিটেফোটা স্থান পাওয়া অন্য কিছু পেশাজীবী। বলা বাহুল্য, গান্ধী-নেহরু-সোহরাওয়ার্দী-শেরেবাংলার মতো বহু রাজনীতিবিদ-আইনজীবী এ দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁরা ছিলেন রাজনীতিবিদ আর সেই সঙ্গে জড়িত ছিলেন আইন পেশায়ও। সেসব আইনজীবী না, কথা হচ্ছে সেসব আইনজীবীকে নিয়ে, যাঁদের রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, অথচ হঠাৎ হঠাৎ মন্ত্রীরূপে আবির্ভূত হন। ফলে সকালে শুনি এক কথা, বিকেলে আরেক কথা তাঁদের মুখ থেকে। আর বর্তমানে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে কথা তো অন্তহীন। রাজনীতিবিদ না হয়ে আইনজীবী হওয়ার সুবাদে ক্ষমতায় যে থাকা যায়, অনায়াসেই তার আরেক ধরনের উদাহরণ হলো: সরকার আসে-যায়, ক্ষমতায় আসীন রাজনীতিক বদলায়। কিন্তু বিশেষ বিশেষ আইনজীবী প্রায় সর্বদাই ক্ষমতায়। অর্থাৎ, প্রায় সর্বদা সরকারি দল।
আরেক দল, যাঁরা রাজনীতি না করে স্রেফ অন্য আরেকটা ‘গুণ’-এর কারণে ক্ষমতার মধ্যমণি থেকে শুরু করে আশপাশে আনাচকানাচে সর্বত্র বিতরণ করেছেন, অর্থাৎ ফুল মিনিস্টার, হাফ মিনিস্টার, কোয়ার্টার মিনিস্টার অথবা টাকা, আধুলি, সিকিসহ সব পদেই যত্রতত্র আছেন, তাঁরা হলেন ব্যবসায়ী। বলা বাহুল্য, এ গোত্রের উৎপাত বা প্রভাব-প্রতিপত্তি অন্য সব প্রজাতির তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি।
২.
অবশ্য ক্ষমতায় যাওয়া-থাকার পারদর্শিতার মাপকাঠিতে, অধমের নিরিখে, সর্বাগ্রে আমলাকুল। কারণও স্পষ্ট। ক্ষমতায় থাকার অনেক আগে থেকে, ধরেন উপসচিব পর্যায়ের পদ থেকে, এমনকি তার আগে ইউএনও পর্যায়ে উপজেলা চেয়ারম্যান, স্থানীয় সাংসদ ইত্যাদিকে ম্যানেজ করে করে যে বিদ্যা-অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়, সেটা কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার চেয়ারে বসতেই তাঁরা আজকাল বেশি সাফল্য ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করছেন।
কিছুকাল আগের রানা প্লাজা ধসে পড়ার ঘটনায় ‘ঝাঁকি-তত্ত্বের’ প্রবক্তা আমলার কথাই ধরা যাক। তিন দশকেরও আগে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘খাল কাটা’ উদ্যোগের যে মহান উদ্যোক্তা-আমলা, যাঁর ছবি অনেক কয়টি পাওয়া যাবে বিভিন্ন পত্রিকায়, সেই আমলে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় খাল কাটাকাটির ‘ফটো সেশনে’, পরবর্তী সময়ে আমলা হিসেবেই আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনে প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। তারপর বলা বাহুল্য, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং আবারও মন্ত্রী। বলা বাহুল্য, তিনি ২০০৭-০৮-এর সরকার আমলে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। সাময়িক অসুবিধা হয়েছিল। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েও শেষ মুহূর্তে ‘চেম্বার জজ’-এর কাছ থেকে ‘স্টে-অর্ডার’ পেয়ে নির্বাচন করতে পেরেছিলেন। দুর্নীতির সাজার বিরুদ্ধে আপিল-মামলায় হাইকোর্ট বললেন, না না, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সাক্ষ্য দেওয়া সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য না। ভাবখানা—সরকারি কর্মকর্তারা আবার সত্যি কথা বলে নাকি! অতএব খালাস। দুদক আপিল করল। আপিল বিভাগও বললেন একই কথা। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপারে সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষ্য পক্ষপাতদুষ্ট।
তারপর যেহেতু দুর্নীতি থেকে খালাস, সেহেতু নির্বাচনের সময় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে থাকলেও নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা নেই। কয়েকটি অন্য মামলার মতো এই মামলার রায় এখনো পাইনি। সেটা বড় কথা না, বড় কথা হলো রাজনীতিবিদদের মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর গতি আর কিছু থাকে না। কিন্তু আমলা-মন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব গেলেও সময় থাকতেই ব্যাংক-বিশ্ববিদ্যালয় সবই ‘পাওয়া’ হয়ে যায়। অতএব, নো চিন্তা, ডু ফুর্তি।

৩.
বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদের কথায় আসার আগে আরেক ‘ক্ষমতাধর’ গোত্রের কথা না বললেই নয়। এরা হলো ‘সুশীল সমাজের প্রতিনিধি’। অতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেই সরকারের বদৌলতে এবং তার আগে ১৯৯০-এর এরশাদ পতনের আন্দোলনের পরবর্তী বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কল্যাণে বহু ‘সুশীল’ উপদেষ্টা হিসেবে ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিলেন। অতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁদের সবার কৃতজ্ঞ হওয়ার কথা, কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁরই সৃষ্টি। তবে ‘সুশীল’দের আর চান্স নেই। যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর নেই। অবশ্য কেন জানি ক্ষমতাসীন মহলে ‘সুশীল’দের নিয়ে উৎকণ্ঠার অভাব নেই, যার প্রতিফলন ঘটে সুশীলেরা অকাতরে, অহরহ যেভাবে গালমন্দের ভাগীদার হন তাতে।
রাজা-উজির মেরে এখন আসল কথায় আসি। এইচ টি ইমাম সাহেব স্পষ্ট করেছেন, কীভাবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল জয় সম্ভব হয়েছে। ছাত্রলীগের এক সমাবেশে (প্রথম আলো, ১৪ নভেম্বর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘নির্বাচনী অনিয়ম খোলাসা করলেন এইচ টি ইমাম’ শিরোনামের খবরে এবং ১৩ নভেম্বর রাতে একাধিক চ্যানেলে টক শোতে আলোচিত হয়েছে) তিনি বলেছেন, মূল কথা যেটা, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যাঁরা পাঁড় ছাত্রলীগ, সেসব কর্মকর্তাকে নির্বাচনী ‘ডিউটি’ দেওয়ার কারণেই বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। ছাত্রলীগ থেকে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ এবং নির্বাচন পরিচালনায় সরকারি দায়িত্ব তাঁদের দেওয়া—এটাই ‘উইনিং ফর্মুলা’। নির্বাচনে জয়ের এই মোক্ষম দাওয়াই যে শুধু আবিষ্কারই করেননি, তা প্রয়োগ করে ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছেন, তিনিই সবচেয়ে সফল রাজনীতিবিদ।
মূলে বা গোড়ায় হলো অভিজ্ঞতা। হাজার হলেও তিন দশকেরও বেশি আগে ১৫ আগস্ট-পরবর্তী খন্দকার মোশতাকের সরকারের ক্যাবিনেট সচিব ছিলেন। বলা বাহুল্য, খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর স্থলাভিষিক্ত হলেও বেশিদিন ক্ষমতায় টিকতে পারেননি। খন্দকার মোশতাকের সরকারের ক্যাবিনেট সচিব হিসেবে লব্ধ অভিজ্ঞতা এখন কাজে লাগাচ্ছেন।
দু-একজন বাদ দিয়ে অতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রায় সব উপদেষ্টাই সাবেক আমলা। অর্থ, পররাষ্ট্রসহ আরও বিভিন্ন মন্ত্রীও সাবেক আমলা।
দেশে বর্তমানে এবং অতীতে ভালো আমলার অভাব হয়নি। যেমন অভাব হয়নি ভালো সেনা কর্মকর্তার, আইনজীবী-চিকিৎসকের অথবা ব্যবসায়ী আর বুদ্ধিজীবীদের। কিন্তু যখন সরকারের জনসমর্থন থাকে না বা ক্রমাগতভাবে কমে যায়, তখন সব সময় জনসমর্থনহীন সরকারগুলো নির্ভরশীল হয়ে পড়ে কুবুদ্ধির আমলা, নীতিহীন সামরিক কর্মকর্তা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের ওপর।
ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘দ্য রেস্ট ইজ হিস্ট্রি’।
শাহদীন মালিক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে