Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.5/5 (20 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২৬-২০১৪

‘পার্টিয়ার্কি’: দলের কবলে দেশ

আসিফ নজরুল


গণতন্ত্রের সংকট থাকে, রাজনৈতিক দলেও থাকে। যেমন: যুক্তরাষ্ট্রে সংকট হচ্ছে আইনসভা আর প্রেসিডেন্টের দ্বন্দ্ব, ইউরোপে অর্থনৈতিক সংস্কার সাধনে প্রচলিত গণতন্ত্রের ধীরগতি বা ভারতে আঞ্চলিকতাবাদ ইত্যাদি। কিন্তু পার্টিয়ার্কি যেখানে প্রবলভাবে বিরাজ করে, সেখানে গণতন্ত্র ও মুক্তসমাজ দূরের কথা, পার্টি বা রাজনৈতিক দলই সে অর্থে আর থাকে না। রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠে কিছু ব্যক্তি ও তাদের অনুগত গোষ্ঠী কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার হাতিয়ার।

‘পার্টিয়ার্কি’: দলের কবলে দেশ

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আমার প্রিয় একজন রাজনীতিক। বিরোধী দলের সাংসদ হলে তা কতটা অর্থবহ করা যায়, এর প্রমাণ তিনি বহুবার রেখেছেন, সরকারি দলে থেকেও কখনো কখনো সরকারের জন্য ওয়াচডগ হওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক এবং সরকার ও জনগণের অন্তঃসম্পর্ক তিনি কতটা গভীরভাবে বুঝতেন তার অকাট্য ছাপ রেখেছেন সেই ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সংবিধান প্রণয়নকালে। রাজনৈতিক দলের ভেতরও গণতন্ত্র কতটা প্রয়োজন তাঁর মতো প্রাজ্ঞ রাজনীতিক ভালো করেই বোঝেন তা। কিন্তু এই প্রজ্ঞা তাঁর জন্য কাল হয়েছে। সংস্কারবাদী ছাপের বহু মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে কিছুটা দলের ভেতর গণতন্ত্রায়ণ চাওয়ার ‘অপরাধে’, পরে কিছুটা নিজের ভুলে।
২০ ডিসেম্বর ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (বিআইজিডি) একটি আলোচনা সভায় তাঁকে পাওয়া গেল মঞ্চে। এই আলোচনার আয়োজন করা হয় প্রতিষ্ঠানটির স্টেট অব গভর্নেন্স বাংলাদেশ ২০১৩ নামক গবেষণাকর্মটির প্রকাশনা উপলক্ষে। এই প্রকাশনার এবারের বিষয়বস্তু গণতন্ত্র, রাজনৈতিক দল ও রাজনীতি। এ দেশে প্রধান দুটো দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার দুর্দশা এবং এর প্রভাব নিয়ে এই প্রকাশনাটির আলোচনায় সুরঞ্জিতের চেয়ে প্রাসঙ্গিক মানুষ কমই হতে পারেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য শুনে মনে হলো, দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার বেহাল নিয়ে আলোচনার সাহস তাঁরও নেই আর। না থাকাই স্বাভাবিক অবশ্য। এক-এগারোর প্রত্যাশাগুলোর অপমৃত্যু বাংলাদেশের বহু ক্ষতি করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো দলের ভেতর ভিন্নমত চর্চার সাহস আরও সংকুচিত হয়েছে এবং প্রধান দুই নেত্রীর একচ্ছত্র আধিপত্য দলে আরও পাকাপোক্ত হয়েছে।
বিআইজিডির গবেষণাকর্ম অবশ্য দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার ওপর সীমাবদ্ধ নয়। এতে ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করার ভয়াবহ প্রবণতার (‘পার্টিয়ার্কি’) ওপর গভীর পর্যালোচনা রয়েছে। এই প্রবণতার এমন জুতসই নাম ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির ওপর এক লেখায় ১৯৯৪ সালেই ব্যবহার করেছিলেন মাইকেল কোপেজ। তবে বাংলাদেশের কোনো বড় গবেষণাকর্মে এর ব্যবহার সম্ভবত এই প্রথম।
পার্টিয়ার্কির মানে কী? আমরা যেটাকে রাজনীতিকীকরণ বা দলবাজি বলি, তার কোনোটাই পার্টিয়ার্কির জুতসই প্রতিশব্দ নয়, বড়জোর কাছাকাছি প্রতিশব্দ। পার্টিয়ার্কির বাংলা আসলে আমাদের প্রয়োজন নেই, ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যেভাবে রাষ্ট্র এবং এর সব সুযোগ, সম্পদ ও সামর্থ্যকে গ্রাস করে, সেটাই পার্টিয়ার্কি। পার্টিয়ার্কি সংসদ, বিচার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পুলিশসহ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সামর্থ্য ও সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে, এমনকি সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বশীভূত করে। এটি আইনের শাসন ও মানবাধিকার বিপন্ন করে। উন্নয়ন সম্ভাবনা ও সম্পদের সুষম বণ্টনকে প্রবলভাবে বাধাগ্রস্ত করে। বিচ্ছিন্নভাবে এগুলো আমাদের অনেকেরই জানা বিষয়। কিন্তু বিআইজিডির গবেষণা এটিকে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিকভাবে প্রামাণ্য করে তুলছে নব্বই-পরবর্তী দেশের প্রধান দুটো দলের শাসনকাল এবং শাসনপদ্ধতিকে পর্যালোচনা করে।
গবেষণা প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দল যেহেতু মূল প্রতিপাদ্য বিষয়, তাই এতে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসপ্রবণতার সঙ্গে পার্টিয়ার্কি দৃষ্টিভঙ্গির যোগসূত্রও আলোচিত হয়েছে। আলোচিত হয়েছে রাজনৈতিক দল ও সংসদে ফৌজদারি ও আর্থিক অপরাধে অভিযুক্ত ফড়িয়া-ব্যবসায়ী শ্রেণির অনুপ্রবেশ, রাজনীতি ও সংসদে নারীর স্বল্প প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো। এই গবেষণাকর্মের মূল অবদান এসব অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়, বরং এসব অনুসিদ্ধান্ত তত্ত্ব, তথ্য, জরিপ ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করার মধ্যে।

২.
বিআইজিডির গবেষণাকর্মে কয়েক দশকের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও রাজনৈতিক অনুন্নয়নের অন্তর্নিহিত কারণগুলো অনুসন্ধান করা হয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার তাত্ত্বিক কাঠামো অনুসারে। ২০১১ সালে ফুকুয়ামা রাজনৈতিক উন্নয়নের তিনটি পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত উপাদান চিহ্নিত করেন। এগুলো হচ্ছে রাষ্ট্র গঠন, যেখানে রাষ্ট্রের একটি দলনিরপেক্ষ চরিত্র থাকবে, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও আইনের শাসন। গবেষণাকর্মে এই তিনটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের পশ্চাৎপদতার পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর এসব সমালোচনা করা হলে তাদের (বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের) একটি তৈরি জবাব আছে বাংলাদেশে। তা হলো দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতা থাকলে অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন সূচকে দেশ এত এগোল কীভাবে? আমার ধারণা, এর জবাব বহুভাবে ইতিপূর্বে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এবং সিপিডির বিভিন্ন গবেষণায় আমরা দেখেছি। বিআইজিডির গবেষণায়ও একই উত্তর রয়েছে। সোজা কথায় এর উত্তর হচ্ছে, প্রবৃদ্ধিগতভাবে দেশের যেখানে ১০ শতাংশ এগিয়ে যাওয়ার কথা, সুশাসন ও গণতন্ত্রের ব্যর্থতার জন্য সেখানে এগোনো যাচ্ছে ৬ থেকে ৭ শতাংশ। বাকি সম্পদ দুর্নীতি, দলীয়করণ, কুশাসন ও সম্পদ পাচারের মাধ্যমে কুক্ষিগত হচ্ছে সমাজের একটি অতি ক্ষুদ্র কিন্তু অতি ক্ষমতাবানদের হাতে। অর্থাৎ প্রবাসী, পোশাকশ্রমিক, কৃষক আর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের রক্ত জল করা পরিশ্রমে গড়ে ওঠা দেশের সম্পদ ও সম্ভাবনার একটি বড় অংশ অন্যায়ভাবে দখল করছে দেশেরই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভোগী ক্ষমতাসীন মহল। বাংলাদেশের কোনো আইন বা সংবিধানে এটি অনুমোদিত নয়।
লুটপাটের রাজনীতি প্রতিরোধ করতে সংবিধান ও আইনি কাঠামো বরং আইনের শাসনের ওপর জোর দিয়েছে এবং সংসদ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করেছে। এগুলো হচ্ছে ফরমাল ইনস্টিটিউশন অব অ্যাকাউন্টিবিলিটি। এর বাইরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করার জন্য রয়েছে সংগঠিত নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম আর পেশাজীবী সংগঠনের মতো বিভিন্ন ইনফরমাল প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পার্টিয়ার্কি এসব প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে ফেললে আইনের শাসন আর থাকে না, জবাবদিহির প্রতিষ্ঠানগুলোও আর কাজ করতে পারে না। বিআইজিডির গবেষণাকর্মে এই বাস্তবতাকে আরও প্রামাণ্যভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
পাির্টয়ার্কি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী এবং বহুত্ববাদে বিশ্বাসী বিরোধী রাজনৈতিক দল। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলেরও এমন ট্র্যাক রেকর্ড থাকলে ক্ষমতাসীনের পার্টিয়ার্কি দূষিত ধরনের হলেও একপ্রকার গ্রহণযোগ্যতা অনেকের কাছে পেয়ে যায়। এই হতাশাজনক পরিস্থিতির বিপরীতে একটি প্রভাবশালী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে সংগঠিত নাগরিক সমাজ, যাকে আমরা এ দেশে সুশীল সমাজ নামে অভিহিত করে থাকি। বিআইজিডির গবেষণাকর্ম বলছে, এই সুশীল সমাজের শক্তি, প্রভাব ও সক্ষমতা ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে।

৩.
বিআইজিডির গবেষণা রাজনীতির সংকট এবং এ থেকে উত্তরণের তাগিদ সৃষ্টি করে। উত্তরণের জন্য উদার রাজনৈতিক মনোবৃত্তি, দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিরোধী দল ও সব ধরনের সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্ত করা, দল পরিচালনা ও দলে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আর্থিক স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রের স্বার্থে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এগুলো করবে কে, কীভাবেই বা করবে? ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর আমরা গণতন্ত্রের এক নতুন সংকটকালে উপনীত হয়েছি। এই অদ্ভুত গণতন্ত্রে ভোটারদের তেমন কোনো ভূমিকা নেই, বিরোধী দল বলে আসলে কিছু নেই, ভিন্নমতের প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই।
গণতন্ত্রের সংকট থাকে, রাজনৈতিক দলেও থাকে। যেমন: যুক্তরাষ্ট্রে সংকট হচ্ছে আইনসভা আর প্রেসিডেন্টের দ্বন্দ্ব, ইউরোপে অর্থনৈতিক সংস্কার সাধনে প্রচলিত গণতন্ত্রের ধীরগতি বা ভারতে আঞ্চলিকতাবাদ ইত্যাদি। কিন্তু পার্টিয়ার্কি যেখানে প্রবলভাবে বিরাজ করে, সেখানে গণতন্ত্র ও মুক্তসমাজ দূরের কথা, পার্টি বা রাজনৈতিক দলই সে অর্থে আর থাকে না। রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠে কিছু ব্যক্তি ও তাদের অনুগত গোষ্ঠী কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার হাতিয়ার।
এমন পরিস্থিতি আমাদের এখানে বহু বছর ধরে জেঁকে বসছে। কয়েক দশকের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা যা কিছু অর্জন করেছি তা এতে বিপন্ন হতে পারে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবাধিকার, মুক্ত মননশীলতা, বহুত্ববাদ, সুষম উন্নয়ন বহু কিছু বিপন্ন হয়েছেও ইতিমধ্যে। বিআইজিডির গবেষণাকর্মে রাষ্ট্রে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দলের ভেতর গণতন্ত্র, যৌথ নেতৃত্ব এবং মুক্তচিন্তা চর্চার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের মোড়কে পার্টিয়ার্কির তাণ্ডব ঠেকাতে শক্তিশালী, সংগঠিত ও জোরালো নাগরিক সমাজের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই তাগিদ যথেষ্টভাবে নাগরিক সমাজ অনুভব করছে কি?


আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে