Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০ , ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.6/5 (57 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-০৮-২০১৫

নভেরা কী অভিমানে আর দেশে ফেরেননি?

আলী রীয়াজ


পাবলিক লাইব্রেরির আঙ্গিনায়, তার চারপাশে অযত্নে বেড়ে ওঠা ঘাসকে জঙ্গল বলা যাবে না বটে, কিন্ত বাগান বলাও ঠিক নয়। পাবলিক লাইব্রেরির সেই অযত্নে বেড়ে ওঠা ঘাস-লতা-পাতার মধ্যে আমরা আবিষ্কার করলাম বিভিন্ন আকারের ভাস্কর্য। তখন আমাদের একটা বড় সময় কাটে লাইব্রেরির আশেপাশে। আকর্ষণ লাইব্রেরির বই যতটা তারচেয়ে বেশি আড্ডা। সম্ভবত রুদ্র প্রথম এই নিয়ে উৎসাহী হয়ে পড়ে যে, এগুলো এখানে কোথা থেকে আসলো। সবাই মিলে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলাম এগুলোর অধিকাংশই সম্ভবত নভেরা আহমেদের কাজ।

নভেরা কী অভিমানে আর দেশে ফেরেননি?

নভেরা আহমেদের মৃত্যু সংবাদ জানতে পাই ফেসবুকে বন্ধুদের স্ট্যাটাসে। কৃতবিদ্য ভাস্কর নভেরা আহমেদের সঙ্গে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি। কিন্ত এই সংবাদে তাঁর কাজকে ঘিরে আমার ও আমার বন্ধুদের যেসব স্মৃতি রয়েছে সেগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তার সঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে আরো কিছু কথা মনের ভেতরে তাদের উপস্থিতির জানান দেয়।

নভেরা আহমেদ নামটির সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে ১৯৭৬-৭৭ সালে। আমাদের মানে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, জাফর ওয়াজেদ, কামাল চৌধুরী, শাহজাদি আঞ্জুমান আরা মুক্তি, বদরুল হুদা সেলিম, রেজা সেলিম, তুষার দাশ এবং অন্যরা। রুদ্র, কামাল, জাফর, মুক্তি, তুষারসহ অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াই। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি আর পাবলিক লাইব্রেরি তখন কার্যত একই ভবনের এদিক সেদিক।

পাবলিক লাইব্রেরির আঙ্গিনায়, তার চারপাশে অযত্নে বেড়ে ওঠা ঘাসকে জঙ্গল বলা যাবে না বটে, কিন্ত বাগান বলাও ঠিক নয়। পাবলিক লাইব্রেরির সেই অযত্নে বেড়ে ওঠা ঘাস-লতা-পাতার মধ্যে আমরা আবিষ্কার করলাম বিভিন্ন আকারের ভাস্কর্য। তখন আমাদের একটা বড় সময় কাটে লাইব্রেরির আশেপাশে। আকর্ষণ লাইব্রেরির বই যতটা তারচেয়ে বেশি আড্ডা। সম্ভবত রুদ্র প্রথম এই নিয়ে উৎসাহী হয়ে পড়ে যে, এগুলো এখানে কোথা থেকে আসলো। সবাই মিলে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলাম এগুলোর অধিকাংশই সম্ভবত নভেরা আহমেদের কাজ।

যতদূর মনে করতে পারি এই নিয়ে পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটির কাজটার অধিকাংশই করেছিলো জাফর। শহীদ মিনারের ভাস্কর হিশেবে হামিদুর রহমানের নাম তখন যতটা জানতাম, নভেরা আহমেদের নাম ততোটা নয়। তবে এই নাম একেবারে অজানা ছিল এমনও নয়। কিন্ত নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যের আশেপাশে আমাদের সময় কাটে এমন কখনও ভাবিনি। এগুলোকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে একত্র করার একটা অভিযানেও আমরা নিলাম। কিন্ত তাতে বাদ সাধলেন লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ। এগুলো নাড়াচাড়া না করার ‘পরামর্শ’ জানাতে ভুললেন না, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের অফিস থেকে লোক ধরে এনে দেখাতে হয়েছে কোথায় কীভাবে এগুলো আছে। ‘জিনিশগুলো’ কোথায় তা না জানা থাকলেও তার মালিকানা যে তাঁদের সেটা তাঁরা জানতেন এবং এগুলো নাড়াচাড়া করে ‘না ভাঙার’ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল আমাদের।

আমরা এই নিয়ে একটা প্রদর্শনী করবার কথাও ভেবেছিলাম, কিন্ত জানলাম এর সবগুলো নভেরার করা কাজ তাও নিশ্চিত নয়। সম্ভবত ১৯৬০ সালের কোনো এক সময়ে অনুষ্ঠিত একটি বড় ধরণের প্রদর্শনীর পর এই শিল্পকর্মগুলো পাবলিক লাইব্রেরিতে আনা হয়েছিল বলে আমরা শুনতে পাই। (অনেক পরে জানতে পারি আসলে এখানেই নভেরার কাজের প্রদর্শনী হয়েছিল এবং কিছু কাজ প্রদর্শনী হলের বাইরে ইচ্ছে করেই রাখা হয়েছিল, যা পরে আর সরানো হয়নি)।

পরের বছরে আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হই, তখন অব্দি আমরা এই নিয়ে উৎসাহিত থাকি এবং আমাদের শিল্প-সমালোচক বন্ধু মঈনুদ্দিন খালেদের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। কিন্ত এই নিয়ে আর বেশি দূর এগুনো যায়নি। তবে এতটুকু কাজ হয়েছিল ভেবে আমার আনন্দিত হয়েছিলাম যে, এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষিত হয়েছে। আমাদের এটি ছিল স্বান্তনা মাত্র; কাজ আসলে কিছু হয়েছিল বলে মনে হয় না। কিন্ত আমরা লক্ষ্য করি নভেরা আহমেদ এবং তাঁর কাজ নিয়ে অনেকের উৎসাহ তৈরি হয়েছে।

তারপরের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সবার জানা। নভেরার মৃত্যুর খবরে আমার যেমন এই কথাগুলো মনে হয়েছে, তেমনি মনে হয়েছে সেই পুরনো প্রশ্ন– নভেরা কী অভিমানে আর দেশে ফেরেননি? নাকি অনেক প্রবাসী মানুষের জীবনে যেমন দেশ ছাড়ার অনেক কারণ থাকে তেমনি সব কারণেই নভেরার আর দেশে ফেরা হয়নি?

শামসুদ্দিন আবুল কালামের কথা মনে পড়ে। রোমে তাঁর মৃত্যুর খবর ঢাকায় পৌঁছেছিল তাঁর মৃত্যুর বেশ কয়েক দিন পরে। সেটা ১৯৯৭ সাল। ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা প্রবাহ এই শক্তিশালী লেখকের ঠিকানা তৈরি করেছিল প্রবাসে, অন্তত তাই সকলের অনুমান। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ মারা যান প্রবাসে, অকস্মাৎ ১৯৭১ সালে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অবসর গ্রহণের পর সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ দেশে না ফিরে প্রবাসের জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন। সুরাইয়া খানম দেশ ছেড়ে এরিজোনার ধুসর মরুভূমিকে বেছে নিয়েছিলেন সেটা কি পেশার টানে নাকি অন্য কোনো বেদনায়? পেশা, শিল্পের প্রতি ভালোবাসা, পারিবারিক তাগিদ, ব্যক্তিগত পছন্দ, বন্ধুদের সাহচার্য এইসব অনেক কারণে কিংবা অভিমান, নির্ভেজাল অভিমান, থেকে স্বদেশের টান ছিন্ন করেন অনেকে। আনন্দে করেন, বেদনায় করেন। কিন্ত ছিন্ন তো হয়। নভেরা আহমেদের যে গুটিকয় ছবি দেখা যায় তাতে কী এই সব প্রশ্নের উত্তর আছে? তাঁর সেই সব ছবি, তাঁর দীর্ঘ নিরবতা তাঁকে ঘিরে গড়ে তুলেছে রহস্যময়তার আলোছায়া।

সেটা স্বেচ্ছা-তৈরি বা নাকি তাঁর প্রকৃতি-জাত? নভেরা আহমেদের মৃত্যুর খবর শুনে ভাবি- এইসব প্রশ্নের উত্তর নভেরা আহমেদ দেননি; দিলেও যে কিছু বদলে যেত তা মনে হয় না। কিন্ত তারপরেও ...

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে