Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০ , ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (69 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-১৫-২০১৫

সজীব ওয়াজেদ, জাফর ইকবাল এবং ‘স্পর্শকাতর’ ব্লগার ইস্যু

আনিস আলমগীর


বাস্তবতা অনুধাবন করে রাজনীতিবিদ হিসেবে শেখ হাসিনা বা সজীব ওয়াজেদ জয় যদি প্রকাশ্যে শোক প্রকাশ না করেন, এটাকে স্পর্শকাতর ইস্যু বলেন- জাফর ইকবাল বা অন্যদের নিন্দা করা বা ভিন্ন অর্থ খোঁজার কারণ দেখি না। আজকের দুনিয়ার বাস্তবতা থেকে আমাদের চোখ ফিরিয়ে নিলে হবে না। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোয়, যেখানে ধর্ম পালন বাধা ছিল সব তো উঠে যাচ্ছে একের পর এক। সর্বশেষ আমরা দেখলাম, কিউবার প্রেসিডেন্ট রাহুল ক্যাস্ট্রোও পোপকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন চার্চে যাবেন বলে!

সজীব ওয়াজেদ, জাফর ইকবাল এবং ‘স্পর্শকাতর’ ব্লগার ইস্যু

‘রঙ্গিলা রাসুল’। এই নামে ১৯৩৫ সালে কলকাতা থেকে জনৈক দীনেশ ভট্ট একটি বই লিখেন। প্রকাশের পরই তোলপাড় শুরু হয় চারদিকে। মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ চলতে থাকে। আন্দোলন-মিছিল নিত্য ঘটনা। একদিন মিছিল যাচ্ছিল সোনাগাছির বিখ্যাত নিষিদ্ধ পল্লীর পাশ দিয়ে। পতিতালয়ের এক পাঠান দারোয়ান মিছিলের কারণ জানতে চাইল তাদের কাছে। এই অবাঙালিকে বলা হলো- মুসলমানদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (স.)-কে কটাক্ষ করে একজন হিন্দু বই লিখেছেন- তার প্রতিবাদে এই মিছিল। অল্প দিনের মধ্যেই উপর্যুপরি ছুরির আঘাতে খুন হন দীনেশ ভট্ট। তাকে হত্যা করে আর কেউ নয়, সোনাগাজী পতিতালয়ের সেই দায়োয়ান।

দেখুন, সারাদিন যিনি বেশ্যাদের পাহারা দিতেন, তারও ধর্মানুভূতি এতই প্রখর যে, ধর্মের কারণে সে মানুষ খুন করতে দ্বিধা করেনি। নিজে ধর্ম পালন করে কি না সেটা বড় নয়, ধর্মানূভূতিতে টইটুম্বুর।

নাইন-ইলাভেন-এ যুক্তরাষ্ট্রের যে বিমানগুলো টুইন টাওয়ার, পেন্টাগনে হামলা করেছিল বা যেটি হোয়াইট হাউসে হামলায় ব্যর্থ হয়েছিল, তার সব পাইলট ছিলেন মুসলমান এবং বিমান হামলার আগের রাতেও তারা ভোদকা, রামসহ বিভিন্ন মদ খেয়েছিলেন। ঘটনার আগের কয়েক মাস ধরে তারা আমেরিকার বিভিন্ন শহরে নাইট ক্লাবে গেছেন তার প্রমাণ রেখে গেছেন। এমনকি বিভিন্ন সময় তারা ন্যুড ক্লাবে গিয়েও সেবা নিয়েছেন।

এখানেও ব্যক্তির ধর্ম পালনের সঙ্গে ধর্মানুভূতির সম্পর্ক দেখছি না। ধর্মানুভূতিতে আঘাত শুধু মুসলমানদের লাগে তাও নয়, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু, ইহুদি- সব ধর্মের লোকেরই সমান লাগে। কার যে কখন লাগে তার গ্যারান্টি নেই। ফলে স্বীকার করতে হবে, ধর্ম আসলেই সেনসেটিভ বিষয়।

কাহিনি দুটো বললাম ধর্মের স্পর্শকাতরতা বোঝাতে। সম্প্রতি ব্লগার অভিজিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে রয়টার্সের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে এবং তার তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় যে বক্তব্য রেখেছেন, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। তিনি বাংলাদেশে ব্লগার হত্যার ঘটনাকে একটি স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। দেশের আরেক বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ, লেখক ও স্বাধীন চিন্তার মানুষ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রধানমন্ত্রীর ছেলের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেছেন, জয়ের মন্তব্যের কারণে মৌলবাদীরা উৎসাহিত হয়েছে। ব্লগার হত্যা ইস্যুকে জয় যদি স্পর্শকাতর বলে থাকেন ভুল কোথায় বলেছেন- যেখানে শুধু ব্লগার নয় তাদের সমর্থকদেরও ট্যাগ করা হচ্ছে ধর্মদ্রোহী এবং নাস্তিক হিসেবে, নাকি জাফর ইকবালের কথায় সত্যতা আছে?

দুজনের বক্তব্য বিশ্লেষণের আগে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব, জয়ের মন্তব্যে আসলে কী ছিল সে বিষয়ে। দেখাতে চাই, জয়ের সে বক্তব্যকে কতটা বিকৃত করা হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সব পত্র-পত্রিকা, অনলাইনে। সে কারণে রয়টার্স পরিবেশিত সংবাদটিতে সজীব ওয়াজেদের যেটুকু অংশ ছিল তার পুরোটা নিচে পাঠকদের কাছে তুলে ধরছি।

In an interview, Sajeeb Wazed, the son of Bangladesh Prime Minister Sheikh Hasina, said his mother offered private condolences to Roy’s father. But the political situation in Bangladesh is too volatile for her to comment publicly, he said. Roy was an avowed atheist; the book he was promoting when he was killed is titled ‘The Virus of Faith.’

‘‘We are walking a fine line here,’ said Wazed, an informal consultant for the ruling party, the Awami League. ‘We don’t want to be seen as atheists. It doesn’t change our core beliefs. We believe in secularism,” he said. “But given that our opposition party plays that religion card against us relentlessly, we can’t come out strongly for him. It’s about perception, not about reality.”

এর বাংলা করলে দাঁড়ায়- ‘এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ বলেছেন, তার মা অভিজিতের বাবাকে ব্যক্তিগতভাবে শোক প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এতটাই ‍অস্থির যে তার (প্রধানমন্ত্রীর) পক্ষে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা সম্ভব না।’

রিপোর্টে এর পরের লাইনটি হচ্ছে ‘অভিজিৎ একজন নাস্তিক ছিলেন এটা নিশ্চিত। তিনি যে সময়ে খুন হন তখন তিনি ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ নামের একটি বইয়ের প্রচারে ছিলেন।’ এটি জয়ের মন্তব্য নয়। রিপোর্টারের দেওয়া তথ্য। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক অনলাইন পোর্টাল এবং দৈনিক পত্রিকা এটিকে জয়ের বক্তব্য বলে প্রচার করেছে। অনেকে এটাকে এমনভাবে বিকৃত অনুবাদ করেছেন এবং হেডলাইন দিয়েছেন- তাতে মনে হতে পারে সজীব ওয়াজেদ ব্লগার অভিজিতের মৃত্যুকে ন্যায্য বলতে চাচ্ছেন, যেহেতু সে নাস্তিক।

কেউ কেউ পরের প্যারাটিও সঠিকভাবে অনুবাদ করেননি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইন বাদ দিয়েছেন। We are walking a fine line here- এ লাইনটির আক্ষরিক অনুবাদ হয় না; তবে ভাবানুবাদ হচ্ছে ‘আমরা একটা চিকন রশির ওপর দিয়ে হাঁটছি।’ জয়ের বক্তব্য অনুধাবনে এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে এটি অত্যন্ত দরকারি কথা। রয়টার্সও এটাকে সাব হেড করেছে তাদের রিপোর্টে। কিন্তু প্রায় সবার অনুবাদে এটি নেই।

এর পরের কথাগুলো মোটামুটি ঠিক আছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনানুষ্ঠানিক পরামর্শক বলেন, ‘আমরা নাস্তিক হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। এটা আমাদের মৌলিক বিশ্বাসের পরিবর্তন নয়। আমরা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি। কিন্তু এটা দিয়ে আমাদের বিরোধী রাজনৈতিক দল আমাদের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে ধর্মের কার্ড খেলে। আমরা অভিজিতের হত্যার বিষয়ে প্রকাশ্যে শক্ত অবস্থান নেইনি এটা বাস্তবতা নয়, কেবল ধারণা।’

জয়ের বক্তব্যের বিকৃত অনুবাদে কিছুলোক মনে করতে পারেন ব্লগারদের হত্যা করলে সরকার চুপ করে থাকবে। আবার ড. জাফর ইকবালের মতো যারা অসাস্প্রদায়িক এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা করছেন, তারা জয়ের বক্তব্যের মূল বিষয়টা অনুধাবনের সুযোগ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হতে পারেন।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ১২ মে ২০১৫, যেদিন ঢাকার কাগজে অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড নিয়ে রয়টার্সের সঙ্গে তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়, যেখানে সজীব ওয়াজেদের আলোচিত মন্তব্যও সংযোজিত হয়েছে, সেদিনই সকাল বেলায় সিলেট শহরে বাসার পাশে খুন হন আরেক ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ। অভিজিতের মুক্তমনা ব্লগে লেখালেখি করতেন অনন্তও।

মিডিয়ার প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকাণ্ডের জন্য সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করার পাশাপাশি সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য মৌলবাদীদের উৎসাহিত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন। অনন্তকে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যার একদিন পর তার প্রতিবাদে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে ওই মন্তব্য করেন তিনি।

জাফর ইকবাল বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডকে স্পর্শকাতর বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় যে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন, তা মৌলবাদীদের জন্য একটা গ্রিন সিগনাল। ‘মনে হচ্ছে, তোমরা (জঙ্গিরা) এভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাও, সরকার কিছুই করবে না। একজন একজন করে মারা হবে, সরকার কোনও কথা বলবে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ছেলে যা বলেছেন, তা মানতে আমি রাজি না। আমি তীব্রভাবে এর প্রতিবাদ জানাই। এদেশে প্রত্যেকটা মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তাদের মেরে ফেললে তা সেনসিটিভ ব্যাপার হয় না।’

ড. জাফর ইকবালের বক্তব্য পড়লেই বোঝা যাবে, এটা হয়তো সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যের ‘বিটুইন দ্য লাইন’ না বোঝার ফল, নয়তো বিকৃত অনুবাদের একটা প্রভাব পড়েছে তার মধ্যে। আমার ধারণা দ্বিতীয়টাই সত্য। কারণ জাফর ইকবাল বর্তমান সময়ে একজন অত্যন্ত সন্মানিত, স্বাধীন মত প্রকাশকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যালেন্সড এবং সেন্সিবল পার্সন। জয়ের বক্তব্য যে খুনিদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে নয়- তিনি না বোঝার কথা নয়। অবশ্য তিনি যদি অরিজিনাল ভার্সন দেখেই এই মন্তব্য করে থাকেন তাহলে বিষয়টা ভিন্ন।

সেক্ষেত্রে বলতে হচ্ছে, একজন রাজনীতিবিদ আর একজন সমাজ চিন্তকের ভাবনা, বিশেষ কোনও ঘটনার বিশ্লেষণ এবং সমাধানের চিন্তা এক রকম হবে না। এমনকি একটি ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদ ও একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ মধ্যেও পার্থক্য থাকবে, আছে। রাজনীতিবিদ বাস্তবতার নিরিখে সমস্যাকে দেখেন এবং সমাধানের পথ খোঁজেন।  তিনি সমাজ বাস্তবতাকে অনুধাবন করেন এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষা করেন। কিন্তু সমাজ চিন্তকের সেটার প্রয়োজন নেই। তিনি সমস্যাটির জরুরি সমাধানের পরামর্শ দেন। সরকারে কে আছে সেটাও তার দেখার বিষয় নয। নাস্তিকতার ট্যাগ লাগানোর বিষয়টা চিন্তাবিদের পক্ষে যতটা ধুয়ে নেওয়া সম্ভব রাজনীতিবিদের পক্ষে ততটা সম্ভব নয়। সে কারণে জয়কে চিন্তা করতে হয়, নাস্তিক হিসেবে পরিচিত হওয়ার ভীতি নিয়ে। আবার তাদের আদর্শ যে ধর্মনিরপেক্ষতা সেটা তিনি ভোলেন না এবং তাদের বিরোধীরা যে ধর্ম কার্ড নিয়ে খেলছেন সেটাও মাথায় রাখেন।

জয়ের কথা যে অমুলক নয় সেটা তো বিগত গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকালেই প্রমাণিত হয়েছে। যে চত্বরে লোকে লোকারণ্য ছিল সেটা জনশূন্য হয়ে গেল ব্লগার রাজীব হত্যার এক সপ্তার মধ্যে, বিরোধীদের ধর্ম কার্ডের চালের ফলে। চাপাতির কোপে নিহত রাজীবের মৃত্যুতে যে প্রধানমন্ত্রী শোক জানিয়েছিলেন, শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে তাদের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন- সে প্রধানমন্ত্রীকে কি পিছু হটতে হয়নি শাহবাগের প্রজন্মকে জামায়াত-বিএনপি নাস্তিক আখ্যা দানের ফলে? কিছু ব্লগারদের ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ড কি জামায়াত-বিএনপি-হেফাজতের প্রচারণায় সমস্ত ব্লগারদের ঢালাওভাবে নাস্তিক ট্যাগ দিতে সহায়তা করেনি? তারা শেখ হাসিনার সরকারকে নাস্তিক-তোষক আখ্যা দেয়নি? এখনও কি সে প্রচারণা বন্ধ আছে? বিরোধী দল কি একবারও এ ধরনের হত্যাকাণ্ডগুলোর নিন্দা করেছে?

সুতরাং বাস্তবতা অনুধাবন করে রাজনীতিবিদ হিসেবে শেখ হাসিনা বা সজীব ওয়াজেদ জয় যদি প্রকাশ্যে শোক প্রকাশ না করেন, এটাকে স্পর্শকাতর ইস্যু বলেন- জাফর ইকবাল বা অন্যদের নিন্দা করা বা ভিন্ন অর্থ খোঁজার কারণ দেখি না। আজকের দুনিয়ার বাস্তবতা থেকে আমাদের চোখ ফিরিয়ে নিলে হবে না। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোয়, যেখানে ধর্ম পালন বাধা ছিল সব তো উঠে যাচ্ছে একের পর এক। সর্বশেষ আমরা দেখলাম, কিউবার প্রেসিডেন্ট রাহুল ক্যাস্ট্রোও পোপকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন চার্চে যাবেন বলে!

আমাদের দেখতে হবে চাপাতিয়াওলা খুনির সংখ্যা বিস্তারে রাষ্ট্রেরও পৃষ্ঠপোষকতা আছে কি না। যেকোনও নাগরিকের হত্যাকাণ্ডে- সে আস্তিক হোক, নাস্তিক হোক, সরকারি দলের হোক, বিরোধী দলের হোক বা দলহীন হোক- রাষ্ট্রের দায়িত্ব সুবিচার নিশ্চিত করা। খুনিদের ধরা। যে কোনও হত্যায় রাষ্ট্র নিশ্চুপ থাকতে পারে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে অকারণে হত্যা বাড়বেই। সন্দেহ নেই এ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হচ্ছে। যারা ধর্মের বিরুদ্ধে লিখছেন, সেটা আমরা পছন্দ নাও করতে পারি। কিন্তু এর জন্য কাউকে ব্যক্তি বিশেষ বা সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী হত্যা করবে, রাষ্ট্র নীরব থাকবে- তা সমর্থন যোগ্য নয়। যেখানে রাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থায় এসব ব্যক্তিকে সাজা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে সেখানে চাপাতিওয়ালাদের কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমেও এর বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টিতে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে।

অন্যদিকে, ড. জাফর ইকবালসহ প্রগতিশীল সব মহলকে বর্তমান সমস্যার সমাধানে নতুন করে ভাবতে হবে। সমস্যা সমাধানে সরকারের যেমন সিংহভাগ দায়িত্ব আছে তেমনি বিরোধী দলের ইন্ধনের বিরুদ্ধেও জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব আছে। সবচেয়ে বড় কথা যারা নাস্তিকতার ট্যাগ পাচ্ছেন বা ট্যাগ পাওয়ার মতো কাজ করছেন-  তাদেরও সতর্ক করতে হবে। মুক্তচিন্তা মানে নবী-রাসুল বিভিন্ন ধর্ম প্রতিষ্ঠাতাদের গালাগালি নয়। এটা কোনওদিন মুক্তচিন্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে না।

আমাদের অনেকের রাজনৈতিক জীবনে মহাত্মা গান্ধী, নেহরু, জিন্নাহ, বঙ্গবন্ধুর মতো বড় বড় নেতারা যেমন স্থান করে নিয়েছেন তেমনি ধর্মীয় জীবনে পথ প্রদর্শকের স্থান নিয়েছেন পয়গম্বর দেব-দেবিরা। মুহাম্মদ (স.), যীশু,  বুদ্ধ, রাম, কৃষ্ণ, সীতা- এরা এত শক্তিশালী এবং সনাতন সেখানে কতিপয় ব্লগারের গালাগালি প্রতিহিংসার পরিবেশ তৈরি ছাড়া কিছুই করতে পারবে না। আমরা সব ধরনের সংস্কার আন্দোলন করতে পারি, যুক্তি দিতে পারি কিন্তু অনুভূতিতে আঘাত কেন? আমাদের দর্শন চিন্তায় যুক্তি প্রদর্শনের চাইতে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতারা, তাদের ব্যক্তিচরিত্র নিয়ে কটাক্ষটা প্রাধান্য পাচ্ছে কেন? মুক্তচিন্তার কথা বলে আমরা গুটিকয় লোক কি সংখ্যাগরিষ্ট লোকের বিশ্বাসে অন্তরায় সৃষ্টি করছি? কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসে আমাকে আঘাত দেওয়ার আগে তার প্রতিক্রিয়ার কথা কি আমরা ভাবছি?

প্রশ্ন আসতে পারে ধর্ম নিয়ে নাস্তিকদের এতো মাথাব্যাথা কেন- যেখানে তাকে অন্তত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি ধর্ম পালন করতে বাধ্য করছে না। আস্তিকরা ধর্ম রক্ষায় তৎপর হতেই পারে। তাদের কোনও-কোনও উন্মাদ নাস্তিকের বিরুদ্ধে শুধু লেগে আছে তা নয়, স্বর্গে যাওয়ার আশায় নাস্তিকদের খুনও করছে। কিন্তু নাস্তিকদের তো কোনও ধর্ম নেই, স্বর্গ নরকেরও মাথা ব্যাথা নেই। আজ তাদের কর্মকাণ্ডে কেন মনে হচ্ছে নাস্তিকতাও একটা ধর্ম। সে ধর্মের অনুসারী বাড়াতে তারা অন্যের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর আঘাত করাকে ফ্যাশন হিসেবে নিয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক
anisalamgir@gmail.com

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে