Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০ , ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.8/5 (71 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-১৩-২০১৫

খালেদা জিয়ার ‘জার্নি টু কেনোসা’

আনিস আলমগীর


দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারে গিয়ে কে কত বড় ধার্মিক, কত বেশি মাদ্রাসা আর মোল্লা সৃষ্টি করতে পারে- এই প্রতিযোগিতায় যেমন ব্যস্ত থাকে, তেমনি ব্যস্ত মিলিটারিকে কে কত বেশি সুবিধা দিতে পারে সেটা নিয়েও। সব কিছুতে আওয়ামী লীগ- বিএনপি একে অন্যের দোষ খুঁজে পায় কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় তারা একে অপরকে দোষারোপও করে না। দোষ পায় না। এবার এই তালিকায় যুক্ত হলো ভারততোষণ। আশঙ্কা করছি- এখন থেকে মোল্লা, মিলিটারি আর মোদিকে তুষ্ট করার প্রতিশ্রুতি আর প্রতিযোগিতা চলবে এই দুদলের মধ্যেই।

খালেদা জিয়ার ‘জার্নি টু কেনোসা’

২০১২ সালের অক্টোবরে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে যখন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নতুন দিল্লি সফর করেন, তখন ঢাকার একটা দৈনিকে কলাম লিখেছিলাম এই শিরোনামে- খালেদা জিয়ার ভারত সফর: ‘জার্নি টু কেনোসা’।

কি আশ্চর্য! এবার ভারত সফর নয়, খালেদা জিয়ার নিজ দেশে সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদির সঙ্গে তার সাক্ষাতের আগে-পরে খালেদা জিয়া ও বিএনপির নেতা-নেত্রীদের কর্মকাণ্ড দেখে সেই শিরোনামকেই মনে পড়ছে বারবার। মনে হচ্ছে হেডলাইনটা এখনকার জন্যই বরং পারফেক্ট।

তার আগে যারা ইতিহাসের খবর কম রাখেন, তাদের জন্য কেনোসা কাহিনিটি বলে নেই।

‘জার্নি টু কেনোসা’। বাংলায় বললে ‘কেনোসা যাত্রা’। উপমাটি এসেছে ১০৭০ সালে রোমান সম্রাট চতুর্থ হেনরির নগ্ন পায়ে সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে পোপ সপ্তম জর্জের কাছে মাফ চাইতে যাওয়ার ঘটনা থেকে। পোপ রুষ্ঠ হয়েছিলেন সম্রাটের ওপর, ধর্মচ্যুত করার মতো সাজা দেওয়া হয়েছিল তাকে। তখন পোপের দরবার ছিল, আজকের ভ্যাটিকান সিটি নয়, ইটালির কেনোসায়। সম্রাট জানুয়ারির তীব্র শীতের মধ্যে পোপের সঙ্গে দলবল নিয়ে দেখা করতে বাধ্য হন শুধু তা নয়, ধর্মচ্যুতির সাজা মাফের জন্য পোপের দুর্গের দরজার বাইরে টানা তিন রাত তিন দিন প্রচণ্ড শীলাপাতপূর্ণ ঝড়ের মধ্যে নগ্নপায়ে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতেও বাধ্য হয়েছিলেন।

এরপর যুগে-যুগে ভুল স্বীকার করে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের যেসব বৈঠক হয়েছে বা দুই শক্তি এক হতে বাধ্য হয়েছে, সেসব ঘটনাকে তুলনা করা হয় ‘জার্নি টু কেনোসা’র সঙ্গে। এডলফ হিটলার নিজেও একবার এক জাতীয়তাবাদী জার্মান নেতার সঙ্গে তার বৈঠককে তুলনা করেছেন ‘জার্নি টু কেনোসা’ বলে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে দেখলে ৭ জুন ২০১৫ হোটেল সোনারগাঁওয়ে ভারতের একজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতবিদ্বেষী বাংলাদেশি নেত্রী খালেদা জিয়ার এই বৈঠককেও তুলনা করা যায়— ‘হোলি হোস্ট’-এর দরবারে খালেদা জিয়ার ‘জার্নি টু কেনোসা’; অনুতপ্ত আর অনুশোচনা প্রকাশের মাধ্যমে মাফ চাওয়ার এক ঐতিহাসিক সফর হিসেবে।

দুর্ভাগ্য হচ্ছে হিটলারের মতো খালেদা জিয়ার সে সত্য স্বীকার করার সাহস নেই। ২০১২ সালের দিল্লি সফরে খালেদা জিয়াকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়েছিল ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার। বড়ই চালাক ভারতীয় আমলারা। বাংলাদেশের বিগত সাধারণ নির্বাচনের আগে-আগে এরশাদ এবং খালেদা জিয়াকে ভারত সফরে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কংগ্রেস সরকার। রাজনীতির গতি-প্রকৃতি পরিমাপ করে ভারত ভালোভাবে টের পেয়েছিল তাদের বন্ধুভাবাপন্ন শক্তি আওয়ামী লীগ হয়তো আগামীতে বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসবে না। সুতরাং অবন্ধুদের সঙ্গে আগে থেকেই বোঝাপড়া, তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাখা ভালো— যেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার থেকে যে নিঃস্বার্থ সেবা পাওয়া যাচ্ছিল ক্ষমতা বদলের সঙ্গে তাতে চিড় না ধরে।

ভারতের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল, বাংলাদেশের মাটি ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা ব্যবহৃত হওয়া আর বাংলাদেশে পাকিস্তানি জঙ্গিদের উত্পাদন বৃদ্ধি। সফরকালে দুদেশের মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে— ক্ষমতায় গেলে এসব বন্ধ হবে বলে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন বেগম জিয়া।

কিন্তু কিসে থেকে কী হলো জানি না। সম্ভবত ‘আমার দেশ’ পত্রিকার কথিত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ জামায়াত-বিএনপি ঘেঁষা বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনায় খালেদা জিয়া বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এর যুক্তি হিসেবে আমি মাহমুদুর রহমানের পত্রিকার সে সময়ে খালেদা জিয়ার সফরের বিরোধিতা করে তীব্র ভাষায় সংবাদ ও কলাম প্রকাশ, খালেদা জিয়াকে নিয়ে মাহমুদুরের ফোনালাপ ফাঁসের কথাবার্তা স্মরণ করতে অনুরোধ করব পাঠকদের। তার পরের ঘটনা সবারই জানা। চার মাস পরেই ঢাকায় আসেন কংগ্রেস নেতা, বাংলাদেশের বন্ধু, ’৭৫ পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয়দাতাদের অন্যতম বাঙালি, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। ভারতের রাষ্ট্রপতির সফরকালে জামায়াত রাজধানীতে হরতাল ডাকে, সোনারগাঁও হোটেলের আশপাশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় তারা।  হরতালের অজুহাতে খালেদা জিয়া তার সঙ্গে প্রণব মুখার্জির নির্ধারিত সাক্ষাৎকার বাতিল করেন। রাজনীতির সব দৃশ্যপট উল্টে যায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদি ঢাকা সফর করেন ৬-৭ জুন। আমার খুব ইচ্ছে ছিল মোদির সফরে বাংলাদেশ কী কী অর্জন করল, সেসব নিয়ে লিখব। সেই ’৪৭-এর দেশভাগ থেকে অন্যদেশে বন্দি ছিটমহলবাসীর আনন্দ নিয়ে লিখব। দুদেশের ১৬২টি ছিটমহলের ৬০ হাজার মানুষের আনন্দ-বেদনার ঘটনা নিয়ে কিছু বলব। যদিও সফরের আগেই সীমান্ত চুক্তি নিয়ে সব ঠিকঠাক হয়ে আছে, তবু এই সফরে দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের উলটপালট করা ঘটনা। পারস্পরিক আত্মবিশ্বাসের বন্ধনে দুদেশের নতুন এক যাত্রার ঘটনা। দুদেশ তাদের ৬৫ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণায় যাকে বলছে- ‘ Notun Projonmo- Nayi Disha’ বা ‘নতুন প্রজন্ম, নতুন দিশা’।

শেখ হাসিনাকে আত্মবিশ্বাসটা মোদি দিতে পেরেছেন বলে আদায় করে নিয়েছেন- ট্রানজিট বলি আর কানেকটিভিটি বলি- সেভেন সিস্টারের লোকদের জন্য যুগান্তকারী সুবিধা। ওরা এখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সড়ক পথে যেতে পারবে তাদের মূল ভূখণ্ডে মাত্র একদিনে, আগে যেখানে লাগতো তিন দিনের মতো। ওরা বাংলাদেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রামকে ব্যবহার করতে পারবে।  মংলা বন্দরকে ব্যবহার করতে পারবে পশ্চিমবঙ্গ। দুই বন্দর দিয়ে কলকাতার বন্দরের মালামাল আসবে-যাবে। মোট কথা রেল-সড়ক-পানি কোনও পথেই আর বাংলাদেশ-ভারতের যোগাযোগের বাধা রইল না। মাঝখানে এই সুবিধায় যোগ হলো, দুদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল ও ভুটান। এখন বাকি আছে অবকাঠামো উন্নয়ন।

স্মরণীয় বিষয় হচ্ছে এই সুবিধাগুলোর অনেটাই দেশ ভাগের আগে ব্রিটিশ আমলে চালু ছিল। কিছু বন্ধ হয়েছে ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে, কিছু বন্ধু হয়েছে ’৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের মাধ্যমে। বাকিটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার কয়েক মাস আগে দিল্লি গিয়ে নরেদ্র মোদিকে বলে এসেছেন ভারতের পূর্ব সীমান্তের সাতটি রাজ্যের যদি তিনি উন্নয়ন চান, মোদি যেন বাংলাদেশের সহযোগিতা কামনা করেন। বাংলাদেশের সহযোগিতা ছাড়া সাত রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব নয়। মোদি তার সফরের মূল ফোকাস সেখানেই রেখেছেন। মানিক সরকার দলীয় কাজে ব্যস্ততার জন্য মোদির সঙ্গে আসতে পারেননি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছেন। আরও ভালো হতো মোদি যদি আমাদের সীমান্তবর্তী মিজোরাম, আসাম, মেঘালয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদেরও একসঙ্গে ঢাকায় নিয়ে আসতেন।

যাক, মোদির সফরের এসব বিষয়ে বিস্তারিত লিখতে গিয়েও আমি লিখতে পারিনি। যতই অপেক্ষা করেছি লিখব লিখব- মাথা থেকে সরানো যায়নি টিভিতে দেখা খালেদা জিয়ার ছবি। টিভি সাংবাদিকরা ওইদিন সেই দুপুর থেকে বলে যাচ্ছিলেন গুলশানের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়ার সোনারগাঁও হোটেল যাত্রার প্রতি মিনিটের কাহিনি। এ যেন সম্রাট হেনরির Speyer থেকে Canossa যাত্রাপথের বিবরণ। মোদির সাক্ষাতের ডাক পড়ার জন্য সোনারগাঁও হোটেল আঙিনায় ঘণ্টা ধরে খালেদা জিয়ার গাড়িতে বসে থাকা যেন সম্রাট হেনরির তিন দিন তিন রাত পোপের দুর্গের দরজায় ভেতর থেকে ডাক পড়ার অপেক্ষা।

অবশেষে তাদের দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে। খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে বাজারের ফর্দের মতো একটা লিস্টও ধরিয়ে দিয়ে এসেছেন মোদির হাতে। মনে পড়ে ২০০০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ঢাকা সফরকালে এই সোনারগাঁও হোটেলে তার সঙ্গে সাক্ষা‍ৎকালেও এমন একটা নালিশের লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে এসেছিলেন খালেদা জিয়া।

আমি জানি না, এর মধ্যে একজন জাতীয়তাবাদী নেত্রীর কী গৌরবের দিক আছে! খালেদা জিয়ার অনুসারীরা মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠকের জন্য কেন পাগল হয়ে গিয়েছিলেন, সেটি অনুধাবন করাও কঠিন। যারা একদিন খালেদা জিয়াকে ভারতের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, শুনেছি সেই ‘আমার দেশ’ সংশ্লিষ্ট কথিত বুদ্ধিজীবীরা এবার পাগল হয়ে মোদির সঙ্গে বৈঠকের তারিখ ঠিক করতে নতুন দিল্লি সফর করেছেন। বিজেপি কার্যালয় আর সাউথ ব্লকে ধরনা দিয়েছেন। আত্মমর্যাদা হারালে কী হয়- এই  দলটি মোদির সঙ্গে বৈঠকের জন্য যা করেছে তাতেই বুঝা যায়। যতটা নিচে এরা নিজেরা নেমেছে, খালেদা জিয়াকে নামিয়েছে এবং বাংলাদেশকে নামিয়েছে তার চেয়ে বেশি।

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী। বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতার জন্য তাকে হিসাবে নেওয়া, কব্জায় নেওয়া মোদি সরকারের গরজ ছিল। কিন্তু বিএনপির দেউলিয়াত্বের কারণে ভারত সেই বৈঠকটি নিয়ে আচ্ছামতো খেলেছে। দিনক্ষণ ঝুলিয়ে রেখেছিল। বিএনপি নেতারা নাকে খত দিয়ে বলার মতো জাতির কাছে মিথ্যাচার করে বলেছে, তারা ভারতবিরোধী রাজনীতি করে না। অথচ তাদের রাজনীতির ভিত্তিই হচ্ছে ভারতবিরোধিতা, আওয়ামী লীগবিরোধিতা এবং পাকিস্তানপ্রীতি। তাদের যারা সমর্থন করে তারাও সে কারণেই করেন। বৈঠকটি ঝুলিয়ে রেখে, বৈঠক হবে না ধারণা দিয়ে ভারত বিএনপির আহাজারি আর ক্ষমতায় আসতে ভারতের কতটা পূজা করতে হবে, তারই শিক্ষা দিতে চেয়েছে। বিএনপি তার রাজনীতি ছেড়ে সেই ফাঁদে পড়েছিল। ফলে আমরা দেখেছি, বৈঠক হবে না এমন একটি মিথ্যা খবরে তাদের সে-কি বেহায়া আহাজারি- কেন মোদি ‘ম্যাডামের’ সঙ্গে বসবেন না! আমাদের তো আর ক্ষমতায় আসা হচ্ছে না-রে! যেন মোদির কাছেই ছিল খালেদার জন্য ক্ষমতার গদি!

খালেদার সঙ্গে মোদির বৈঠক নিয়ে মোদি সরকার হাসিনা সরকারের সঙ্গেও খেলেছে। সফরের আগে যখন চুক্তিগুলো চূড়ান্ত হচ্ছে তারা বাংলাদেশ সরকারকে ধারণা দিয়েছিল, খালেদার সঙ্গে বৈঠক হবে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল তারা- যার কারণে তিনি মিডিয়ায় বলেছেন মোদির সঙ্গে খালেদার বৈঠক হবে না। কিন্তু সব কিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের কথা ঘোষণা করেছে ভারত। এই বৈঠকটিও খালেদা জিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ছিল না। কারণ বিজেপি-ভারত ভালো করেই জানে, বিএনপি যতই ভারতবিরোধিতা করেনি বলুক, ভারতবিরোধী নই বলে জপের মালা জপুক- তাদের বিশ্বাস করা যায় না। বিএনপি সেই দল, যারা ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেয় ক্ষমতায় এলে। এরা সেই দল, যারা ভারতবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ট্রাকে ট্রাকে অস্ত্র আমদানিতে সহযোগিতা করে- দেশটির স্থিতিশীলতা নষ্টের উদ্দেশ্যে।

যারা মোদির সফরের দিকে নজর রেখেছেন, তাদের কেউই বলবেন না বৈঠকটিকে ভারতীয় পক্ষ তেমন গুরুত্ব দিয়েছে। আসলে খালেদা-মোদি বৈঠকটি ছিল সরকার থেকে সুবিধা আদায়ের জন্য ভারতের এক ধরনের কূটনৈতিক চাল। চাপ দেওয়ার খেলা। তিস্তার কথাকে বাংলাদেশের সরকারি এবং বিরোধী দলের মাথা থেকে সরিয়ে দেওয়া। যে বাংলাদেশ মনমোহনের সফরকালে ‘নো তিস্তা নো ট্রানজিট’ নীতিতে ছিল, এবার মোদির চালে তারাই সব কিছুতে ভারতের সুরে সুর মিলিয়েছে। এই সুর মিলানোকে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছেন খালেদা জিয়া এবং তার দল- মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের দরখাস্ত আর আহাজারির মাধ্যমে।

মোদির কাছ থেকে তিস্তার এক বিন্দু পানি নেওয়ারও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। বরং কায়দা করে মোদি তিস্তার সঙ্গে ফেনী নদীকে ট্যাগ করেছেন। পুরো বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষই জানে না, ফেনী নদীর পানি মানে বাংলাদেশের পাওয়া পানি উঠিয়ে নিয়ে ত্রিপুরায় চাষাবাদ করা। অথচ এই ফেনী-মুহুরী নদীর পানির যদি ঘাটতি হয় অকেজো হয়ে পড়বে মুহুরী সেচ প্রকল্প।

আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা বিষয় পজেটিভলি নিচ্ছি যে, খালেদা জিয়া তাদের অন্ধভাবে ভারতবিরোধিতার রাজনীতি থেকে সরে এসেছেন। কারণ এ যুগের ছেলেমেয়েরা পার্বত্য শান্তিচুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলুধ্বনী শোনা যাবে- এসবে বিশ্বাস করার আগে নিজেরাও ভাবে। ইন্টারনেটে চেক করে নিতে পারে। তবে মোদি এবং ভারতের কাছে খালেদা জিয়ার এই ধরনা ধরা, এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ- তার সমর্থক গোষ্ঠীকে কতটা খুশি করতে পারবে, আমি সন্দিহান। এই বৈঠক কতটা তাকে লাভবান করেছে, খালেদা জিয়ার হিসাব করা দরকার। মোদির সঙ্গে বৈঠক না হলে তার কী ক্ষতি হতো- সেটাও হিসাবের দরকার আছে।

খালেদা জিয়া ভারতবিরোধিতার রাজনীতি থেকে সরে আসায় খুশি হলেও সার্বিকভাবে বাংলাদেশের প্রধান দুটি দল- আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে হিসাব করলে তিনটি প্রধান দল- ভারতের সুরে সব কাজে সুর মেলাবে সেটাও চাই না। আমার মনে হয় কোনও আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন বাংলাদেশি নাগরিকই চাইবে না। আমরা চাইব, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক হবে সমান মাত্রায়, বন্ধুত্ব হবে পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে। স্বার্থ রক্ষা হবে সমানভাবে দুদেশেরই।

দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারে গিয়ে কে কত বড় ধার্মিক, কত বেশি মাদ্রাসা আর মোল্লা সৃষ্টি করতে পারে- এই প্রতিযোগিতায় যেমন ব্যস্ত থাকে, তেমনি ব্যস্ত মিলিটারিকে কে কত বেশি সুবিধা দিতে পারে সেটা নিয়েও। সব কিছুতে আওয়ামী লীগ- বিএনপি একে অন্যের দোষ খুঁজে পায় কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় তারা একে অপরকে দোষারোপও করে না। দোষ পায় না। এবার এই তালিকায় যুক্ত হলো ভারততোষণ। আশঙ্কা করছি- এখন থেকে মোল্লা, মিলিটারি আর মোদিকে তুষ্ট করার প্রতিশ্রুতি আর প্রতিযোগিতা চলবে এই দুদলের মধ্যেই।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক
anisalamgir@gmail.com

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে