Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ৫ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.7/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-০৯-২০১২

সংলাপ, না সংঘাত?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


সংলাপ, না সংঘাত?
শিরোনাম থেকে কেউ যেন ধারণা না করেন, সংলাপ না হলেই শুধু সংঘাত হবে। সংঘাত আছে, প্রচণ্ডভাবে আছে এবং এই সংঘাতে বিপর্যস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ এবং প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে দেশটাকে নিয়ে আমাদের আশাবাদ। এই সংঘাতের নানা চরিত্র থাকলেও এটি মৌলিকভাবে রাজনৈতিক। রাজনীতিই এর প্রধান উৎস। দুটি বড় দলের ভেতর সংঘাত দলীয় মতাদর্শে বিভক্ত সকল পক্ষের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদ বাড়ায়। বলপ্রয়োগের সব সমস্যার সমাধানে মানুষকে উৎসাহিত করে এবং পুরো জাতির জীবনীশক্তি এবং সৃষ্টিশীল উদ্যমকে নিঃশেষ করে। এই সংঘাত এড়ানোর একটা উপায় হতে পারে বিবদমান দলগুলোর মধ্যে আলোচনা বা সংলাপ। অর্থাৎ বলপ্রয়োগের পরিবর্তে কথাবার্তার মাধ্যমে যৌক্তিকভাবে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা। ছেলেবেলায় শুনতাম, বাজারে বা পথের পাশে দুজন মানুষ কোনো বিবাদে জড়িয়ে পড়লে কেউ কেউ মন্তব্য করছেন ‘হাত থাকতে মুখে কেন?’ অর্থাৎ কলহ করে কী লাভ, কিলঘুষির মাধ্যমেই তো অল্প সময়ে কার শক্তি বেশি, তা প্রমাণ করা যায়। আমাদের বড় দুটি দলের নেতা-নেত্রীদের প্রতিদিনের কথাবার্তায় এখন থাকে আগুন আর বারুদ। মুখে তাঁরা একে অপরের পিণ্ডি চটকাচ্ছেন। ক্লান্তিহীনভাবে, গলা সপ্তমে চড়িয়ে, প্রতিদিন। উপলক্ষ যা-ই হোক—কোনো নেতার জন্মদিন, পাখিদের অভয়াশ্রমের উদ্বোধন, শিক্ষা নিয়ে মতবিনিময়, বাজেট ভাবনা অথবা পরিবেশদূষণ রোধে পাটের ভূমিকা, মূল কথা দ্রুত সেরে বক্তৃতার নব্বই ভাগ তাঁরা ব্যয় করেন প্রতিপক্ষের প্রতি বাক্যবাণ ছুড়তে। মজার বিষয়, দুই দলই কাচের ঘরে থেকে একে অপরের দিকে ঢিল ছুড়ছে। এখন শুধু বাকি মুখের বদলে হাত এস্তেমাল করার প্ররোচনা। তবে পরিস্থিতি যে রকম উত্তপ্ত, তাতে এই জুনেই তা শুরু হয়ে যায় কি না, কে জানে।
সংঘাত চললেও এখনো তা প্রবাদীয় ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ চলে যায়নি। সে জন্যই প্রয়োজন সংলাপের, যাতে না-ফেরার মতো দুর্ভাগ্যজনক অবস্থায় দেশটা পৌঁছে না যায়। সংলাপের প্রসঙ্গে ছেলেবেলায় শোনা কথাটা একটু ঘুরিয়ে বলা যাক, ‘মুখ থাকতে হাত কেন?’ তবে এই মুখ দিয়ে বিষোদ্গার নয়, গালিগালাজ নয়, পরস্পরকে অপদস্থ করা নয়, বরং যুক্তি এবং সুতর্ক দিয়ে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে, এ রকম একটা প্রত্যাশাও আমরা করতে পারি। অর্থাৎ যে সমাধান একটা টেবিলের দুদিকে বসে আমরা করতে পারি। সেটি রাজপথে নিয়ে গিয়ে নিজ নিজ দলের তৃণমূলের কর্মীদের পর্যন্ত উত্তেজিত করে যুদ্ধের মাঠে নামিয়ে একটি লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে তা করার মধ্যে আর যা-ই হোক মানবিকতা এবং সভ্যতার প্রতি আমাদের বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায় না। রাজপথের প্রতিটি আন্দোলনে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদেরই প্রাণহানি হয়, তাঁদের ভাগ্যে কারাবরণ এবং নির্যাতন জোটে। আজকাল নেতারাও কারাবরণ করছেন, কারণ সরকারও যুদ্ধংদেহী। কিন্তু নেতারা কারাগারে ডিভিশন পান, তাঁদের জামিন হয় এবং জামিনে বেরোলে তাঁদের গলায় ফুলের মালা জোটে। অথচ সাধারণ কর্মীরা হারিয়ে যায় অবহেলা এবং সীমাহীন দুর্ভোগের চক্রে।
সংঘাত কোনো সভ্য সমাধান নয়, গণতান্ত্রিক সমাধান তো নয়ই। তবু সংঘাত হয়, যেহেতু দুটি পক্ষই অটল তাদের অবস্থানে। এই সংঘাত তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে, দারিদ্র্য বাড়বে, জনজীবন অচল হবে, জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হবে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এবং কার্যনির্বাহী অঙ্গগুলো মারমুখী হয়ে পড়বে। ফলে আইনের শাসন এবং আইনের প্রতি মানুষের মান্যতা শিথিল হয়ে পড়বে। শিশুরা সহিংসতা শিখবে। তরুণেরা হতাশায় ভুগবে, অর্থনৈতিক বিপর্যয় বেকারত্ব বাড়াবে, বাড়বে মাদকের ব্যবহার এবং নারীর প্রতি সহিংসতা। একই সঙ্গে নানা ধরনের উগ্রবাদ, যা এখনো অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আছে, সমগ্র বীভৎসতা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমবে, দুর্নীতি বাড়বে, সামান্য ছুতোয় মানুষ মানুষকে মারবে, অপহরণ করবে, মুক্তিপণ দাবি করবে। গত কুড়ি-বাইশ বছরের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেটুকু অর্জন আমাদের হয়েছে প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে, সেসব ধরে রাখা আর সম্ভব হবে না। দেশটির আপন ভূখণ্ডের ভেতর দুটি পক্ষের যুদ্ধে যদি রক্ত ঝরতে থাকে, তাহলে তার জন্য বাইরের কোনো শত্রুর প্রয়োজন হবে না। নিজেরাই নিজেদের কবর খুঁড়তে চাইলে কে আমাদের আটকায়?
সে রকম সংঘাতের একটি বিকল্প হচ্ছে সংলাপ। আদর্শিকভাবে, সংলাপের জন্য সর্বোত্তম জায়গা হচ্ছে জাতীয় সংসদ। কিন্তু গত কুড়ি বছরে আমরা সংসদকে আর জরুরি মনে করছি না। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালন-পদ্ধতির পোশাকি নাম সংসদীয় গণতন্ত্র। কিন্তু অনেক মানুষের সুন্দর একটি ‘ভালো’ নামের পাশাপাশি যেমন একটা ডাকনাম থাকে, যেমন বল্টু অথবা লেবু, যে নামেই তাকে লোকে বেশি চেনে, সে রকম সংসদীয় গণতন্ত্রের একটা ডাকনাম আছে, যা হচ্ছে ‘গিয়ে কী লাভ সংসদীয় গণতন্ত্র’। বিরোধী দলগুলো গত কুড়ি বছর এই কথাই বলছে—সংসদে আমাদের কথা শোনা হয় না, গিয়ে কী লাভ। আমার অবশ্য সন্দেহ ছিল, সেই ১৯৯১ সালেই যখন দুটি দল সংসদে সম্প্রীতি এবং বোঝাপড়ার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পদ্ধতিতে রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্তরণ ঘটাল যে কোথাও না কোথাও একটা ফাঁক রয়ে গেছে। এমনটি তো হওয়ার কথা নয়! কিছুদিনের মধ্যে যখন সংসদীয় গণতন্ত্রের ডাকনামটা মশহুর হয়ে গেল, বুঝলাম আমার সন্দেহ অমূলক নয়। সে জন্য সংলাপের জন্য সংসদকে হয়তো বিরোধী দল উপযুক্ত মনে করবে না। সে ক্ষেত্রে অন্য কোথাও তা হতে পারে।
এ পর্যন্ত এসে এই ‘হতে পারে’র আশাবাদ একটা বড় ধাক্কা খায়, কারণ ‘সংলাপ হতে হবে একটি শর্তেই এবং তা তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির সরকার পুনঃপ্রচলনের’ বনাম ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন অতীত, এটি নিয়ে আলোচনার অবকাশ নেই’ কূটতর্কে এবং হুংকারে ইথার সরগরম, ফলে সংলাপ হওয়ার সম্ভাবনাটাও যেন হঠাৎ উদয় হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সংঘাতময় রাজনীতির চরিত্রানুযায়ী আমরা সংলাপ নিয়েও একটা সাংঘর্ষিক অবস্থানে পৌঁছে গেছি। সংলাপ হওয়া উচিত কি না, হলে নিঃশর্ত নাকি শর্তযুক্ত—এ রকম প্রশ্নেই দেখি প্রায় মারামারি শুরু হওয়ার উপক্রম। তার ওপর আবার সংলাপের সংজ্ঞা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। সংলাপ বলে কিছু নেই, বলেছেন এক সরকারদলীয় নেতা এবং সংসদে কিছু বলাই হচ্ছে সংলাপ—এ রকম একটি সংজ্ঞাও দিয়েছেন। বিএনপির অবহেলিত নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা সংলাপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলে এবং তাঁর নেত্রীকে সংলাপে বসার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানানোর একটা ডাক দিয়ে রীতিমতো দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। দুটি দলই বলছে, সংলাপ হতে হবে তাদের নিজেদের শর্তে। সালিস করতে চাইলে করেন, তারা বলছে, আপত্তি নেই, তালগাছটা কিন্তু আমার।
আমাদের আশাবাদে ধাক্কা যতটাই লাগুক, একটা সংলাপের জন্য আমাদের তাকিয়ে থাকতেই হবে। আমরা মানে আমজনতা, রাজনীতির খেলায় সব সময় পা ভাঙি, মাথা ফাটাই। দুটি দলের মারামারিতে কপাল পোড়ে আমাদের। নির্বাচনে একটি দল জেতে, অন্য দল হারে, কিন্তু সবকিছু হারাই সেই আমরাই। তার পরও, গত কুড়ি বছরে সরকার ও তার নানান অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানের আচরণ সত্ত্বেও, দেশের মানুষ তাদের ভাগ্যের উন্নতি করেছে। তরুণেরা, কৃষকেরা, শ্রমিকেরা উদ্যোগী হয়েছেন, দেশটাকে একটা অবস্থানে নিয়ে গেছেন, যেখান থেকে ভবিষ্যতের পথে পা ফেলা যায়।

২.
সংলাপ প্রয়োজন চলতে থাকা সংঘাতময় পরিস্থিতির উন্নতির জন্য এবং বড় আকারের আরও সংঘাতের সম্ভাবনা যাতে না দেখা দেয়, তা নিশ্চিত করার জন্য। সরকারি দল তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন চাইবে না, বিরোধী দলও এই একটি ব্যবস্থার পুনরুত্থান চাইছে, দুটি দলই মুখে বলছে, আগামী নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু, অবাধ এবং স্বচ্ছ হয়, সে লক্ষ্যেই তারা নিজেদের অবস্থানে অটল। তাই যদি হয়, তাহলে তাদের লক্ষ্যটা আরও সুনির্দিষ্ট এবং অর্জনযোগ্য করতে সংলাপে বসতে অসুবিধা কোথায়? আমরা জানি, ওই অনমনীয় অবস্থান গণতন্ত্র অথবা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নয়, এই অবস্থান জেদের, অহংয়ের ও প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দেওয়ার এবং স্নায়ুযুদ্ধে পরাজিত করার কৌশলের। সরকারি দল অবশ্য বিএনপির আন্দোলনের পেছনে জামায়াতে ইসলামীর একটি কৌশলের খেলা দেখছে। এটি স্বাভাবিক যে এ দলটি যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত তার নেতাদের বাঁচাতে যেকোনো কৌশলই অবলম্বন করবে এবং নির্বাচনের দুই-আড়াই বছর আগেই রাজপথে বিএনপির আন্দোলন শুরু করাটা এই কৌশলের একটি প্রয়োগ, কিন্তু সরকার যেহেতু এই কৌশল ধরে ফেলেছে, এটি নিষ্ক্রিয় করাটাও তার পক্ষে কঠিন নয়। কিন্তু এ জন্য সংলাপ থেকে দূরে থাকাটা উচিত নয়।
সংলাপ হোক খোলা মন নিয়ে, গণতন্ত্রের এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে, সমাধানের দিকে চোখ রেখে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু-তিন বিকল্প আছে, যেমন নির্দলীয় সরকার, দুই বড় দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দল দুটি যদি সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে একমত হয় এবং সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য থাকে, তাহলে সংলাপ হতে পারে সংসদে বা বাইরে।
আপাতত মনে হচ্ছে, সংলাপ নয়, সংঘাতই আমাদের কপালের লিখন। কিন্তু দুই দলে নিশ্চয় এমন লোক আছেন, যাঁরা দেশটাকে নিয়েও মাঝেমধ্যে ভাবেন, দেশটার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তাঁরা এগিয়ে এলে একটা কিছু হতে পারে। টিভিতে যখন দুই দলের প্রধান নেতৃত্বকে দেখি, মনে হয়, কুড়ি বছর পর এরা কেউ রাজনীতিতে থাকবেন না। কিন্তু কুড়ি বছর পর তঁদের সন্তানসন্ততি, নাতি-পুতিরা তো এ দেশে থাকবে, ২০ শতাংশ হলেও (৮০ শতাংশ হয়তো থাকবে বিদেশে) তারা কি চাইবে এমন এক দেশের নাগরিক হতে, যাকে সারা বিশ্ব একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবেই দেখবে?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে