Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ৯ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.3/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-১৯-২০১২

ব্যাপারগুলো রাজনৈতিক

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


ব্যাপারগুলো রাজনৈতিক
সিলেট এমসি কলেজের শতবর্ষ পুরোনো ছাত্র হোস্টেলটি আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আমি এমসি কলেজের ছাত্র ছিলাম, যদিও হোস্টেলে থাকা হয়নি, থাকার প্রয়োজন ছিল না বলে। তবে আমার অনেক বন্ধু হোস্টেলে থাকত, প্রায়ই তাদের রুমে যেতাম, আড্ডা দিতাম, গল্প করতাম। হোস্টেলের সামনের মাঠে ক্রিকেট খেলতাম। একটি কাগজে একটি ছবি দেখলাম: আগুনে দাউ দাউ করে পুড়ছে হোস্টেল এবং তার সামনে দিয়ে সদর্পে এগিয়ে যাচ্ছে ছাত্রলীগের একটি মিছিল। তাদের একজনও আগুনে পুড়তে থাকা হোস্টেলের দিকে তাকাচ্ছে না, তাদের চোখ সামনে মেলা—হয়তো তারা সামনে কোনো প্রতিপক্ষকে পেয়ে সেদিকে যাচ্ছে, অথবা যারা আগুন দিয়েছে, তাদের পাকড়াও করতে যাচ্ছে, অথবা দমকল বাহিনীকে ডেকে আনতে যাচ্ছে, অথবা হোস্টেলে যে আগুন লেগেছে, তারা তা আদপেই বুঝতে পারেনি। অথবা এমনও হতে পারে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে তারা পুড়তে থাকা হোস্টেলের জায়গায় স্বেচ্ছাশ্রমে আরেকটি হোস্টেল তৈরি করার জন্য একটা আন্দোলনের সূত্রপাত করছে।
সিলেটের যে নিজস্ব একটি দালানশৈলী আছে, যে আসাম-টাইপ বাংলোর ঐতিহ্য আছে, হোস্টেলটি ছিল তারই আদলে তৈরি এক নান্দনিক স্থাপনা। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যেত। কাগজে আরও দেখলাম, শিক্ষামন্ত্রী হোস্টেল দেখতে গিয়ে কেঁদেছেন। আমিও ভেবেছিলাম, কাঠকয়লা হয়ে যাওয়া হোস্টেলকে একবার শেষ দেখা দেখতে যাব, কিন্তু যাইনি একটি কারণে যে হোস্টেলটির ধ্বংসাবশেষ দেখে আমার কান্না আসবে না, আমার বরং অসম্ভব ক্রোধ হবে এবং অর্থমন্ত্রীর মতো আমারও ইচ্ছে হবে, যারা আগুন দিয়েছে, তাদের ধরে পেটাতে। কিন্তু এখন বয়সটা ক্রোধ দেখানোর নয়, বরং ক্রোধ সামলানোর। রক্তচাপ অজটিল রাখাটা একটা আবশ্যকতা এই বয়সের। কিন্তু ঢাকায় বসে কাগজে ওই আগুনের শিখায় অসহায় পুড়তে থাকা হোস্টেলটা দেখে আমার যে ক্রোধ হলো, তাও খুব কম কিছু নয়। ক্রোধ হলো ওই দুর্বৃত্তদের ওপর, যারা একে পোড়াল এবং ক্রোধ হলো ওই দুর্বৃত্ত রাজনীতির ওপর, যা এই দুর্বৃত্তদের পয়দা এবং পালন করে যাচ্ছে।
ছাত্রলীগের সেই মিছিলে ফিরে যাই। আমি অনেকবার ছবিটা দেখলাম এবং প্রতিবারই অবাক হলাম এই ভেবে, একটি ছেলেও কেন আগুনের দিকে তাকাচ্ছে না। অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল এ রকম আগুনের ক্ষেত্রে এবং শুধু বঙ্গদেশে নয়, পৃথিবীর যেকোনো দেশে যে মিছিলকারীরা মিছিল থামিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে আগুন নেভাতে। বালতি হাতে, বদনা হাতে এমনকি বোতল হাতে প্রতিটি ছেলে ছুটবে পানি ঢালতে। এবং তাদের চোখ-মুখে থাকবে কান্না। প্রিয় কলেজের প্রিয় ছাত্রাবাস পুড়ছে, না কেঁদে উপায় আছে? তার সঙ্গে আগুনের উত্তাপ যুক্ত হয়ে চোখ-মুখ ফুলিয়ে দিত। দু-একজন অসুস্থ হয়ে মাঠে শুয়ে পড়ত। কিন্তু না, এই মিছিলের প্রতিটি মুখ স্বাভাবিক, যেন তারা জিন্দাবাজারের রাস্তায় মিছিল করছে, অথবা কোর্ট পয়েন্টে এবং তাদের একদিকে আগুনে ছাই হতে থাকা মন কেড়ে নেওয়া স্থাপত্যের হোস্টেল নয়, বরং আছে মানুষজন এবং পুরোনো কোনো বাস অথবা আবর্জনার গাদা, যাতে কেউ আগুন দিয়েছে। ছবিটি দেখে আমার মনে হলো, এই সিংহহূদয় ছাত্রলীগের নেতারা প্রকৃতই সকল মানবিক বোধ অনুভূতির উপরে উঠে যেন এক রাজনৈতিক নির্বাণ লাভ করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়া এই পরিবর্তনকামীদের তাই হোস্টেল পোড়ার মতো ছোটখাটো কষ্ট-দুঃখ আর স্পর্শ করে না।
এই হোস্টেল যারা পোড়াল, তাদের মাননীয় ওই দুই মন্ত্রী আখ্যা দিলেন দুর্বৃত্ত বলে। তবে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত—একটি খবরের কাগজের ভাষ্য অনুযায়ী—এ ঘটনাকে রাজনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন। কাগজের সংবাদটি পড়ে ঠিক বোঝা গেল না, রাজনৈতিক বলতে মন্ত্রী ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন। প্রতিবেদনকে অসম্পূর্ণ মনে হলো: হয়তো প্রতিবেদক মন্ত্রীর পুরো বক্তব্য শোনেননি। সে জন্য দপ্তরবিহীন মন্ত্রীকে আমার আলোচনায় আমি টানব না, কিন্তু ‘রাজনৈতিক’ কথাটা আমার কাছে খুব জুতসই মনে হয়েছে। কেউ যদি এখন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আগুন লাগানোর ঘটনাটি আপনি কীভাবে দেখছেন, আমি বলব, এটি একটি রাজনৈতিক ঘটনা। আমাদের দেশের রাজনীতিই শুধু এমন নৃশংসতা তৈরি করতে পারে, শুধু আমাদের রাজনীতিই পারে এমন ছাত্রনেতা তৈরি করতে, নিজেদের শতবর্ষের ঐতিহ্যে আগুন লাগাতে যাদের হাত কাঁপে না, টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারার জন্য নিজেদের সংগঠনের কর্মীকে গুলি করতে যাদের চোখের পাতায় একটুখানি কাঁপন লাগে না।
টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে খুনোখুনির ব্যাপারটা খুবই পুরোনো এবং পুরোনো বলেই ঘটনাগুলো এত দিনে একঘেয়ে হয়ে গেছে। রাজশাহীতে ছাত্রলীগের নিজেদের ভেতর মারামারিতে যে একটি ছেলে মারা গেল, ওই ঘটনাটিও তেমন কোনো দাগ কাটত না আমাদের পাষাণ বুকে, যদি-না টাকা ভাগাভাগির প্রেক্ষাপটটা পদ্মা সেতু নিয়ে চাঁদা তোলার মতো একেবারে নতুন কিছু হতো। যেদিন প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর কাছে পদ্মা সেতুর জন্য সহায়তার আহ্বান জানালেন, সেদিনই বুঝেছিলাম, একটা ব্যাপক চাঁদাবাজিযজ্ঞ এখন শুরু হবে। বাংলাদেশের মতো চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিপ্রবণ একটি দেশে প্রথমেই অত্যন্ত কঠোর তদারকি ও নজরদারি এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার জায়গা দাঁড় না করিয়ে এ ধরনের আহ্বান জানানোর ফলটা যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্য চাঁদাবাজিতে গড়াবে, এ তো একটি স্কুলের ছাত্রও বলে দিতে পারে। একটি কাগজ লিখেছে, ভিসি-প্রোভিসিকে সাক্ষী মেনেই শুরু হয়েছিল চাঁদাবাজি, যা সোহেল নামের হতভাগা ছেলেটি মারা যাওয়ার পরও থামেনি। থামবেও না। আজ যাদের ধরে নিল পুলিশ, কাল তারা জামিন নিয়ে বেরোবে। সিলেটের হোস্টেল পোড়ানোর মামলা নিয়েও শুরুতে কিছু তোড়জোড় হবে। কিন্তু এক বছর পর একটি দোষী অপরাধীও কারাগারে থাকবে না। কথাটা আমি দায়িত্ব নিয়েই লিখে দিলাম। কারণ, এ দেশে যেসব অপরাধীর সরকারদলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ঠিকানা থাকে, তাদের বিচার হয় না, অথবা বিচার হলেও সাজা হয় না, অথবা সাজা হলেও তারা দ্রুত বেরিয়ে আসে। ব্যতিক্রম যে নেই, তা না; কিন্তু ব্যতিক্রমগুলো পরিসংখ্যানের বিচারে মূল্যহীন এবং দু-এক ব্যতিক্রম শুধু নিয়মটাকেই প্রতিষ্ঠা দেয়।
সিলেট ও রাজশাহীর ব্যাপার দুটি রাজনৈতিক। ফলে সাধারণ অপরাধের সংজ্ঞায় সেগুলো পড়বে না। কেন পড়বে না, তা বুঝতে হলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাসটা একটুখানি পড়লেই চলবে। এই ইতিহাসে লেখা আছে, সব দলই শিক্ষাঙ্গনগুলোকে নতুন জেগে ওঠা চরের মতো বিবেচনা করে। ফলে এগুলোর দখল নিতে দলগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে। দলগুলো সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের ঝান্ডা ওড়াতে চায়। সম্ভব হলে প্রাইমারি স্কুলেও হাত গলাত, নেহাত প্রায়োগিক একটি কারণে তা করছে না: এত ছোট বাচ্চারা তো আর বন্দুক-চাকু ইস্তেমাল করতে পারবে না। সরকারি ও বিরোধী দল তাদের পেটোয়া বাহিনী বানায় ছাত্রদের নিয়ে। এখানে থেমে থাকলেও না-হয় বোঝা যেত। কিন্তু পেটোয়া বাহিনী তারা বানায় শিক্ষকদের একটি অংশকে নিয়েও। ফলে সারা দিনমান দুই দলের ছাত্রদের মধ্যে, শিক্ষকদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকে।
এই যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অচলাবস্থা চলছে, তার পেছনে আছে রাজনীতি। সরকারি রাজনীতি বনাম বিরোধীদলীয় রাজনীতি। ভিসি ও প্রোভিসি-বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরাও। তাদের আন্দোলনে আসার প্রধান কারণ, শিক্ষাজীবনে বড় একটা ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা। কিন্তু পাশাপাশি একটা কারণ ওই রাজনীতি। ভিসি-প্রোভিসির পক্ষে একটি ছাত্রসংগঠন অবস্থান নিয়েছে, ফলে বিরোধী সংগঠন (অথবা তার মোর্চাটি) অবস্থান নিয়েছে ভিসি-বিরোধীদের সঙ্গে। যদি শুধুই শিক্ষা, শুধুই আদর্শচিন্তা এবং শুধুই শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকদের ভালোবাসা হতো বুয়েটের আন্দোলনের উদ্দেশ্য, তাহলে অনেক আগেই সবকিছুর ফয়সালা হয়ে যেত। ভিসি-প্রোভিসি পদ থেকে সরছেন না রাজনীতির কারণে, আন্দোলনকারী শিক্ষকেরাও এই রাজনীতির জবাব দেওয়ার জন্য বেছে নিয়েছেন রাজনীতিকেই, তা না হলে শিক্ষার্থীরা অনাস্থা জানিয়েছে ভিসি-প্রোভিসির ওপরই শুধু নয়, শিক্ষকদের রাজনীতির ওপরও। এ কথাটা আমরা ভেবে দেখি না। আমরা একটু চোখ-কান খুলে রাখলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে কিছু প্রয়োজনীয় পাঠ নিতে পারতাম। এ রকম একটা হচ্ছে: যখন একজন শিক্ষক কোনো কারণে কোনো পদে থাকার নৈতিক অধিকারটা হারান, তখন রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরে সেই অধিকার ফিরে পাওয়া যায় না। আমার আশা, বুয়েটের ভিসি-প্রোভিসি পদত্যাগ করবেন, কিন্তু করলেও যে সংকট মিটবে, তা নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না রাজনীতির জটাজাল থেকে আন্দোলনের ইস্যুগুলোকে আলাদা করা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত অবশ্যই না।
একই অবস্থা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের পর নতুন এক উপাচার্য যোগ দিতে না-দিতেই যখন দেখলাম, তিনি ‘বাইরের’ সে জন্য শিক্ষকদের একাংশের আপত্তি আছে তাঁকে নিয়ে, তখনই ভেবেছিলাম, সংকট আসন্ন। সংকটটা কিন্তু শিক্ষা বিষয় নিয়ে নয়, সংকট নির্বাচন বিষয়ে, অর্থাৎ ব্যাপারটা রাজনৈতিক এবং ব্যাপারটা রাজনৈতিক বলেই শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে।
শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিক ব্যাপারগুলোর সুরাহা সেদিন হবে, যেদিন রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষাঙ্গন থেকে তাদের চরদখলের জন্য পোঁতা বাঁশ, বেড়া আর টেঁটা-বল্লম সরিয়ে নেবে। বিশ্বের কোথাও একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে এ রকম চর হিসেবে দেখা হয় না। দেখি শুধু আমরা। চরের দেশ বলেই হয়তো।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে