Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ৪ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.1/5 (8 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-২১-২০১২

গল্পের জাদুকর

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


গল্পের জাদুকর
কোনো লেখক অন্যলোকে চলে যাওয়ার পরপরই তাঁকে নিয়ে কোনো লেখা নির্মোহ হয় না, তাতে অবধারিতভাবেই বিষাদের ছায়া পড়ে, একটা কষ্ট অথবা ক্ষোভের আস্তর জমে। কেউ সময়ের আগে চলে গেলে একটা ক্ষোভও তো জাগে মনে। আর সেই লেখক যদি হুমায়ূন আহমেদের মতো বর্ণিল কেউ হন, যিনি মানুষকে তাঁর সাহচর্যের স্মৃতি বিলাতেন, মনে রাখার মতো অনেক মুহূর্ত উপহার দিতেন। তাহলে তাঁকে নিয়ে লেখাটাতে স্মৃতির বিষয়গুলোই তো প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। হুমায়ূন আহমেদের লেখার নিশ্চয় নানা মূল্যায়ন হবে। কেউ কেউ হয়তো একাডেমিক প্রবন্ধও লিখবেন। কিন্তু সেসব হবে উপযোগী দূরত্বের একটা সময়ে।

তাঁকে নিয়ে একটা সমালোচনা আছে এ রকম যে তিনি জনপ্রিয় সাহিত্য রচনা করেছেন, কিন্তু তাতে উঁচু কোনো মান ধরে রাখার চেষ্টা করেননি, যে মান নন্দিত নরকে তাঁর লেখকজীবনের শুরুতেই অর্জন করেছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, ওই মান রাখার দায় থেকে তিনি বরং নিজের মতো করে একটি সাহিত্য ভাষা ও গল্প বলার কৌশল রপ্ত করতেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। এবং এই গল্প বলার কৌশলটি যে মান নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই মানে পৌঁছাতে অনেকের এক জীবন লেগে যাবে।

তাঁর একটি উপন্যাস হাতে নিয়ে সমস্তটা না পড়ে রেখে দিতে পারেন না তাঁর কঠোর সমালোচকও। গল্প বলার এ শক্তিটি তাঁকে বিশিষ্ট করেছে। এক বিশালসংখ্যক পাঠকসৃষ্টির একক কৃতিত্ব তিনি দেখিয়েছেন, যে পাঠকেরা তাঁকে পড়া শেষ করে অন্য লেখকদের দিকে হাত বাড়িয়েছে। একসময় পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ছিল যাদের প্রতিদিনের সঙ্গী, তারা হুমায়ূন আহমেদকে তাদের সঙ্গী করেছে। আমাদের সাহিত্যের নিজস্ব একটি ঠিকানা তিনি খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিলেন। বাংলা একাডেমী প্রতি ফেব্রুয়ারি যে বইমেলার আয়োজন করে, যার অভিঘাত আমাদের সাহিত্যে পড়েছে সঞ্জীবনী শক্তি নিয়ে, তার সাফল্যের পেছনে তাঁর অবদান নিশ্চয় কেউ অস্বীকার করবেন না।

লেখাটা হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের মূল্যায়ন নয়, বরং তাঁকে নিয়ে কিছু স্মৃতির। মনে পড়ে, আশির দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে তাঁর সঙ্গে এক চা-বিকেলের কথা। সে সময় তিনি নিয়মিত ক্লাবে যেতেন, দাবা খেলতেন এবং প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে সমবয়সীর মতো গল্প করতেন। কথা অবশ্য প্রফেসর রাজ্জাকই বেশি বলতেন। দাবা খেলার আগে তিনি চা খাচ্ছিলেন এবং আমাকে বলছিলেন, আশার পথে একটা পোস্ট অফিসে গিয়ে তিনি বোকা বনেছেন সেটি বন্ধ দেখে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে দুটি বই তিনি পাঠাতে চাইছিলেন, একটা বড় বাদামি মোড়কে জড়িয়ে। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কি তাঁকে এ রকম বড় বাদামি মোড়কে জড়িয়ে কোনো বই পাঠান? আমার প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি মোড়কটা ছিঁড়ে ফেললেন। তারপর দুটি বইয়ের শুরুর পাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম কেটে আমার নাম লিখে দিলেন। তারপর আমার হাতে দিয়ে দাবা খেলতে চলে গেলেন এবং এই মোড়ক ছেঁড়া থেকে নিয়ে চলে যাওয়া পর্যন্ত একটা কথাও তিনি বলেননি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নামটি কেটে দেওয়াটা তাঁর প্রতি কোনো অশ্রদ্ধার প্রকাশ ছিল না, তাঁদের দুজনের বন্ধুত্বটা ছিল সারা জীবনের। কিন্তু এটি ছিল তাঁর প্রবল ঘরে ফেরার একটা ইঙ্গিত। সেই ফেরাটা বাংলাদেশের সাহিত্যকে একটা ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। শুক্রবার কাগজে দেখলাম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যে শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরই আছেন হুমায়ূন আহমেদ।’ শরত্চন্দ্রের মতোই জনপ্রিয় এবং গল্পের জাদুকর।

আরেকটি কথা অনেককে বলতে শুনি, হুমায়ূনের পাঠক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণপড়ুয়ারা। বিষয়টা যেন খারাপ কিছু—এ রকম করেই বলা হয়, কিন্তু এই তরুণদের মন বুঝতে পারাটা, তাদের আনুগত্য আদায় করে নেওয়াটা তো বিশাল ব্যাপার। এই তরুণ শ্রেণীটি তো পড়েছে দৃশ্যসংস্কৃতির মায়ায়, তারা তো ছাপার জগতে একটা পা রাখতেই চায় না। তারা যখন নিজে থেকেই হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে, বইমেলায় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁর স্বাক্ষর নেয়, অনেকে যখন হলুদ পাঞ্জাবি পরে হিমু সেজে মেলায় ঘুরে বেড়ায়, বুঝতে হবে, হুমায়ূন এদের মনের রসায়নটা রাতে সেরেছিলেন। রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। তরুণদের মনের রসায়নটা বুঝে নিতে তাঁর হয়তো সমস্যা হয়নি। কিন্তু এ অসাধারণ অর্জনটি কজনের আছে, দুই বাংলায়? তাঁর অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবালও তো কাছে টেনে নিয়েছেন অসংখ্য স্কুলশিক্ষার্থীকে, খুদে পাঠককে, যারা মুগ্ধ হয়ে পড়ে তাঁর সব লেখা। তাহলে এই অর্জনটাকেও কি খাটো করে দেখতে হবে, নাকি অবাক হয়ে ভাবতে হবে, কী করে পারেন!

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয়টাও সেই রসায়নশাস্ত্রের সূত্র ধরে। নন্দিত নরকে ও তোমাদের জন্য ভালোবাসা বের হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল পাঠকদের মধ্যে। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছি। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন কেউ। কে, ঠিক মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে। আমি তাঁকে বললাম, ‘রসায়ন আমিও পড়তে চেয়েছিলাম এবং একটি ছোট ঘটনা ঘটে যাওয়ায় পড়া হয়নি।’ তিনি আমাকে টেনে নিয়ে একটা চেয়ারে বসিয়ে বললেন, ‘বলুন তো, ঘটনাটা কী।’ আমি বললাম, তিনি হাসলেন। তার পর থেকে আমাকে দেখলেই বলতেন, ‘এই যে কেমিস্ট্রি-ফেল। কেমিস্ট্রি বিভাগে যে ঢুকতে পারিনি, তিনি সেটাকে ফেল বানিয়ে ফেলেছিলেন।

কৌতুকপ্রিয় মানুষ ছিলেন, বাংলাদেশের সাহিত্যে কৌতুকের অভাবটা বরাবরের। এই কৌতুকটা ঠিক হাস্যরস নয়, এটির একটি ভালো ইংরেজি আছে, উইট। বাংলা করলে বলা যায়, মাথা দিয়ে হাসা, তিনি মাথায় হাসি আনতেন অসংখ্য পাঠকের এবং প্রচ্ছন্ন একটা রসবোধ, যাকে ইংরেজিতে বলা যায় ‘হিউমার’ তা তো তাঁর ছিলই। ফলে কৌতুকের অভাবটা তিনি অনেকখানিই পূরণ করেছিলেন। তবে জীবনে তিনি কৌতুক পছন্দ করতেন, প্র্যাকটিক্যাল জোক করতেন অনেককে নিয়ে। নুহাশ পল্লীতে ভূত আছে, এ রকম একটা রটনা ছিল। একরাতে এই ভূতের খোঁজে আমাকেও নামতে হয়েছিল। অনেক চিন্তাভাবনা করে ভূত উত্পাদন করার ব্যবস্থা হয়েছিল নুহাশ পল্লীতে, সেটি আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম। এ জন্য ভূতের ভয়টা পাইনি বলে হুমায়ূন ভাই বেশ নিরাশ হয়েছিলেন।

২.
মে মাসের ২৮ তারিখ রাতে হুমায়ূন আহমেদকে দেখতে গিয়েছিলাম ধানমন্ডির ‘দখিন হাওয়ার ফ্ল্যাটে’। বেশ প্রাণবন্তই দেখেছিলাম তাঁকে, যেন ক্যানসারটা দূরের কোনো আপদ, আপাতত তাঁর সঙ্গ ছেড়েছে। তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস দেয়াল নিয়ে কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন। দেয়াল-এর একটি প্রেস কপি আমাকে পাঠিয়েছিলেন, পড়ে মতামত দেওয়ার জন্য। অন্যপ্রকাশ-এর স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম, এ বইটি কতটা যত্ন নিয়ে যে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, যিনি তাঁর একজন সাক্ষী, আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, কিছু মন্তব্য নিয়ে যেন একটি লেখা তৈরি করি। প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে সেটি বেরিয়েছিল। কিন্তু সে লেখায় সব আমি বলিনি, যেগুলো সামনাসামনি তাঁকে বলেছিলাম। বইটা নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস ছিল, আবেগ ছিল। কিন্তু আদালতের একটি আদেশে এর কিছু সংশোধন করার প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় তিনি হতাশ হয়েছিলেন। ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে সংশোধন করার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণার কাজটি তিনি করতে পারবেন কি না, এ নিয়ে সন্দেহ ছিল। কিন্তু এসব মন থেকে ঝেড়ে তিনি অন্য প্রসঙ্গে গিয়েছেন। জুয়েল আইচ, শাকুর মজিদ, আলমগীর রহমান, মাজহার এবং এস আই টুটুল—সবাই তাঁকে ঘিরে ছিলেন সেই রাতে। একসময় শাকুর ছবি তুলবেন বলে ক্যামেরা বের করলে তিনি হঠাত্ আমার পাশে বসে বললেন, ‘আমাকে ধরে বসেন তো। আপনি সৈয়দ মানুষ, আপনি ধরে রাখতে পারবেন।’

আমি জুন মাসে নিউইয়র্ক থাকব জানালে ঠিক হলো, ১০ জুন তাঁর অপারেশনের পর ২২ জুন আমরা তাঁর রোগমুক্তি উদ্যাপন করব। টুটুলেরও সে সময় নিউইয়র্ক থাকার কথা।

৩.
২২ জুন তাঁর সঙ্গে দেখা হলো বটে, কিন্তু বেলভিউ হাসপাতালে, রোগশয্যায়। সেদিন নিউইয়র্কের ওপর বিছিয়ে ছিল ঝকঝকে নীলাকাশ। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমার প্রথম কথাটা ছিল, ‘বাইরে তাকান, দেখুন, আপনার প্রিয় ঝকঝকে নীলাকাশ।’ তিনি হাসলেন। কৌতুক করলেন, সঙ্গে আমার ছেলে ছিল, যাকে নিজের হাতে কিছু লিখে স্বাক্ষর দিয়ে বেশ কিছু বই তিনি দিয়েছেন, তার সঙ্গেও কথা বললেন। তাঁর মনোবলে যেন কোনো চিড় ধরেনি, যেন ক্যানসার এখনো দূরের কিছু। কিন্তু চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। শরীর দুর্বল। একটা ইনফেকশন হয়েছে, তারও চিকিত্সা চলছে। হুমায়ূন আহমেদ হুমায়ূন আহমেদের মতো নেই। তার পরও একটা আশা নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। একটু হেসে আমার হাত ধরে একটু চাপ দিয়েছিলেন। হয়তো বলেছিলেন, ‘বিদায়।’ আমি শুনিনি।

৪. হুমায়ূন আহমেদের একটি চলচ্চিত্রে একটি সিলেটি গান ছিল এ রকম: ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’ আমার দায়, মানে আমার জন্য। বিদিতলাল দাস তাঁর অসাধারণ গলায় গানটা গেয়েছিলেন। গানটি হুমায়ূন ভাইয়ের খুব প্রিয় ছিল। সে জন্য তাঁর জন্য থাকল শুধুই ভালোবাসা।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে