Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২০ , ১৬ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.6/5 (7 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-২৩-২০১২

অন্য হুমায়ূন

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


অন্য হুমায়ূন
সদ্যপ্রয়াত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকে মোটামুটি কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জীবন আমাদের প্রায় এক সঙ্গেই শুরু হয়েছিল। একাডেমিক দিক থেকে তিনি আমার এক বছরের সিনিয়র। বয়সে দেড় কি দুই। পড়াশুনার সময় অবশ্য পরিচয়টা ছিল না। আমি যখন ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলাম, তার আগেই তিনি রসায়ন বিভাগে যোগ দিয়েছেন। সেটা সত্তর দশকের কথা। এর মধ্যেই তিনি লেখক হিসেবে ভালো পরিচিতি পেয়েছেন। তার প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে প্রকাশ হয়েছে ১৯৭২ সালেই। ওই উপন্যাসের কল্যাণে তিনি বড়মাপের লেখক হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও তার শঙ্খনীল কারাগার ছিল আলোচনায়। আমি তার ওই সাহিত্য-প্রতিভার কথা জেনেছি-শুনেছি। তখনও ত্রিশ পেরোয়নি। ভালো লাগত এত কম বয়সেই তিনি একজন বড়মাপের লেখক হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন বলে। তাই আমি নিজে থেকেই আগ্রহ করে তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম।

দুজনের জানাশোনা থাকলেও সেটা ছিল অল্পদিনের। তত ঘনিষ্ঠতা হয়নি। তিনি ক’দিন বাদেই পিএইচ-ডি করতে চলে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। আমিও পিএইচ-ডি করতে গেলাম। আশির দশকে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলাম দুজনেই। তারপর থেকে মাঝে মাঝে দেখা হত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবে। অগ্রজ-অনুজসুলভ একটা সম্পর্ক গড়ে উঠল দুজনের মধ্যে। ওখানে দাবা খেলতেন তিনি। কখনও-সখনও তিনি একা চুপচাপ বসে থাকতেন। আমাকে দেখলে ডেকে পাশে বসাতেন। বিষয়টা আমার বেশ মজা লাগত। আশির দশকের মাঝামাঝিতে তিনি বিটিভিতে প্রচারিত এইসব দিনরাত্রি ধারাবাহিকের কল্যাণে সাধারণ মানুষের কাছে খুব পরিচিত হয়ে উঠলেন। তাই ১৯৮৮ কী ৮৯-র দিকে নাটক ও বই লেখালেখির দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনাও ছেড়ে দিলেন। তখন থেকে তার সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাত কমে গেল একদম।

তার প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন আমার বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। সেই সূত্রে তাদের পরিবারের সঙ্গে কিছুটা যোগাযোগ ছিল। তাদের কন্যা দিঘি লীলাবতী পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মারা গিয়েছিল। এসব কথা জানতাম আমি। টুকটাক যোগাযোগ ছিল। এরপর মনে আছে ১৯৯৪ সালে অন্যপ্রকাশ থেকে বের হল আমার প্রথম উপন্যাস আধখানা মানুষ। সেটা দেখে হুমায়ূন আহমেদ আমাকে বললেন, ‘আরে, আপনিও তো একজন লেখক।’ এরপর থেকে তিনি আমাকে নিজের জগতের লোক বলেই মূল্যায়ন করতে শুরু করলেন।

ধীরে ধীরে যোগাযোগ বেড়েছে। নব্বই দশকের শেষাশেষি বা এই দশকের শুরু থেকে তার সঙ্গে অনেকবার দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে। কত স্মৃতি। কোনটা রেখে কোনটা বলি। মনে পড়ছে গত বছর তিনি আমাকে নুহাশপল্লীতে নিয়ে যেতে চাইলেন। সে সঙ্গে নেত্রকানায় উনার নিজের গ্রামে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি দেখানোর খুব ইচ্ছা তার। অন্যপ্রকাশের মাজহারও বারবার বলছিলেন। অনুরোধ রক্ষা করে গেলাম। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। নুহাশপল্লীতে দেখলাম রাত জেগে আড্ডা দেওয়া, সবাইকে নিয়ে আনন্দ করা এক খেয়ালী মানুষকে। আমাকে বললেন, ‘আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন? আমি কিন্তু করি। নুহাশপল্লীতে ভূত আছে।’ আমি বল্লাম, ‘ভূত তো আপনি উৎপাদন করেন।’ তখন উনি আমাকে নির্দিষ্ট কিছু জায়গার কথা বলে সেগুলোতে রাতে একা ঘুরে আসতে বললেন। যথারীতি আমি একা ঘুরে এসে কিছুই পেলাম না। উনি এর মধ্যে আমার পেছনে একজন গোয়েন্দা লাগিয়েছিলেন। আমি ফাঁকি দিই কিনা দেখার জন্য। আমিও বিষয়টা টের পেয়েছিলাম। ফিরে এসে তাই বললাম, ‘আপনি তো গোয়েন্দা লাগিয়েছিলেন। আমি আপনার কথামতো সব জায়গায় গিয়েছি। কই, ভূত তো পেলাম না।’ উনি আমাকে ভূতে বিশ্বাস করাতে না পেরে নিরাশ হলেন। তবে অনুরোধ করলেন আমি যেন তার ‘ভূত-তত্ত্বে’র কথা প্রকাশ করে না দিই।

নুহাশপল্লীতে এক রাত থেকে পরে গেলাম নেত্রকোনায়। হুমায়ূন আহমেদের গ্রামে। তার ওই স্কুল দেখতে। অসাধারণ। বিশাল জায়গা নিয়ে আদর্শ একটি স্কুল গড়ে তোলার চেষ্টা। স্কুলের স্থাপত্যশৈলীটা করেছেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। তিনি আর্কিটেকচারের ছাত্রী। তার করা স্থাপত্যটাও দেখার মতো। এমন একটি প্রত্যন্ত গ্রামে তিনি এমন সুন্দর একটি উদ্যোগ নিয়েছেন বলে ভালো লাগল। আমার ইচ্ছার কথা তাকে বললাম। প্রয়োজন হলে আমি ওই স্কুলের জন্য সব রকম সাহায্যই দিতে চাই। আসলে হুমায়ূন আহমেদের মতো লোকের পক্ষেই যে নিরবে-নিভৃতে এমন একটি কাজ করা সম্ভব সেটা যারা তাকে বুঝতে পারেন তারাই মেনে নেবেন।

গত এক-দেড় দশকে তাকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে আমি তাকে হয়তো কিছুটা বুঝতে পেরেছি। তাকে বুঝতে না পেরে অনেকেই তার কাছ থেকে সরে গেছেন। আসলে অদ্ভুত এক ধরনের সারল্য ছিল তার। ছিলেন স্পষ্টবাদীও। তাই তার সরাসরি কথায় অনেকে আঘাত পেয়ে দূরে চলে যেতেন। হুমায়ূন আহমেদ কিন্তু বিষয়টা এত জটিলভাবে দেখতেন না। বরং আবার যদি কখনও দেখা হত তাদের সঙ্গে নিজেই জানতে চাইতেন, ‘ওই দিন খুব কষ্ট পেয়েছিলে, তাই না?’ তিনি মনে রাখতেন এভাবেই মানুষকে। শত ব্যস্ততার ভিড়েও। এই হলেন হুমায়ূন আহমেদ।

ছিলেন খেয়ালীপনার চূড়ান্তও। জোছনা-বিলাস ছিল তার। ছিল বৃষ্টিবিলাস। গাছপালা নিয়ে আদিখ্যেতা। পাখি আর প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা। নুহাশপল্লীতে ভূত উৎপাদনের মতো খেয়ালীপনা। হিমু আর মিসির আলীর মতো চরিত্র সৃষ্টি করা। মনে আছে ঢাকায় আলমগীর রহমানের বাড়িতে সেই ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ছাদে ওঠা। তারপর সেখানে জোছনা নিয়ে তার কী যে উচ্ছ্বাস। মাঝে মাঝে নুহাশপল্লীতে জোছনা দেখার আয়োজন করতেন শুনেছি। আমাকে যেতে বলতেন। ব্যস্ততার জন্য যেতে পারেনি। শুধু গতবার যেতে পারলাম। তখনই দেখলাম ওখানকার লিচু গাছের ফল খাওয়ার ব্যাপারে তার কিছু আরোপিত নিয়ম। দুটি ফলগাছ থাকলে একটির ফল খাবে মানুষ আর অন্যটির ফল পাখিরা। তার কড়া নির্দেশ দেওয়া ছিল। খুব বৈষয়িক বা পাণ্ডিত্যের প্রকাশ ঘটান, এমন লোকদের তার পছন্দ ছিল না। নুহাশপল্লী থেকে এক ব্যবসায়ীকে বের করে দিয়েছিলেন। তাকে বলেছিলেন, ‘আপনি এখানে থাকলে আমার গাছগুলো লজ্জা পাবে।’ আর নিজেকে জাহির করেন এমন লোকদের সঙ্গে তিনি তেমন কথাই বলতেন না।

মনে পড়ছে, একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা আমার ভালো লাগে না।’ আমি বললাম, ‘আমার কাছে ভালো লাগে।’ শুনে খুশি হয়ে বললেন, ‘আপনার কথায় খুশি হলাম। কারণ আমি খুব নিকৃষ্ট পাঠক। যদি আপনি আমার সঙ্গে একমত হতেন তাহলে আমার মনে হত আপনিও আমার মতোই পাঠক হিসেবে নিকৃষ্ট। আপনার তো তা হওয়ার কথাও নয়। আসলে আপনিই তো সাহিত্যের লোক।’ আমাকে উনি এভাবেই মাঝে মাঝে বলতেন। কখনও বলতেন, ‘আপনি তো সৈয়দ।’ কখনও বলতেন, ‘হাজার হলেও আপনি পণ্ডিত লোক।’ এ সবই ছিল তার মধ্যেকার হিউমার এবং উইটের উপস্থিতির প্রমাণ।

তার মৃত্যুর আগে গত দু’মাসে যে ক’বার দেখা হয়েছে, সে দিনগুলোর কথা ভুলব না কখন-ই। চিকিৎসার ফাঁকে গত মে মাসে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ২৮ মে দেখা করলাম তার সঙ্গে। দেয়াল উপন্যাসটা পড়ে কমেন্টস দিতে বললেন। বলছিলেন, ‘আমি কি পারব কাজটা শেষ করতে?’ বললাম, ‘পারবেন অবশ্যই। সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন।’ তার নির্মিতব্য ছবি ঘেটুপুত্র কমলা নিয়েও চিন্তা ছিল তার। এর প্রিমিয়ারে দাওয়াত ছিল আমার। যেতে পারিনি। যদ্দূর শুনেছি অসাধারণ কাজ হয়েছে। তো, ২৮ মে রাত বারোটা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে ওঠার সময় তাকে জানালাম জুনে আমিও নিউইয়র্কে যাচ্ছি। তখনই পরিকল্পনা করে ফেললেন, ২২ জুন নিউইয়র্কে তার বাসার কাছের এক মাঠে অন্যপ্রকাশের মাজহার, শিল্পী এসআই টুটুল, তিনি এবং আমি চারজন মিলে আড্ডা দেব। ২২ জুন দেখা হল উনার সঙ্গে। তবে হাসপাতালে। একবার অপারেশনের পর জটিলতা দেখা দেওয়ায় আবার অপারেশন করতে হয়েছে। মিনিট চল্লিশেক ছিলাম ওখানে। তারপর বিদায় নিতে চাইলে আমার হাত ধরে কী যেন বলেছিলেন অস্ফুটে। হয়তো বিদায় বলেছিলেন। তখনও কেন যেন মনে হয়নি উনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন এত শিগগির।

চলে গেছেন সত্যিই। তবে রেখে গেছেন খেয়ালী, রসে-পূর্ণ, অসাধারণ প্রতিভাবান এক লেখক-নির্মাতার বিপুল কীর্তি। সেই কীর্তিই মনে করিয়ে দেবে তার কথা।

ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ও কথাশিল্পী।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে